ছোটোদের চাঁদের হাসি / দেশ-বিদেশের গপ্পো / ডিসেম্বর ২০২৫

উড়ন্ত মেঘ

(চিন দেশের গল্প)

মূল লেখা : ইয়ান ওয়েননিঙ্

ভাষান্তর : কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়

 

উর্ধ্ব আকাশে একখন্ড বিস্ময়কর মেঘ যেন অন্তহীন বাতাসে ভেসে চলেছে লঘুচিত্তে, খুশিমনে সর্বদা তার আকৃতি বদল করে চলেছে। সে হলো সূর্যের কন্যা ও চাঁদের ভগ্নী। তবে এতই সে প্রাণোচ্ছল ছিল, কোনো উদ্বেগ তার ধারে কাছে আসত না। আদরে সযত্নে সূর্য নিজের আলোর পরশ দিয়ে তার শরীরকে মুড়ে দিলো।  মানুষজন তাকে পছন্দ করত এবং তার রূপের প্রশংসা করত। খুব মসৃণভাবে তার দিনগুলি কেটে গেল এবং সে ভাবল, তার এই সৌভাগ্যের বিষয়গুলি একান্ত স্বাভাবিক। কখনো কখনো সে স্বগতভাবে বলত, আমি হলাম সূর্যের মেয়ে এবং চাঁদের বোন, কারোর নিজেকে আমার সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়! এছাড়া আমি সুন্দরী–কবিতায় যেমন সুন্দরীর বর্ণনা থাকে। আমি বহু স্থানে ভ্রমণ করেছি এবং সেখানে কতগুলি বিস্ময়কর দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছি। আমি অনেক উঁচুতে উড়তে পারি। আমাকে কে না ঈর্ষা করে? আমার মতো সুখী আর কে আছে!

 

         ভাসমান মেঘ যে বিষয়ে সব থেকে উল্লসিত–তা হলো বাতাসে ভেসে সর্বত্র ঘুরে বেড়ানো। আকাশে তার পছন্দের জিনিস আছে। সে ছোটো বড়ো এরোপ্লেন দেখতে ভালোবাসে–যেন শিস দিয়ে তার পাশ দিয়ে বা উপর দিয়ে চলে যায়। এছাড়া রয়েছে বহু রকমের বেলুন–শান্তভাবে এপাশ-ওপাশ করছে খানিকটা নিচে। মাঝে মাঝে সে নিজেকে একটি বড়ো এরোপ্লেন বা বেলুন হিসাবে কল্পনা করে। শিশুদের ওড়ানো ঘুড়ি দেখলে তার মনে গর্বিত ভাবনার উদয় হয় এবং নিজেকে অনেক সময় সে সবথেকে সুন্দর  ও বৃহত্তম ঘুড়ি হিসাবে কল্পনা করে। ঈগলপাখির মসৃণ গতি, সোয়ালো পাখির একে অপরকে তাড়া করা, পায়রাদের চক্রাকারে ঘোরা এবং ডাক দেওয়া–এসবই তার মনে আগ্রহের জন্ম দেয়। তারপর অবশ্য সে নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর পাখি বলে কল্পনা করে।

 

             এই বিশ্বে এছাড়া আরও কত কিছু দেখবার আছে! তার চোখে ট্রাক্টর, ট্রাক এসবই ছোটো খেলনার সমান! চাষের ক্ষেতের বিশাল এলাকাকে তার চোখে অসংখ্য ছোটো ছোটো বর্গক্ষেত্র বলে মনে হয়, যেগুলি দিয়ে দাবার বোর্ড বানানো যায়। নদী ও সেচের খালগুলিকে দেখা যাচ্ছে মোটা ও সরু রেখা। নিচে সব বাড়িগুলিকেই তার দেশলাই বাক্সের মতো লাগে, পুকুর ও দীঘিগুলিকে নানা আকারের আয়না বলে মনে হয়। এবং গুল্ম জাতীয় ফলের গাছগুলিকে সবুজ ও পশমের গোলা বলে মনে হয়।  এগুলির মাঝে কখনো সে শিশুদের  দেখতে পায় চালের দানার আকারের। সম্ভবত সে শিশুদেরই সর্বাধিক ভালোবাসে। কারণ, সে তাদের দম দেওয়া পুতুলের মতো মনে করে–এমনকী তাদের থেকেও আদরের।

 

           ভাসমান মেঘ নতুন জিনিস পছন্দ করে এবং সবকিছুতেই সে আগ্রহী। যখনই নতুন কিছু তার চোখে পড়ে, সে সর্বদাই সেটিকে এক নজর দেখতে চায়। কিন্তু তার আগ্রহ সাধারণত সেখানেই শেষ হয়।  অর্থাৎ তার কোনো ধৈর্য নেই। জিনিসগুলি শীঘ্রই তার চোখে নিজেদের নতুনত্ব হারিয়ে ফেলে। সুতরাং যেখানেই সে গিয়েছিল, সে কিছু সময়ের জন্য থাকবে, তারপর সে সরে পড়বে। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত একবারও না থেমে সে এদিক থেকে ওদিক ভেসে বেড়ায়। সে কিছুরই যত্ন নেবে না এবং কিছুই করবে না।

 

        ভাসমান মেঘ সমালোচনা একেবারেই পছন্দ করে না এবং শুধুমাত্র নিজের প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে। সে সর্বদা শিশুদের মন্তব্যকে মনে রাখে– ‘মেঘটাকে দেখো, কী সুন্দর’। এই শব্দগুলি মনে পড়লেই সে খুব খুশি হয়ে আত্মহারা হয়ে পড়ে। সে নিজে যাই করে থাকুক, তার স্বপক্ষে অজুহাত দেয়। সে কোনো ব্যাপারে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য না করে দিনগুলিকে কাটিয়ে দিত ব’লে, তার কোনো বিষয়ে কোনো শঙ্কা বা  উদ্বেগ কখনো ছিল না।

 

          কখনো সূর্য তাকে কোনো কাজ করার কথা মনে করিয়ে দিলে, সর্বদাই তার উত্তর হতো–‘এক মিনিট অপেক্ষা করো’। যদি চাঁদ তাকে কোনো কাজ করার জন্য তাগাদা দিত, সর্বদা তার উত্তর ছিল –‘আমি জানি, এ কাজের কোনো তাড়া নেই’। যদি সূর্য বলত, সে তার মস্তিষ্ককে ব্যবহার করে না, সে কাঁদতে কাঁদতে বলত–“আমার মস্তিষ্ককে ব্যবহার করি না বলতে তুমি কী বলতে চাও? আমি এখনও ছোটো, খুবই ছোটো।” চাঁদ যদি বলে সে সর্বত্রই ইতস্তত ঘুরে বেড়ায়, এমনকী যখন কোনো খেলায় অংশ নেয়, সেই খেলাটিও শেষ হবার আগেই সরে যায়–তখন ভাসমান মেঘ রাগতভাবে তর্ক করে–”বাতাসকে কি তুমি কখনো দেখেছ?  আমি তার থেকে অন্তত ভালো। বাতাস বিদ্যুৎগতিতে এখানে-সেখানে–সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। এক মুহূর্ত আগেও সে এখানে ছিল এবং এখন সে উধাও–কোথায় যে গেছে কেউ জানে না।”

 

একটি স্কুলছাত্রের আচরণ লক্ষ্য ক’রে, সূর্য কখনো বলে–ভাসমান মেঘ হলো একটি অলস ছাত্রের মতো। স্কুলছাত্রটি একটি প্রাঙ্গণে গাছের ছায়ায় বসে তার পড়াটা ঝালিয়ে নিচ্ছিল। তার হাঁটুর ওপরে একটি বই রাখা ছিল, কিন্তু বহুক্ষণ ধরে সে একটি পাতাও ওল্টায়নি। সে তার চোখগুলি চারিদিকে ঘোরাচ্ছিল ও হাই তুলেছিল। এমন সময়ে অন্য কয়েকটি ছেলে এসে তাকে ডাকল– ‘এসো বল খেলি। চটপট চলে এসো’! ছেলেটি তখন খুশি মনে লাফ দিয়ে উঠল। খোলা বইটি চেয়ারের ওপরে ছুঁড়ে ফেলে দৌড়ে খেলতে চলে গেল। সূর্য মেঘকে বলল, “চেয়ে দেখো, এই ছোট ছেলেটির সঙ্গে তোমার স্বভাবের কত মিল!” সে যা বলেছে তা অন্যায্য ভেবে, মেঘ উত্তর দিলো, “আমি তার থেকে একটু ভালো।”  যাই হোক, সে ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবল, ‘এটা কি সত্যি? বাস্তবে আমি খানিকটা তার মতো…’! আর বেশি কিছু ভাবতে না চেয়ে সে খেলতে খেলতে কোথায় চলে গেল!

 

এইভাবে কতদিন যে চলতে থাকল–কেউ জানে না। কিন্তু ভাসমান মেঘ আকারে ক্রমে ক্রমে বড়ো হতে লাগল। ভেসে যাবার সময়ে সে হ্রদ ও  সমুদ্র থেকে বাষ্প শুষে নিয়ে আরও বৃহৎ আকার ধারণ করল। শস্য থেকে মিষ্টি বাষ্প ও কৃষকদের দেহের ঘাম থেকে নোনা বাষ্প তার মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন এনে দিলো। যদিও তার চরিত্রে বেশি রূপান্তর ঘটল না। তবু একটি ঘটনা ঘটল। সে ক্রমে ভারী হতে থাকল এবং অল্প করে আকাশ থেকে নিচের দিকে নেমে আসতে থাকল। পরে সে ভাসতে ভাসতে এলো একটি হ্রদের ধারে, যার পাশে একটি পাথরের উপরে একটি পক্ককেশ বৃদ্ধ জপমালা হাতে ধ্যানে মগ্ন।

        অভ্যাস অনুসারে ভাসমান মেঘ বৃদ্ধ ভদ্রলোকের দিকে একবার দৃষ্টি না দিয়ে পারল না, যিনি অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর মাথা তুললেন এবং কথা বলতে শুরু করলেন তার সঙ্গে।

      বৃদ্ধ ভদ্রলোক ছিলেন এক দার্শনিক, যিনি ভাসমান মেঘের সঙ্গে গভীর বিষয়ে আলোচনা করলেন। তাঁর বেশির ভাগ কথাবার্তাই মেঘের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। কিন্তু সে এই দুটি বাক্য শুনেছিল– ‘জীবনের অর্থ  কী?...জীবনটা ভাসমান মেঘের মতো হওয়া উচিত নয়’।

       এই প্রথমবার এমন কথাবার্তা ভাসমান মেঘকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল। এই অস্বস্তি তার হৃদয়ে একটু একটু করে বাড়তে থাকল।

 

         কিছুদিন এভাবে খেলে ও ভেসে ভেসে কাটাবার পর ভাসমান মেঘ আকৃতিতে আরো খানিক বড়ো হলো। নানা ধরনের বাষ্প থেকে মানব জীবনের নানা স্বাদ-গন্ধ সংগ্রহ করে সে খানিক জটিল হয়ে পড়ল এবং আকাশ থেকে  ঝুলে পড়ল।

          একদা ভাসমান মেঘ একটি ছোটো শহরের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। সেখানে দেখল যে একটি একাকিনী ছোটো বালিকা সরু গলির এক কোণে মনের দুঃখে কেঁদে চলেছে। ছোটো বালিকারা তার বিশেষ আদরের হওয়ার জন্য ভাসমান মেঘ জীবনে এই  প্রথম মনযোগ দিয়ে তার কান্নাভরা সম্পূর্ণ অভিযোগটি শুনল। এই অলস ছাত্রী ছোটো বালিকাটি নিজের মাকে খুঁজে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

      “মা,মা, ফিরে এসো! আমাকে যেন ফেলে যেয়ো না!”

       ছোট বালিকাটি আরও অনেক কিছু বলে চলল। তার কিছু অংশ ভাসমান মেঘকে খানিক আহত করল। সে বলল, “মা আমাকে নিজের মস্তিষ্ককে ব্যবহার না করার জন্য যে তিরস্কার করেছিল, সেটা ঠিকই করেছিল। আমি সজাগ ও চিন্তাশীল নই। খানিকটা মাথাহীন মাছি বা উদ্দেশ্যহীন স্বপ্নচারী মেঘের মতো…!”

        শেষের কথাগুলি শুনতে পেয়ে ভাসমান মেঘ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কারণ, এই ছোটো বালিকাটির কথাবার্তা বুঝতে পারা বৃদ্ধ দার্শনিকের কথাকে বোঝার থেকে অনেক সহজ তার পক্ষে। আবার সে বুঝতে পারল যে মানুষেরা তার সমালোচনা করছে। ফলে সে আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল।

 

         ‘আমি কি মাথাবিহীন মাছির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি? আমি কি সর্বদা স্বপ্নে মগ্ন রয়েছি?’–ভাসমান মেঘ এই প্রথমবার নিজেকে প্রশ্ন করল। তার মনে আরও প্রশ্ন এলো, আমি কি একদিন  অবশ্যই স্বাধীন হব এবং কাজ করতে থাকব? আমি কি একদিন আমার বাবাকে ছেড়ে যাব? আমার বোন কি একদিন আমাকে ত্যাগ করবে?’ এই সব প্রশ্নগুলিই তার মনে ভারী হয়ে দেখা দিল এবং তাকে আরো অস্বস্তিতে ফেলে দিল— যাতে সে পৃথিবীর আরও কাছে নেমে এলো।

 

           অন্যমনস্কতার ভাসমান মেঘ খরা কবলিত একটি অঞ্চলের উপর দিয়ে উড়ে চলেছিল। যেখানে ক্ষেতগুলি জ্বলে-ফেটে গেছে, সেচের খালগুলি শুকিয়ে গেছে, শস্যগুলি শুকনো ও হলুদবর্ণ এবং পাতাগুলি নুয়ে পড়েছে। আবহাওয়া গুমোট হয়ে রয়েছে এবং বাতাসের বেগে ধুলোর মেঘ উড়ছে। সেখানে বেশ কিছু মানুষ ভিড় করে নানা কাজে ব্যস্ত রয়েছে। বয়স্করা কাঁধে-বাঁকে করে দূরের নদী থেকে জল বয়ে এনে ক্ষেতে ঢালছে, শিশুরা ওয়াশ-বেসিন জলে ভরে রাখছে এবং শস্যের গোড়ায় জল দিচ্ছে। তারা পরিশ্রমে ঘামতে ঘামতে গান গাইছে— ‘শস্যগুলি তৃষ্ণার্ত, তাদের জলের একান্ত দরকার…’।

         এটি একটি কঠিন ও দীর্ঘায়ত লড়াই ছিল, যেখানে সবার ধৈর্য ও শারীরিক শক্তি একান্ত দরকার।

     এই দৃশ্য দেখে ভাসমান মেঘের অন্য কোথাও উড়ে চলে যাবার কথা মনে এলো না। এরপর একটি ছোটো ছেলে হঠাৎই মাটিতে পড়ে গেল। সে গ্রীষ্মের তাপে ও পরিশ্রমে একান্তভাবে পরিশ্রান্ত ছিল। তাকে সাহায্য করতে দৌড়ল অনেকে। রক্তহীন হয়ে পড়েছে তার মুখ। ছেলেটি উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। এসবে ভাসমান মেঘ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। কারণ, সে শিশুদের প্রতি বিশেষভাবে স্নেহপরায়ণ ছিল। সে তাকে সাহায্য করতে চাইল।

      যখন তার মনে চিন্তা এলো, এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। হঠাৎই তার সারা শরীর বেয়ে একটা জোরালো স্বতঃস্ফূর্ত কাঁপুনি নেমে গেল–একটি সত্যিকারের আনন্দময় গভীর কাঁপুনি, যেমনটি সে আগে কখনো অনুভব করেনি। সে অনুভব করল, এক  অজানা শক্তি তার মধ্যে জেগে উঠেছে, যা আগে কখনো ঘটেনি— জাগছে কাজ করবার এক তাগিদ।

 

      এই সময়ে অনেকগুলি ছোটো ছোটো মেঘ তার কাছে এসে জড়ো হল এবং তারা একত্রে জোড়া লাগতে শুরু করল। হঠাৎই ভাসমান মেঘ অনেক গুণ বড়ো হয়ে গেল এবং বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। হঠাৎই সে এমন একটি বাক্য উচ্চারণ করল, যেমনটি সে আগে ভাবেইনি— ‘জনসাধারণের জন্য কিছু করো’। ঠিক এই কথাটাই বৃদ্ধ দার্শনিক তখন বলেছিলেন। ভাসমান মেঘের মনে একটি আদর্শের জন্ম হলো। এতদিন ধরে যে জিনিসটি সে বুঝতে পারেনি–এমন একটি জিনিস সে তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল এবং উত্তেজিত ও খুশি হয়ে পড়ল।

       সে  নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না, একটি জোরালো ঝাঁকুনির  সময়ে, সে হাসিতে ফেটে পড়ল— দমকে দমকে সশব্দে হাসি ও সেই সঙ্গে ঝকঝকে আলো। এটি হল বজ্র ও বিদ্যুৎ।

          এই সবকিছুর মধ্যে ভাসমান মেঘ, পৃথিবীর চারপাশে জলভরা বৃষ্টিদায়ী মেঘে পরিণত হলো। বৃষ্টিদায়ী মেঘ থেকে অসংখ্য ছোটো ছোটো বিশুদ্ধ জলকণা বের হলো। শুরু হলো বৃষ্টিপাত !!

          অশ্রুপাত করে বৃষ্টিদায়ী মেঘ খুশি মনে চিৎকার করল–‘যতটা সম্ভব বৃষ্টিপাত হোক’!

 

         পৃথিবীর মানুষেরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। তাদের বালতি-গামলা সব বের করে বৃষ্টিকণাকে ধরতে লাগল। যে ছোটো ছেলেটি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, সে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল। তার হাসিমুখটি আরক্ত হয়ে রয়েছে। সে বৃষ্টিদায়ী মেঘের দিকে হাত নাড়ল।

         শিশুরা আবার গান করতে শুরু করল— ‘শস্যেরা আর তৃষ্ণার্ত নেই, প্রচুর জল এখন…’!

 

        কী প্রবল বৃষ্টি! বালতি ও গামলার ওপরে সশব্দে বারিপাত ঘটে চলেছে। মানুষেরা মাথায় বাঁশের তৈরি ‘টোকা’ জাতীয় টুপি বা প্লাস্টিকের চাদর চাপা দিয়ে চলেছে, পরস্পরের সঙ্গে ঠাট্টা করছে এবং খুশিতে নাচে মেতে উঠেছে। মুরগিরা, কুকুররা ও গবাদি পশুরা ভয় পেয়ে বৃষ্টি-ঝঞ্ঝার আওয়াজে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। ব্যাপক পরিমাণ বৃষ্টির জলে সমস্ত শস্য, গাছ, লতাগুল্ম ও  ঘাস সজীব হয়ে বেড়ে উঠল। গর্জমান ছোটো নদীগুলির স্রোত কাদা-জলপথ বেয়ে বড়ো নদীতে এসে পড়ল। উৎসবে মাতোয়ারা জনতার ভিড়ে পৃথিবী উত্তেজিত হয়ে পড়ল। সব মানুষই কম্পমান বৃষ্টিদায়ী মেঘের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল– ‘বৃষ্টি ঝরতে থাকুক, যতোটা সম্ভব বৃষ্টি ঝরুক’!

 

      বৃষ্টিদায়ী মেঘ পৃথিবীকে মোটামুটিভাবে বেষ্টন করেছিল–পৃথিবীর ওপরে যা কিছু রয়েছে সবকিছুকে জড়িয়ে এবং ক্রমাগত কম্পমান অবস্থায় অশ্রুপাত করে চলল। এটিই সেই ‘জীবনের অর্থ’ যা বৃদ্ধ দার্শনিক বোঝাতে চেয়েছিল এবং যা সে এতদিনে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হলো। সে বিরামহীন ভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে চাইল এবং আর সে ভাসমান মেঘ হয়ে এদিক সেদিক আকাশে ঘুরে বেড়াতে রাজি নয়। বলাবাহুল্য, এই পরিবর্তনে সূর্য ও চন্দ্রও খুবই খুশি হল। ভাসমান মেঘের গল্পের এখানেই ইতি।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up