ছোটোদের চাঁদের হাসি / জেনে নিতে মানা নেই / নভেম্বর ২০২৫

নাটকের গল্প : গ্রিস

উৎসবের দেশ গ্রিস

অনেক অনেক দিন আগে, আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ভূমধ্যসাগেরর বুকে ছিল এক সুন্দর দেশ–গ্রিস। সেই দেশের মানুষেরা খুব আনন্দপ্রিয় ছিল। তারা বিশ্বাস করত, দেবতারা খুশি থাকলে, দেশ ভরে উঠবে সুখে-শান্তিতে। তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব হতো ডায়োনিসাস দেবতার নামে। তিনি ছিলেন আনন্দ আর উল্লাসের দেবতা। তাঁর উৎসবকে বলা হতো ডায়োনিসিয়া। তাই এই উৎসবে মানুষ গান গাইত, নাচত আর অভিনয় করত। সেখান থেকেই জন্ম হলো নাটকের।

 

কোরাস আর থেসপিস

শুরুর দিকে, উৎসবে সবাই মিলে গান গাইত। এই গানের দলকে বলা হতো কোরাস। কোরাস একসঙ্গে গান গেয়ে দেবতাকে খুশি করত। একদিন সেই দলের মধ্যে একজন হঠাৎ আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে কোরাসের সঙ্গে কথা বলা শুরু করল। এভাবেই জন্ম হলো সংলাপ বা ডায়ালগের। এই অভিনয়ের প্রথম শিল্পীর নাম ছিল  থেসপিস। তাই তাঁকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম অভিনেতা।

 

ট্র্যাজেডি : দুঃখের নাটক

গ্রিসে প্রথমে তৈরি হলো ট্র্যাজেডি। ট্র্যাজেডির মানে দুঃখের নাটক। এখানে বীর যোদ্ধা, রাজা-রানী বা দেবতাদের দুঃখের গল্প বলা হতো। কখনও মৃত্যু, কখনও বিশ্বাসঘাতকতা, কখনও ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলা–সব মিলিয়ে নাটক ভরে থাকত চোখের জলে।

কিন্তু এই দুঃখের মধ্য দিয়েই মানুষ শিখত–

  • দুঃখের সময়েও সাহস রাখতে হয়।
  • ন্যায় আর কর্তব্য পালন করতে হয়।

তিনজন বড় নাট্যকার এই ধারাকে বিখ্যাত করে তুলেছিলেন–এস্কাইলাস, সফোক্লিস, ইউরিপিদিস। তাঁদের নাটক আজও সারা পৃথিবীতে পড়ানো হয়।

 

 

কমেডি : হাসির নাটক

সব নাটকই দুঃখের ছিল না। গ্রিসে জন্ম হয়েছিল কমেডি অর্থাৎ হাসির নাটকেরও। এখানে মানুষকে হাসানো হতো, তবে, শুধু মজা করার জন্য নয়। কমেডি নাটকে সমাজের ভুল, রাজনীতির খুঁত, মানুষের মজার অভ্যাস–সবই দেখানো হতো রসিকতার ছলে। দর্শকরা হেসে লুটোপুটি খেত, কিন্তু সেই হাসির মধ্য দিয়েই শিখত–ভুল করলে মানুষ হাসির পাত্র হয়। সবচেয়ে বিখ্যাত কমেডি লেখক ছিলেন এরিস্টোফেনিস।

 

স্যাটায়ার নাটক

গ্রিসে আরেক ধরনের নাটক ছিল স্যাটায়ার প্লে। এগুলো ছোট নাটক, যেখানে অর্ধমানব অর্ধপশু স্যাটায়াররা মজার কাণ্ড করত। এগুলো সাধারণত ট্র্যাজেডির পর অভিনীত হতো, যাতে দর্শকরা দুঃখের ভার থেকে একটু মুক্তি পায়।

 

নাটকের ঘর : অ্যাম্ফিথিয়েটার

গ্রিসে  নাটক হতো বিশাল মঞ্চে, যাকে বলা হতো অ্যাম্ফিথিয়েটার।

  • এগুলো পাহাড় কেটে বানানো হতো।
  • আসনগুলো ছিল অর্ধচন্দ্রাকৃতির।
  • কয়েক হাজার মানুষ একসঙ্গে নাটক দেখতে পারত।

অভিনেতারা পরতো বড় বড় মুখোশ। মুখোশ দেখে বোঝা যেত চরিত্রটি খুশি, দুঃখী না রাগী। মুখোশের মুখ ছিল বড় খোলা মুখ, যাতে দূরে বসা দর্শকরাও অভিনেতার গলার আওয়াজ শুনতে পায়।

 

 

কোরাসের জাদু

গ্রিক নাটকে কোরাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা গান গাইত, নাচত, আর দর্শকদের গল্প বুঝতে সাহায্য করত। কখনও কোরাস মন্তব্য করত, কখনও দর্শকের হয়ে প্রশ্ন করত। তাই নাটক শুধু অভিনেতাদের ছিল না, কোরাসও নাটকের প্রাণ ছিল।

 

অ্যারিস্টটল : নাটকের শিক্ষক

গ্রিসে শুধু নাটক অভিনয় হয়নি, নাটক নিয়ে ভাবনাও হয়েছিল।

একজন মহান দার্শনিক ছিলেন অ্যারিস্টটল। তিনি লিখেছিলেন Poetics নামের বই, যেখানে  তিনি বলেছিলেন—

  • একটি নাটকের শুরু, মধ্য আর শেষ থাকতে হবে।
  • চরিত্রদের ভালো সংলাপ বলতে হবে।
  • নাটক মানুষের মনে ভয় আর করুণা জাগাবে। আর শেষে তাদের মন হবে পরিষ্কার ও শান্ত।

এই নিয়মগুলোকে তিনি বলেছিলেন ক্যাথারসিস। আজও নাটক ও সিনেমা তৈরি করার সময় অ্যারিস্টটলেরর নিয়ম মানা হয়।

 

গ্র্যান্ড উৎসব : গ্রেট ডায়োনিসিয়া

প্রাচীন এথেন্সে প্রতি বছর হতো এক বিশাল নাট্য উৎসব–গ্রেট ডায়োনিসিয়া।

  • এখানে নাট্যকাররা নিজেদের নতুন নাটক দেখাতেন।
  • ট্র্যাজেডি, কমেডি আর স্যাটায়ার–সব ধরনের নাটক অভিনীত হতো।
  • সেরা নাটক বেছে নেওয়া হতো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।

এটি ছিল শুধু বিনোদন নয়, মানুষের শিক্ষা আর শহরের গর্বও।

 

আজকের নাটক-সিনেমায় গ্রিসের প্রভাব

আজ আমরা যখন নাটক দেখি বা সিনেমা দেখি, তখনও দেখা যায়, তার অনেক নিয়ম এসেছে গ্রিস থেকে।

  • গল্প ভাগ হয় শুরু, মধ্য আর শেষ ভাগে।
  • অভিনেতারা মুখোশ না পরলেও চরিত্রের আবেগ স্পষ্ট করে দেখায়।
  • পোশাক, আলো, সঙ্গীত–সবকিছু ব্যবহার করা হয়।

তাই বলা হয়, আধুনিক নাটক আর সিনেমার শিকড় লুকিয়ে আছে প্রাচীন গ্রিসে। 

প্রাচীন গ্রিসের মানুষ আনন্দ করতে করতে বানিয়েছিল নাটক। থেসপিস ছিলেন প্রথম অভিনেতা। এস্কাইলাস, সফোক্লিস, ইউরিপিদিস, এরিস্টোেফেনিস–এঁরা নাটককে বানিয়েছিলেন সারা বিশ্বের শিল্প। আর অ্যারিস্টটল শিখিয়েছিলেন নাটকের নিয়ম, যা আজও মানা হয়। তাই বলা হয়, গ্রিক নাটকই হলো আধুনিক পৃথিবীর নাটক আর সিনেমার প্রথম শিক্ষক।


পাঠকদের মন্তব্য

Tanuja Chakraborty লিখেছেন... ১১ই নভেম্বর, ২০২৫
পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। চমৎকার একটি বিষয়ের উপর লেখা।আশাকরি সবার ভালো লাগবে।

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up