ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্প শুধু গল্প নয় / ডিসেম্বর ২০২৫

মায়ামানুষ

বনবিবি তলা পেরিয়েও জঙ্গলের দেখা নেই। অথচ কয়েক বছর আগেও এখানে এতটাই ঘন জঙ্গল ছিল যে, সূর্যের আলো পড়তো না। সেই জঙ্গল পাতলা হতে হতে এখন মাঝে মাঝে গাছগাছালি। এখান থেকে খুব একটা আর কাঠকুটো জোগাড় হয় না। বসতি ও অন্যান্য প্রয়োজনে জঙ্গল সাফ হচ্ছে প্রতিদিন। কমলাকে তাই অনেকটা আসতে হয় কাঠের খোঁজে, বনের গভীরে। এই কাঠ কুড়িয়েই তো চলে তাদের ঠাকুমা আর নাতনির সংসার। সেই কোন ছোট থেকে সে কাঠ কুড়িয়ে চলেছে। আগে ঠাকুমা সঙ্গে আসতো। ঠাকুরমার বয়স হয়েছে, পনেরো বছরের কমলা তাই এখন একাই আসে। জঙ্গলের সঙ্গে তার যে নিবিড় যোগ!

 

প্রতিদিন সকালে বের হয় সে, সারাদিন কাঠ কুড়িয়ে বিকেলে তেঁতুলগঞ্জে বংশীকাকুর গোলায় সেই কাঠ বেচে বাজার ও ঠাকুমার ওষুধ কিনে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে কমলা। তাদের গাঁয়ের অনেকেই এই কাজ করে।

আজ হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে আসে কমলা, এখান থেকেই শুরু ঘন জঙ্গল। পায়ে চলা পথ এদিক ওদিক চলে গেছে। এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ায় সে, পায়ে চলা পথে না গিয়ে যেদিকে সচরাচর কেউ যায় না, সেই দিকে সে চলে। কখনো গাছের ফাঁক গলে, কখনো নুয়ে কাত হয়ে ডিঙিয়ে, এভাবেই চলতে থাকে। জঙ্গল তাকে যেন হাতছানি দিচ্ছে। আয়, এই দিকে আয়।

 

এরপর হঠাৎই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যায় কমলা। এদিকটায় তো কোনদিনই আসেনি! ছোট বড়ো লাল মাটির টিলার ওপর বনভূমি। লাল পাথরের শেকড়ে জড়ানো গাছ, জংলি গাছের ঘন জঙ্গল। চড়াই উৎরাই সেই টিলার ওপর দিয়ে চলতে থাকে কমলা। উঁচু নিচু সেই অচেনা পথের অপরূপ সৌন্দর্যে কেমন যেন আত্মহারা হয়ে ওঠে সে। আর একটু, ওই তো আর কিছুটা উঠলেই টিলার চুড়া! হ্যাঁ ঐ চুড়ায় পৌঁছাতে চায় সে।  এভাবে চলতে চলতে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। অনেকটা উঁচুতে উঠে পড়েছে সে এখন, ওপর থেকে নিচের জঙ্গলটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ঠাকুমাকে গিয়ে তাই বলবে, জঙ্গলে নতুন এক পাহাড়ের খোঁজ পেয়েছে, এতদিন তা অজানাই ছিল। সে-ই কেবল এই জায়গাটার খোঁজ পেয়েছে। তাই যেন তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, এই পাহাড়, এই বনভূমি আমার–কেবলই আমার।

 

এরপরই ঘোর কাটলো কমলার। কখন যেন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। অথচ একটা কাঠও সংগ্রহ হয়নি। এরপর কখন ঝুপ করে সন্ধে নেমে এলো জঙ্গলের ভেতর। নিস্তব্ধতা যেন গিলে খাচ্ছে। একটু পরেই আকাশে চাঁদের উকি। তখন সমস্ত আনন্দ উবে যায় তার। একটা ভয় গ্রাস করে। বাড়ি ফিরবে কী করে! ঠাকুমা নিশ্চয়ই চিন্তা করছে, নয়তো কেঁদে ভাসাচ্ছে। এতদিন জঙ্গলে আসছে, এমনটা কোনওদিন হয়নি। ভয় করছে বড়। এদিক ওদিক তাকায় সে। একবার ভাবে ঢাল বরাবর নিচে নেমে আসবে। কিন্তু বুঝতে পারে না, কোনদিকের ঢালে নামবে! চারিদিকে নিঝুম অন্ধকার। তাছাড়া সমতলে নেমে এলে যদি বন্যপ্রাণীর খপ্পরে পড়তে হয়! টিলার ওপরে জঙ্গল খানিকটা পাতলা, মাঝে মাঝে উঁচু হয়ে থাকা দুই পাথরের মাঝে ছোট্ট ছোট্ট ফাঁক। যত সময় যায়, একটা ভয় উৎকণ্ঠা যেন চেপে বসে। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে বলতে, কেউ কি আছ, যে আমাকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করবে! সারাদিন হাঁটা, পা দুটো টনটন করছে খুব। প্রচন্ড খিদে আর তেষ্টায় গলার শব্দ যেন বেরোচ্ছে না, আড়ষ্ট হয়ে উঠেছে জিভ। একটা পাথরের ওপর বসে পড়ে কমলা।

 

এরপরই মনে পড়ে যায়, তার সাথে তো শুকনো খাবার আর জল আছে। ঠাকুমা বেঁধে দিয়েছিল কাগজের ঠোঙায়, চিঁড়ে-গুড় আর বোতলের জল খেয়ে নেয়। তার শরীরে যেন বল আসে, এরপরই মনে সাহস আনে কমলা। কোনও রকমে রাতটা পার করে ভোরের আলো ফুটলেই টিলার ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করবে সে। আর ফিরে যাবে তাদের মিঠিপুর গ্রামে। এখন তো আর কোনওমতে ফিরতে পারবে না। উঠে দাঁড়ায় কমলা, ধারালো দা-টা শক্ত করে ধরে। কিছুটা জমি সমতল করে, ঘাসগুলো কাটে। কাটতে শুরু করে বেশ কিছু গাছের ডাল, এরপর সেই ডাল লাল মাটিতে পুঁততে থাকে। এভাবেই চারিদিকে তৈরি করে আয়তকার আদল, এক একটা দেওয়াল। ঠেসাঠসি করে পোঁতা সেই গাছের ডাল যেন চার দেয়ালের একটা ঘর। এরপর ওপরেও সাজিয়ে দেয় কিছু শুকনো ডাল, আর তা কেমন করে যেন তৈরি হয়ে গেছে ছোট্ট কমলার ছোট্ট একটা কাঠের ঘর, তার রাতের আশ্রয়। এরপর কাটা ঘাসগুলো বিছিয়ে দেয় মেঝেয়। সঙ্গে কাঠ বয়ে নিয়ে যাওয়ার যে চটের বস্তা ছিল তা পেতে দেয়। একেবারে নরম বিছানা হয়ে ওঠে। এই জঙ্গলে ঘর বানাতে তার অনেকটা সময় লেগে যায়, শরীর যেন আর বইছে না। বসে পড়ে কমলা, রাত বেড়েছে।

 

বাকি খাবারটা খেয়ে, বাকি জলটাও ঢক ঢক করে খেয়ে নেয়। শরীর জুড়ে কেবলই এখন ক্লান্তি। দা-টাকে শক্ত করে ধরে হাতে, কেউ আক্রমণ করতে এলে যেন আত্মরক্ষা করতে পারে। এক সময় কমলা শরীরটা এলিয়ে দেয় ছোট্ট ঘরের সেই বিছানায়। কিন্তু মনের ভেতরে জমাট বাঁধা ভয়টা যে তাড়া করে বেড়াচ্ছে বড়! সে একা গভীর জঙ্গলে রাত কাটাচ্ছে। রাতের প্রতি প্রহরে জঙ্গলের পরিবেশ বদলায়। ঠাকুমার কাছে শুনেছে, কোন এক মায়ামানুষ নাকি থাকে এই জঙ্গলে। সে যে কাউকে ভুলিয়ে নিয়ে যায় তার গুপ্ত ডেরায়। যারা যায় তারা আর ফেরে না। সেও হয়ে যায় এক মায়ামানুষ। বুকের ভেতর যেন হাতুড়ি পেটার শব্দ পায় কমলা। এদিকে ঘুমে চোখ দুটো জুড়ে আসছে তার। এরই মাঝে যেন শুনতে পায় সে কোন এক  বন্যপ্রাণীর গর্জন, শোনা যায় তাদের চলাচলের শব্দ। কি করবে কমলা এখন!

 

জোছনায় ভেসে যাচ্ছে টিলার কাছে সেই জঙ্গল। আর সেই চাঁদের আলোয় দেখতে পায় সে–অজস্র ছায়ামূর্তি, ঘিরে ধরেছে তাকে, এগিয়ে আসছে তার দিকে। এরাই কি তাহলে মায়ামানুষ? সকলেই হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে চাইছে, কিন্তু সেই সব হাত তার ঘরের বাইরের কাঠের দেওয়ালে এসে আটকে যাচ্ছে। নানান সব হাত, ভিন্ন তাদের রূপ–কোনওটা লম্বা, কোনওটা খাটো, কোনওটা বাঁকা। কোনওটা মাথা নুইয়ে ঝুঁকে পড়েছে তার বাড়ানো ঘরের ছাদে। কিন্তু কেউই কোনোদিক থেকে তাকে ধরতে পারছে না।

 

এরপর হঠাৎই যেন সে মায়ামানুষের ডাক শুনতে পায়। তার নাম ধরে কেউ ডাকছে–কমলা, আয় আমার সঙ্গে। আমার সঙ্গে আয়। হঠাৎই ঘুমটা ভেঙে যায় এরপর। দেখে ভোরের আবছা আলো এসে পড়েছে তার ঘরে। কানে আসছে পাখিদের কলতান আর শিরশির হাওয়ার শব্দে গাছেদের নাচন, কানাকানি। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে কমলা। ঢাল বেয়ে নামতে হবে এবার। সকাল সকাল কাঠ কুড়িয়ে বংশীকাকুর গোলায় যেতে হবে। ঠাকুমা নিশ্চয় জঙ্গলের পথ ধরে তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে। সজাগ থাকে কমলা। ঠাকুমার ডাক শুনলেই চিৎকার করে বলবে, এইতো ঠাকুমা আমি এখানে। তুমি চিন্তা করো না, এখুনি আমি আসছি। মায়ামানুষ বলে কিছু নেই ঠাকুমা। সবই মানুষের মনগড়া ভয়ের গল্প। অজানাকে না জানার ভয়!

 


পাঠকদের মন্তব্য

রিংকু চ্যাটার্জি লিখেছেন... ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৫
খুব ভালো লাগলো ছোট্ট গল্পে অনেক বড় ইঙ্গিত দিয়েছেন, আমরা সবাই এই ভাবে এক অজানা অচেনা ভয় বহন করে এগিয়ে চলেছি জীবন যাত্রায়।

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up