ছোটোদের চাঁদের হাসি / জেনে নিতে মানা নেই / মে ২০২৬

কলকাতার কথকতা

(পর্ব ১)

ভেবেছিলাম ইতিহাসের পাতা থেকে কলকাতার কথকতা শুরু করব। কিন্তু বর্তমানের এমন কিছু কান্ডকারখানা নজরে আসতে শুরু করল যে ইতিহাসের বদলে ভূগোল দিয়েই এই লেখা শুরু করলাম।

       বেশিদিন আগের কথা নয়, তখনো রাইটার্স বিল্ডিং ছিল বাংলা সরকারের প্রধান কার্যালয়। ওটা ছিল আমারও কর্মক্ষেত্র। একদিন আমার কাজ সংক্রান্তই একটি চিঠি পেলাম বি. আর. বি. রোডের অন্য এক সরকারি কার্যালয় থেকে। এই বি. আর. বি. রোডকে ঘিরেই প্রশ্ন জাগে মনে। সেই প্রসঙ্গে পরে যাচ্ছি।

        আমার ছোটবেলা থেকেই কলকাতা চেনার একটা বাতিক ছিল। কলকাতা শহর এবং শহরতলী, এমন কী নতুন গড়ে ওঠা উদ্বাস্তু উপনিবেশগুলিতেও (কলোনি) ঘুরতে যেতাম একেবারে কিশোরবেলা থেকে–বলা যায়, উপনিবেশ গড়ে ওঠার আগে থেকেই, কলকাতা দেখার আনন্দে।

 

 

      নাহ, ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি না। একটি সুত্র আছে এখানে। কলকাতা শহরের রাস্তার নাম এবং এলাকাগুলো মূলত ইন্ডিয়া পোস্টের পিন কোড (PIN Code–Postal Index Number) বা পোস্টাল জোন অনুযায়ী বিভক্ত। আবার অনেক পুরোনো রাস্তার নামও বদলে গেছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী, দেশভক্ত বা সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান যাঁদের রয়েছে, অনেক ইংরেজ প্রশাসকের নাম বদলে তাঁদের কারো নামে সে রাস্তার নব নামকরণ হয়েছে। কলকাতার নতুন স্ট্রিট ডাইরেক্টরিতে দেখেছি হ্যারিসন রোড হয়েছে মহাত্মা গান্ধী রোড, ক্যানিং স্ট্রিটের নব নামকরণ হয়েছে বিপ্লবী রাসবিহারী বসু রোড। এমনি আরও কিছু পথের নাম পরিবর্তিত নামধারার সঙ্গে মিলিয়ে নব নামকরণ যেমন চিতপুর রোডের নাম রবীন্দ্রসরণি। এ নিশ্চয়ই এক নব প্রয়াস। কলকাতা পৌরসভার এ প্রয়াসে আমরা সাধুবাদ জানিয়েছিলাম।

 

কলকাতার রাস্তার নাম বদল যেমন হয়েছে, তেমনি কলকাতার চরিত্রেরও বদল হয়েছে। কলকাতাবাসীরা আর মহাত্মা গান্ধী রোড বলে না, বলে এম.জি. রোড। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে মহাত্মা বিশেষণে ভূষিত করেছিলেন, নইলে নামের এই সংক্ষিপ্তকরণে কী ঝঞ্ঝাটটাই না ঘটত। যেমন ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের নিজের ক্ষেত্রে, সে কথা পরে বলছি। যাক গে, কথা হচ্ছিল বি. আর বি. রোড নিয়ে। ডালহৌসি স্কোয়ারের আশে-পাশে এমন নাম!

          আমার সমস্যার কথা শুনে আমার এক বন্ধু হেসে বলল, তোর কি ইতিহাসের সামান্য পাঠও নেই? ওটা হল বিপ্লবী রাসবিহারী বসু রোডের সংক্ষিপ্তকরণ ! এ সংবাদে সত্যি আমি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলাম। পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেবার মতো পরিকল্পনার মহান জনকের নামের এই বিকৃতি? রাসবিহারী বসু ছিলেন ভারতে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের একজন অগ্রগণ্য বিপ্লবী নেতা এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অন্যতম সংগঠক। দিল্লিতে গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর এক বোমা হামলায় নেতৃত্ব দানের কারণে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি সুকৌশলে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার নজর এড়াতে সক্ষম হন এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে জাপানে পালিয়ে যান।

 

 

সেখানে গিয়েও অবশ্য দেশের শৃঙ্খলমুক্তির চর্চা থেকে বিরত হননি তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয়দের নিয়ে আজাদ হিন্দ সংঘ গড়ে তোলেন এবং তাঁর সকল প্রয়াস নবীন ভারতের শ্রেষ্ঠ সংগ্রামী সুভাষচন্দ্রের হাতে তুলে দেন। এই মহান সংগ্রামীর জীবন-তথ্য কী লুকিয়ে থাকবে বি.আর.বি. রোডের আড়ালে? এই সংক্ষিপ্ত নামের আড়ালে কেউ কি আগ্রহী হবে এমন দেশপ্ৰেমিক মহান বিপ্লবীর জীবনকথা জানতে, যিনি দেশে শুধু নয়, বিদেশেও জীবনপাত করেছেন দেশকে পরাধীনতা মুক্ত করতে।

 

          এবারে আরেক অভিজ্ঞতার কথা বলি। কদিন আগে আমার বর্তমান বাসস্থান সল্টলেক থেকে শিয়ালদহ অঞ্চলে একটি প্রেসে যাব বলে একটি গাড়ি ভাড়া করেছিলাম। গাড়িটা এগোচ্ছিল বেশ, আমার পুরনো পাড়ার কাছে। খেয়াল করিনি কখন যে গাড়িটা সোজা পথ ছেড়ে অন্য পথে ঢুকে পড়েছে। কোন পথে যাচ্ছি সে কৌতুহল মেটাতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। এখন রাস্তায় আগের মতো নেমপ্লেট চোখে পড়ে না। তবে দোকান অনেক বেড়েছে, দোকানের সাইনবোর্ডে নজর করতে হয়। এক দোকানে দেখি, কে. এস. সরণি। কিছুই বুঝলাম না। কয়েকটা কে. এস. সরণির সাইনবোর্ডের পর দেখি কবি সুকান্ত সরণি। মানে আমাদের আমলের বেলেঘাটা মেইন রোড। আমাদের আদিবাড়ির অদূরে এই রাস্তায় আমার স্কুল, যেটি ইতিমধ্যেই পার হয়ে এসেছি। সংক্ষিপ্তকরণের কে. এস.  যদি গোড়াতেই ঘোমটা খুলত, তাহলে আমার ছোটবেলাটাই হয়তো জীবন্ত হয়ে আমার কাছে ধরা পড়ত।

 

তবে এই সংক্ষেপিত নামকরণে সম্ভবত স্বর্ণপদক পাবে  কলকাতার উপকণ্ঠের একটি শহর। এখানে তার নাম বলছি না। একজন তার  বাড়ির ঠিকানা লেখা কার্ড দিয়েছিল তাতে পরিষ্কার লেখা কে.জি. রবীন্দ্রনাথ ! কে.জি. অর্থ কিলোগ্রাম নয় কবিগুরু। ভাবা যায় ? সংক্ষেপকরণের যুগে বিপ্লবী রাসবিহারী বসু হবেন বি.আর.বি., কবি সুকান্ত হবেন কে. এস.। তবে সব ব্যাপারের মত সংক্ষেপকরণের ক্ষেত্রেও কবিগুরু আর সকলকে টেক্কা দিয়েছেন–হয়েছেন কে.জি.। কবিগুরু কথাটা লেখা বা বলা এত কষ্টকর? কবিগুরুকে কে.জি. বলতে কী জিভটা খসে পড়ে না?

 

◾ ছবি ঋণ ইন্টারনেট


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up