ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্পগাথা / ডিসেম্বর ২০২৫

সান্তাক্লজ

স্যুইমিং পুল চত্বরটা সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। একপাশে একটা মস্ত ক্রিসমাস ট্রি। সেই গাছের পাতায় লাল-নীল-হলুদ-সবুজ বল লাগানো। আরো জ্বলছে তারার মতো কয়েকটা ঝিকিমিক করে ওঠা টুনিবাল্ব। সবমিলিয়ে যেন তাক লাগিয়ে দিচ্ছিল চোখে। এই সবকিছু অবাক চোখে দেখছিল পুপু। এতো আলো, এতো সাজ–মধ্যে লাল কাপড় পরে সাদা দাড়ি লাগিয়ে ঘুরছে সান্তাক্লজ। হবে নাই বা কেন! আজ যে বড়দিন। কত দিন পর পুপু আবার বেড়াতে বেরিয়েছে বাবা-মায়ের সঙ্গে। অন্য সময় তো বাড়িতেই কেটে যায়। বাবার ছুটি থাকলে মায়ের ছুটি নেই। মায়ের ছুটিতে বাবার অফিস। এই প্রথম দুজনেরই একসঙ্গে ছুটি। তাই পুপুর এখন বাড়তি মজা।

 

        মস্ত বড় হোটেলটায় বড় বড় ঘর। সেখানে এক একটা ঘরে সব ছোট ছোট পার্টি হচ্ছে। পুপুদের জন্য একটা ছোটদের পার্টি হচ্ছিল তার ভিতরেই। বাবা-মা পুপুকে সেইখানে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে তো পুপুর চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হবার জোগাড়। এত খেলা চারিদিকে। এত গেমস পুপুর প্লে-স্কুলেও নেই। দূর থেকে রিং ছুঁড়ে দিতে হবে পাহাড়ের গায়ে। গলে গেলেই প্রাইজ। তারপর একটা বড় গোল মশারির ভিতর নানান রঙের অজস্র বল। যতো খুশি লাফাও, ঝাঁপাও, কেউ কিচ্ছুটি বলবে না।

 

-যাবো আমি?

পুপুর প্রশ্নে বাবা-মা দুজনেই প্রশ্রয়ের ঢঙে মুচকি হেসে সম্মতি জানাল। ঘরের একপাশে অনেকগুলো মানুষ লাল টুপি, সাদা লাল জোব্বা পরে সান্তাক্লজ সেজে আছে। কোনও গেমে কেউ জিততে পারলে, হাত নেড়ে তাদের কেউ না কেউ এগিয়ে আসছে গিফট নিয়ে। কী মজা! পুপু প্রাণ ভরে স্লিপ দোলনা চড়ল, সাপ লুডো, তির-ধনুক খেলল, প্রাইজও পেল অনেক। সান্তাক্লজ তো আসলে সেন্ট নিকোলাস। পুপুর স্কুলে দিদিমণিদের কেউ কেউ বলে সান্তাক্লজ বলে নাকি কেউ হয় না। অনেকদিন আগে ওই সেন্ট নিকোলাসই সান্তা সেজে সবার বাড়ি বাড়ি গিফট দিয়ে আসত চুপিচুপি। সে সান্তা হোক বা না হোক, এই হোটেলের সান্তাগুলোকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে–মনে মনে ভাবে পুপু। ইশ ! বছরের প্রতিটা দিনই কেন ‘বড়দিন’ হয় না কে জানে!

 

           মস্ত হোটেলে সন্ধ্যা হল যখন, তখন স্যুইমিং পুলের চারধারটা সেজে উঠল হরেকরকম রঙের আলোয়। এই হোটেলের বাউন্ডারি পার হলেই একটা বড় পার্ক। সেখানেও আজ মানুষ গিজগিজ করছে। পুপু দেখল, সেখানে তার মতো কতো ছেলেমেয়ে এসেছে। একটা মেয়ের ফ্রক তো অবিকল তারই ফ্রকের রঙে। দূরে দেখা যাচ্ছে একটা বড় আলো ঝিলমিল করা টাওয়ার। মা বলল ওটা আইফেল টাওয়ারের রেপ্লিকা। আসলটা দেখতে হলে যেতে হবে প্যারিস শহরে। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা বাড়ল। পুলের ধারে সেজে উঠল ফুড কোর্ট। সেখানে হরেক দেশের কতো রকমের খাবার–জাপান, ইন্দোনেশিয়া, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কেরালা, তাইওয়ান, আমেরিকান। সেসব খেয়ে শেষ করা অসম্ভব। মনে হবে খেয়েই যাই। এতো খেতে পারে মানুষ! খাবারের প্লেট সাজিয়ে পুলের পাশে স্টেজের কাছে বসল ওরা তিনজন। তখন একজন গান গাইছে স্টেজে। হোটেল থেকেই ভাড়া করে এনেছে বোধহয়। গায়কের গায়ে সান্তাক্লজের পোশাক। গিটার হাতে গাইছে ‘ড্যাশিং থ্রু দ্য স্নো…’। খুব আনন্দ হচ্ছিল পুপুর। মনে হচ্ছিল এ সন্ধ্যা যেন শেষ না হয়।

 

            কিন্তু খানিক পরে উঠে পড়তেই হলো। মা বলল, হিম পড়ছে। ঠান্ডা লেগে যাবে মাথায়। পুপুর উলের টুপিটা পড়ে আছে হোটেলের রুমে। ঘরে ফিরে এল বটে। কিন্তু পুপুর মন পড়ে রইল ওই পুলের পাশেই।  রাত নিঝুম। বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু পুপুর ঘুম এলো না কিছুতেই। রাতে চুপি চুপি সে বিছানা থেকে উঠে এসে কাঁচের জানলার সামনে দাঁড়াল। এখন কত রাত, কে জানে। পার্টির জমজমাটি এখন আর নেই। যেন ভাঙা হাট। হোটেলের লোকগুলো পুলের আশপাশ পরিস্কার করছে। ওদের ঘুম পায় না? ওরা সারারাত কাজ করবে? কী জানি, তাই হবে। ভাবতে ভাবতেই চমকে উঠল পুপু। তার কাঁধে হাত রেখেছে কেউ!

-বাবা! তুমি ঘুমোওনি?

-তুইও তো ঘুমোসনি।

-হ্যাঁ

-যাবি?

-কোথায়?

ওই লনটায়?

-এত রাতে! মা বকবে না? ঠান্ডা লেগে গেলে?

-টুপি সোয়েটার পরে যাবি। চল। মা তো ঘুমোচ্ছে। চুপি চুপি ঘুরে আসি।

 

       সন্ধ্যার সঙ্গে রাতের হোটেলটার যেন কোন মিল নেই। করিডোরগুলো সব শুনশান, খাঁ খাঁ করছে। পুপু আর তার বাবা তারই ভিতর চলল লনের দিকে। লিফট করে নেমে বাঁ হাতে সোজা হেঁটে গেলেই লন। পাশে স্যুইমিং পুলটা। লনে এতো রাতে কেউ নেই। পাশের পার্কটাও নিঝুম হয়ে আছে।

 দূরে আইফেল টাওয়ারের রেপ্লিকা থেকে ঝিকঝিক আলো ঠিকরে আসছে। পুপু বাবার হাত ধরে চলল সেই দিকে। আকাশ ভর্তি তারা। এই আকাশের তিন তারা দেখে একদিন তিন মহান পুরুষ পথ চিনে এসেছিল যিশু  খ্রিস্টের কাছে। ঈশ্বরের ছেলে যিশুখ্রিস্ট। এসব গল্প বলেছে মা পুপুকে।

-কেমন লাগছে পুপু?

পুপু ঘাড় নেড়ে বলল, খুব ভালো।

-চল তাহলে ফেরা যাক।

 

ফেরার পথে আবার ওই করিডোরটাই নিতে হতো। কিন্তু সে পথে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল পুপু। করিডোরে ঢোকার আগে মাঠে একটা বাহারি গাছ আছে। তার আড়ালে তিন চারটে ছায়ামূর্তি অন্ধকারে কী যেন করছে! ভয়ে ভয়ে খানিকটা কাছে কাছে আসতে পুপু বুঝল, ওগুলো আর কেউ নয়, সন্ধ্যাবেলার সান্তাক্লজরা। প্লেট নিয়ে খাচ্ছে। কিন্তু অমন অন্ধকারে কেন? করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে বাবাকে সেকথা জিজ্ঞেস করল পুপু। বাবা ভেবে বলল, “আসলে সান্তাক্লজদের তো খেতে নেই। সবাই ভাবে তারা দেবতা। তাই চুপি চুপি খাচ্ছে।” কিন্তু উত্তরটা মনে ধরল না পুপুর। তাই সে গোমড়া মুখ করে রইল। বাবা বোধহয় বুঝতে পারল কথাটা। তাই আদর করে বলল, “কি হল রাজকুমারী, মন খারাপ কেন?

-তুমি মিথ্যে বলছ। আমার মন ভোলাতে।

-কোথায়?

-ওরা চুপি চুপি খাচ্ছে কেন বলো?

বাবা এবার গম্ভীর হয়ে বলল, “তাহলে সত্যিটা শুনবি? দুঃখ পাবি না?”

-বলো।

-ওই সান্তাক্লজরা আসলে আশেপাশের গরীব মানুষ। হোটেল থেকে টাকা দিয়ে ওদের এনেছে। ওরা সারাবছর ভালোমন্দ খেতে পায় না তো! তাই আমাদের পার্টিতে যে খাবারগুলো বেঁচে গেল, সেগুলো ওরা খাচ্ছে। যদি সবার সামনে খায়, তাহলে সবাই ছি ছি করবে। তাই লুকিয়ে লুকিয়ে খাচ্ছে।”

পুপু একথা জানতে পেরে কষ্ট পেল খুব। ঘরে এসে ঘুমোতে যাবে, বাবা বলল, “ঘুমিয়ে পড়। আর সান্তাক্লজের কাছে পরের বছরের জন্য কী কী চাই বলে রাখ। কী চাইবি বল দেখি?”

-বলব?

-বল।

-আমি চাই, সামনের বছর পৃথিবীর সব সান্তাক্লজরা যেন অনেক অনেক খাবার পায়। আর সেই খাবার যেন তারা সকলের সামনে বসে খেতে পারে, লুকিয়ে লুকিয়ে নয়। কেমন?

বাবা ম্লান হেসে বলল, “বেশ তাই হোক। আমেন।”


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up