ছোটোদের চাঁদের হাসি / হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা / ডিসেম্বর ২০২৫

লক্ষ দ্বীপের টানে

 

জানো বন্ধুরা, এবারের ট্রিপে যাওয়ার আগে পরিচিত একজনকে বলছিলাম যে আমরা লাক্ষাদ্বীপ যাচ্ছি বেড়াতে। শুনে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, লাক্ষা দ্বীপে কি অনেক লাক্ষা পাওয়া যায়? চিন্তায় পড়লাম। তারপর তিনিই জবাবটা দিলেন। মুচকি হেসে বললেন, ওটা লাক্ষাদ্বীপ নয়, লক্ষ দ্বীপের সমাহার। উচ্চারণ ভেদে লাক্ষা হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ লাক্ষার সঙ্গে এই দ্বীপের নামের কোনও সম্পর্ক নেই। তোমাদের জানাই, ভারতের পশ্চিমে অবস্থিত আরব সাগরের বুকে রয়েছে এই লক্ষ দ্বীপ।

 

সময়টা ছিল নভেম্বর মাসের শেষের দিক। কলকাতা থেকে বিমানে কোচি (কেরল) পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গেল।  আমাদের যেতে হবে উইলিংডন দ্বীপে। সেখানে আগে থেকে হোটেল ঠিক করা আছে। কারণ ওই দ্বীপ থেকেই আমাদের লক্ষদ্বীপ যাত্রা শুরু হবে। অনেকটা রাস্তা। বেশ রাতে পৌঁছলাম উইলিংডন। পরদিন আমরা ঘুরলাম কোচি শহর, অনেকগুলো চার্চ, আর দেখলাম সমুদ্রের খাঁড়িতে চাইনিজ নেটে মাছ-ধরা। একটা বিশাল ছাতা যেন সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়া হলো। তারপর দড়ি ধরে তুলে আনতে দেখা গেল, কত রকমের জ্যান্ত মাছ।

 

 

এরপরের দিন শুরু আসল যাত্রা। আমরা ঠিক দশটার সময় পৌঁছলাম যেখান থেকে জাহাজ ছাড়বে, সেখানে। ওরে বাবা, সে এক বিশাল কাণ্ড। প্রবল সিকিউরিটি চেকিং আর কাগজপত্র তৈরির লাইন। একদম হচপচ অবস্থা যাকে বলে। এটি পেরোলে তবে জাহাজের কাছে পৌঁছতে পারব। বেড়ানোটা কেমন হবে, ভেবে মনটা দমে গেল। কিন্তু পরে দেখেছি, ওইটুকু ঝামেলা ছাড়া আর কখনও এতটুকু অসুবিধে হয়নি আমাদের। এটাও মনে হলো, ওই বিশাল ছয়তলা জাহাজের এত যাত্রীর নিরাপত্তার জন্য এটুকু মেনে নেওয়া উচিত।

 

আমরা যখন জাহাজে ওঠার সিঁড়ির কাছে পৌঁছলাম, তখন আমাদের জানানো হলো, আমাদের সমস্ত লাগেজ নির্দিষ্ট কেবিনে পৌঁছে গিয়েছে। প্রত্যেকের গলায় নির্দিষ্ট রুমের নম্বর সহ পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। জানা গেল, এটি সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক। সে এক দুধসাদা বিশাল জাহাজ, নাম এম ভি কাবারাত্তি। উঠলাম জাহাজের চারতলায়। কেবিনে ঢুকে দেখি আমাদের লাগেজ যত্ন করে রাখা আছে। একটা টু টায়ার বেড, একটা ওয়ার্ডরোব, একটি টেবিল আর দুটো চেয়ার। টেবিলের ওপর একঝুড়ি ফল আর জলের বোতল। সব টিপটপ সাজানো। এটাচড বাথরুমে গিজার, ঘরের মেঝেতে লাল কার্পেট। সব মিলিয়ে দারুণ !

 

 

কিন্তু ঘরে মন টিকবে কেন, জাহাজের ছাদে যাব না! গেলাম ছাদে। সেখানে আরো অনেক মানুষের মেলা। বিকেল গড়িয়ে গেলে জাহাজ চলতে শুরু করল। চলেছে খাঁড়ি দিয়ে, সমুদ্র নাকি অনেক দূর। অন্যান্য জাহাজ, স্টিমার সব খেলনার মতো লাগছে। দু'দিকের ঘরবাড়িও তাই। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল যে ছোট জাহাজটি, সে সমুদ্রে পড়ার আগে সিগন্যাল দেখিয়ে বিদায় নিল। বুক দুরদুর করছে। সামনেই মহাসমুদ্র। কূলকিনারাবিহীন। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার মুহূর্তে আমরা আরব সাগরের বুকে আশ্রয় নিলাম।

 

অতি উৎসাহে আমরা কয়েকজন ক্যাপ্টেনের ঘরের কাছে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলাম। হাসি মুখে জাহাজের ক্যাপ্টেন বেরিয়ে এসে আমাদের ইঞ্জিন রুমে ডেকে নিলেন। তিনি অনেক কিছু বলছিলেন–আমরা শুধু বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, কোথায় আছি। সমুদ্র অনেক নিচে। আমরা যেন ভেসে আছি, অবলম্বনহীন। এমন অভিজ্ঞতা তো কোনোদিন হয়নি! অন্ধকার গাঢ় হতে চলে এলাম কেবিনে। প্রত্যেক কেবিনে মাইক্রোফোন আছে। সেখানে ঘোষণা করা হলো, এই ফ্লোরেই কনফারেন্স রুমে গিয়ে বসার জন্য। ওখানে গিয়ে জানলাম একশো আশিজন পর্যটক আছেন এই জাহাজে, যাঁরা লক্ষদ্বীপ বেড়াতে এসেছেন। এছাড়াও নৌসেনা বিভাগে কর্মরত মানুষজন, বিভিন্ন দ্বীপে বসবাসকারী মানুষও এই জাহাজে যাতায়াত করেন। চাররাতের এই যাত্রাপথে চলার নিয়মকানুন সম্পর্কে বললেন জাহাজের ক্যাপ্টেন ও এই ট্যুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন। এরপর চা-স্ন্যাকস ও এলাহি ডিনার শেষে চললাম ঘুমের দেশে।

 

 

ঘুম ভাঙতেই অনুভব করলাম, জাহাজে কড়া অনুশাসন। ভোর থেকে শুরু হলো ঘোষণা। কখন চা, কখন প্রাতরাশ, কটায় এমবার্কেশন। এমবার্কেশন কী বলতো? সেটা হলো–স্নান ও প্রাতরাশ সেরে, সেজেগুজে জাহাজের পেটের ভিতর থেকে বেরোনোর জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হবে। বেরিয়ে নৌকোয় উঠে কাছাকাছি দ্বীপে পৌঁছতে হবে। ওই বিশাল জাহাজ তো আর ঘাটের ধারে যেতে পারবে না। প্রথম রাত্রি শেষে আমরা নামলাম কাবারাত্তি দ্বীপে। আগেই জানতাম, এখানে সারাদিন হাজার মজায় কাটবে আমাদের। কেউ দৌড়ে গিয়ে আরব সাগরের নীল জলে নেমে পড়ল স্নান করতে। কেউ বা স্নরকেলিংয়ে মেতে গেল। কেউ স্পিডবোটে চড়ে দৌড় দিল মাঝ সমুদ্রে। হাসি, গল্প, মজা আর সুস্বাদু ডাবের জল–সবমিলিয়ে সে এক দারুণ মজা।

 

এবার তোমাদের জানাই, একেবারে ভিন্ন ধরনের এক অভিজ্ঞতার কথা। এরপর গ্লাস-বটম বোটে চেপে আমরা গেলাম, প্রবাল আর রঙিন মাছের স্বর্গরাজ্যে। এ এমন এক নৌকা, যার তলদেশ স্বচ্ছ কাঁচের উপাদান দিয়ে তৈরি। এই অংশটি জলরেখার নিচে থাকে এবং যাত্রীরা নৌকার ভেতর থেকে জলের নিচের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। সমুদ্রের নিচে এমন এক রঙিন দুনিয়া আছে, না দেখলে বিশ্বাস হতো না। দু'ঘণ্টা ধরে যেন এক অন্য পৃথিবীতে থেকে এলাম। লাঞ্চের পর দ্বীপের ভিতরে গেলাম সামুদ্রিক প্রাণীদের মিউজিয়াম দেখতে। নারকেল আর কেয়াগাছের ঝাড় সারা দ্বীপ জুড়ে। ফিরে এসে সমুদ্রের পাড়ে বসে দেখলাম, স্থানীয় লোকনৃত্য। মন ভরে গেল প্রথম দিনেই। ওমা, সন্ধের একটু আগেই কোথা থেকে আমাদের নিতে চলে এল এম ভি কাবারাত্তি। কোন কোন দ্বীপ ঘুরে সেখানকার মানুষদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এল কে জানে! আমরা আবার নৌকায় চেপে দূরে দাঁড়ানো জাহাজে গিয়ে উঠলাম।

 

 

সারা রাত জাহাজ চলল। দ্বিতীয় রাত শেষে, ভোরবেলা আমরা পৌঁছলাম মিনিকয় দ্বীপে। জাহাজ থেকে বেরিয়ে এই দ্বীপে পৌঁছতে একটু বেশিই সময় লাগল। দ্বীপে পৌঁছে জাহাজটাকে আর দেখা গেল না। এখানে অনেকেই কায়াকিংয়ে মেতেছেন–এটা হলো ছোট ছোট নৌকায় সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো। লাঞ্চ পর্ব মিটলে ছোট বাসে করে দ্বীপের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের। এই দ্বীপটি বেশ একটা ছোটখাটো শহর। এখানে নৌসেনা বাহিনীর অফিস আছে। দু’একটা অন্য সরকারি অফিসও আছে। খুব সস্তা কিন্তু ভালো মানের গেঞ্জি-টিশার্টের কারখানা আছে। আমি তো বেশ কয়েকখানা উপহারের জন্য কিনে ফেললাম। ডেসিকেটেড কোকোনাট, খাঁটি নারকেল তেল–তাও কিনেছি প্রাণভরে। কেরলে যে বিখ্যাত বাইচ প্রতিযোগিতা হয়, সেই নৌকা তৈরি হয় এই দ্বীপে। দেখলাম, তৈরি হয়ে যাওয়া নৌকার গায়ে তুলির টান দিচ্ছেন শিল্পীরা।

 

এই দ্বীপে সারাদিনের আনন্দের শেষে ফেরার সময় এক কাণ্ড। ইতিমধ্যে বেশ খানিকটা বৃষ্টি হয়েছে। আকাশের গায়ে জলভরা কালো মেঘের আস্তরণ। মাঝে মাঝে তার ফাঁক দিয়ে একটু-আধটু সূর্যের কিরণ বেরিয়ে এসে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। সাত-আটটা নৌকা আমাদের নিয়ে যাতায়াত করে জাহাজে। আকাশের মুখ ভার বলে সবাই আগে পৌঁছতে চায়। আমরা একদম শেষ নৌকার যাত্রী। নৌকায় উঠে বুঝলাম, সমুদ্র আজ একটু পাগলপারা। বড় বড় ঢেউ ভাঙছে। জলের রংও আকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কৃষ্ণকালো। সব নৌকার লোকজন জাহাজে উঠে গিয়েছে। শেষ দু'টো নৌকা আর জাহাজের গায়ে ভিড়তে পারছে না, ঢেউগুলো খুব অশান্ত। দু'টো নৌকা জাহাজের চারদিকে ঘুরপাক খেয়েই যাচ্ছে। ভয় তো একটু লাগছেই। অনেকক্ষণ কেটে গেল এভাবে। এক সময় নৌকা দু'টো অনেক কাছে চলে এল জাহাজের। এই সুযোগে নৌবাহিনীর লোক আর জাহাজের কর্মচারীরা কী অদ্ভুত কায়দায় প্রত্যেককে হাত ধরে জাহাজে তুলে নিল, যেন কিছুই হয়নি। শুধু অনুভব করলাম, নিরাপদে এতটুকু ব্যথা না পেয়ে অবলীলায় আমরা জাহাজের ভিতরে চলে এসেছি। প্রত্যেকবার ওঠানামার সময় এঁরা সাহায্য করেছেন। এই মানুষগুলোকে কুর্নিশ জানাতেই হয়।

 

 

তৃতীয় রাত সক্কাল সক্কাল আমরা নামলাম কালপেনি দ্বীপে। অপেক্ষাকৃত জনহীন এবং গ্রাম্য পরিবেশ। এখানে স্কুবা ডাইভিং-এর জন্য অনেকেই চলে গেলেন। আমরা প্রাতরাশ সেরে নৌকা করে আর একটা জনহীন দ্বীপে গেলাম। তার এখনো নামকরণ হয়নি। সেখানে শুধু চুপ করে বসে আরব সাগরের নূপুরধ্বনি শুনতে হয়। সারি সারি নারকেল গাছ সঙ্গী কেবল। মূল দ্বীপে ফিরে এসে দেখলাম মাছধরা সম্প্রদায়ের নাচ-গান। এই সময় নামল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। বাগান-ছাতার নিচে বসে সামনে অকূল সমুদ্রের জলোচ্ছাস দেখতে দেখতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল ওই অথৈ জলে। দেখতে দেখতে চারদিকের ছোট ছোট দ্বীপগুলো ডুবে গেল। আমাদেরও পা ছুঁয়ে দিল আরব সাগরের জল। তখনই দেখতে পেলাম দুধসাদা এম ভি কাবারাত্তি মাঝ সমুদ্র থেকে জাহাজের সমস্ত আলো জ্বালিয়ে ডাকছে আমাদের মতো দ্বীপবাসীদের। ঠিক করলাম, এই রাতটুকু জাহাজের আপার ডেক মানে ছাদে ঘুরে কালো সমুদ্রকে দেখব। দেখে নেব প্রপেলারের জল কাটার অদ্ভুত দৃশ্য। অবশেষে পরদিন সকালে ডাঙার মানুষ পৌঁছে গেলাম ডাঙায়। সঙ্গী হলো একরাশ না-ভোলা স্মৃতি।

 

অনলাইনে সরাসরি ‘সমুদ্রম’ প্যাকেজ অগ্রিম বুক করে টাকা জমা দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে আসা যায় লক্ষদ্বীপ। সেক্ষেত্রে উইলিংডন পর্যন্ত নিজেদের চলে যেতে হবে। দুয়েকটা ট্রাভেল এজেন্সি আছে যারা ‘কলকাতা থেকে কলকাতা’–সম্পূর্ণ যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেয়। একটু খুঁজে নিতে হবে। আমরা সেভাবেই গিয়েছিলাম। কোচি পৌঁছে ‘সমুদ্রম’-এ নিজেরা ব্যবস্থা করে নেওয়া যায়। কিন্তু সেটা কবে পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা কম বলে জেনেছি। জাহাজে ওঠা থেকে নামা পর্যন্ত যাবতীয় দায়িত্ব ‘সমুদ্রম’-এর। পর্যটক শুধু নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াবে। আগস্ট থেকে মার্চ সিজন। খরচ বিভিন্ন সিজনে বিভিন্ন রকম।

 

◾ছবি ঋণ ইন্টারনেট


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up