ছোটোদের চাঁদের হাসি / জেনে নিতে মানা নেই / জানুয়ারি ২০২৬

সুকান্ত তোমাকে

 

বুকের মধ্যে চিনচিনিয়ে ওঠে ব্যথা। নিষ্ফল হাহাকার। ছিপছিপে চেহারা। রুখুশুকু চুল। ছোট্ট বুকটা আর ছোট মাথাটা অবিরত কবিতা ভাবনায় জারিত। বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ। 

 

জন্মেছিল ঝড়, ঝড়ের 

ঝনঝন এই গান গভীর 

বাজ বাজল মাদল ঢেউ রুদ্র ঢেউ দুলল বুক 

টলল যুগ অহল্যার ঘুম টলল

ভাঙল বাঁধ 

ভাঙল বাঁধ

ভাসল দিকচিহ্নহীন জলে জীর্ণ সময় বাসী 

সময় শেষ। 

—মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়

 

চলে গেলেন। বড়ো তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। তিনি কবি। তিনি বিপ্লবের অক্লান্ত কর্মী সুকান্ত ভট্টাচার্য। ১৫ আগস্ট ১৯২৬ থেকে ১৩ মে ১৯৪৭–এইটুকু সময় জুড়ে ছিল তাঁর নিঃশ্বাসী জীবন। এই কিশোর কবিকে বুঝতে হলে তাঁর সৃজনের প্রেক্ষাপটটি জেনে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। 

 

১৯৩০ সালে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। ওই সময়েই মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে সংগঠিত হচ্ছে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির জন্য সশস্ত্র বিপ্লবী প্রতিরোধ। ধনতান্ত্রিক বিশ্বে তখন দেখা দিয়েছে চরম অর্থনৈতিক মন্দা–জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা, অনাহার, অর্দ্ধাহার। জাপান, জার্মানি, ইতালিতে জনবিরোধী ফ্যাসিস্ট শক্তির অভ্যুত্থান। ১৯৩৯ সালে ঘোষিত হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আমাদের কিশোর কবির বয়স তখন তেরো। সেনাদের প্রয়োজনে ইংরেজ শাসক মজুদ করেছে খাদ্যশস্য। অনাহারী লক্ষ লক্ষ মানুষ। শস্যশ্যামল বাংলার বুকে নেমে এল ১৯৫০-এর মন্বন্তর–‘চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস…’!

 

        বেলেঘাটায় বাবা ও জ্যাঠামশাইয়ের যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন সুকান্ত। জ্যাঠামশাই নতুন বাড়ি করে আলাদা হয়ে গেলে সুকান্তদের আর্থিক দুর্দশায় পড়তে হয়। এই সময়ে মা সুনীতা দেবী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন। দারিদ্র্য আর অভাব পরিবারের নিত্যসঙ্গী। বেলেঘাটা হাইস্কুলে শিক্ষালাভ করেন সুকান্ত। সেখানেই কবিতা রচনার হাতেখড়ি। কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ‘কিশোর বাহিনী’র দায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর ওপরে। এই বাহিনীর আদর্শ মন্ত্র ছিল–শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেবা, স্বাধীনতা। বাংলার বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরীদের মনের বিকাশের কাজে ব্রতী হলেন কিশোর বাহিনীর এই দক্ষ সংগঠক। ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার কিশোর সভার পরিচালন ভারও অর্পিত হয় তাঁর ওপর। বিশ্রাম নেই। মাইলের পর মাইল হেঁটে কর্তব্য অবিচল। জীবন সংগ্রামে বিধ্বস্ত ক্লান্ত। 

‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় তারই প্রতিফলন–

 

আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,

প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি মৃত্যুর সুস্পষ্ট ছবি…!

আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়, 

আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন বেজে যায়।

—-------------

তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে,

দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে।

 

চতুর্দিকে শোষিত মানুষের অসহায় করুণ মুখচ্ছবি। একটি মোরগের কাহিনি, দেশলাই কাঠি, সিঁড়ি, সিগারেট প্রভৃতি কবিতায় তাঁর শোষণ-বিরোধী মনোভাবটি সুস্পষ্ট। এই ভাবনা প্রতিভাত হয়েছে ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায়—

 

 যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে 

 তার মুখে খবর পেলুম 

 সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, 

 নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার

 জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।

 খর্বদেহ নিঃসহায় তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত

 উত্তোলিত, উদ্ভাসিত 

 কী এক দুর্বোধ্য প্রতীক্ষায়।

 

দীপ্তকন্ঠে কিশোর কবি ঘোষণা করেন, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’! ওদিকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেনিন কার্জন পার্কে দাঁড়িয়ে সমাগত মিছিলকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘একটু পা চালিয়ে ভাই, শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে’!

যাদবপুর স্যানাটরিয়ামে পড়ে থেকেছেন লালা ঘাম রক্তসিক্ত শয্যায়। 

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন–

  সুকান্ত, তোমার গলা দিয়ে 

  রক্ত উঠত। বুকের পাঁজর 

  মনে হত ভেঙ্গে যাচ্ছে। গায়ে

  দিনরাত লেগে থাকত জ্বর 

  যক্ষ্মার মার।

 

বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রোত্তর কাব্যভুবনে এক পুরোধা লেখক। তাঁর সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার তখন সাহিত্য জগতে ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। সেই বুদ্ধদেব বসুর কাছে সুকান্ত গিয়েছিলেন একদিন। বুদ্ধদেবের প্রতিক্রিয়া—শক্তপোক্ত চেহারা, ছোটো করে ছাঁটা রুক্ষ চুল। আধময়লা মোটা জামা কাপড়। তার বড়ো বড়ো মজবুত হাত-পায়ের দিকে তাকিয়ে মনে হল, তার রক্তের আত্মীয়তা সেই কৃষক মজদুরেরই সঙ্গে, যাদের কথা লিখতে সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, গোর্কির মতো। তার চেহারাটাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। 

 

     মাতৃবিয়োগের পর বৌদি সরযুদেবীর আশ্রয়েই সুকান্তর বেড়ে ওঠা। তাঁর কাছেই যত আবদার অভিযোগ অনুযোগ। রবীন্দ্রসঙ্গীত বড়ো ভালবাসতেন এই কিশোর কবি। স্নান-আহারের ঠিক নেই। অগোছালো। তাঁর সেই বহুল পঠিত বহুশ্রুত কবিতা ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ পাওয়া যায় অন্যমনস্কতার বালিশের তলায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মনে করতেন তাঁর কবিতা বড়ো সোজাসুজি–কবিতার রহস্যময়তা, শব্দের ধ্বনিমাধুর্য তাঁর কবিতায় অনুপস্থিত। পরাবাস্তব অধিচেতনা বা চিত্ররূপময়তা হয়তো ততখানি প্রতিভাত নয়। কিন্তু সোজাসুজি বক্তব্য উপস্থাপিত হলেও আজও জনমানসে তাঁর লোকপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসেও অম্লান।   

 

   যেখানেই ত্রাণবন্টন, ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না, সেখানেই সুকান্তের উল্লেখ্য উপস্থিতি। বিষ্ণু দে’র ভাষায় ‘সুকান্তর কবিতা প্রকাশিত হল প্রতিশ্রুতিতে নয়, একেবারে পরিণতিতে’। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও সুকান্তর কবিত্বশক্তি নিয়ে নিঃসংশয় হয়েছিলেন। সুকান্ত মূলত কবি। তাঁর প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থগুলি হল ছাড়পত্র, মিঠেকড়া (কিশোর ছড়া সংকলন) অভিযান (কাব্যনাট্য), সূর্য প্রণাম (গান ও কবিতার মিশ্রন), হরতাল নামের এক বিচিত্র গল্প সংকলন। 

 

রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন কবিতায়।

  এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে,

  তোমার দানের মাটি তুলে ধরে। 

  এখনো স্বগত ভাবাবেগে, মনের গভীর অন্ধকারে   

  তোমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে।

       ( রবীন্দ্রনাথের প্রতি)

বর্তমানের রুদ্ধবাক যন্ত্রণার পরিসরে রবীন্দ্রনাথেই আশ্রয় নিতে চেয়েছেন তিনি–

  আমার প্রার্থনা শোনো পঁচিশে বৈশাখ,

  আর একবার তুমি জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের।   

  হতাশায় স্তব্ধ বাক্য, ভাষা চাই আমরা নির্বাক।  

  পাঠাব মৈত্রীর বাণী সারা পৃথিবীকে জানি ফের। 

        (পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশ্যে)

তাঁর কুণ্ঠিত জীবনে মাঝে মাঝে হতাশার সুর ধ্বনিত হয়েছে কিছু কিছু কবিতায়–

  আজ মনে হয় বসন্ত আমার জীবনে এসেছিল   

  উত্তর মহাসাগরের কূলে 

  আমার স্বপ্নের ফুলে 

  তারা কথা কয়েছিল 

           অস্পষ্ট পুরনো ভাষায়।

 

সাম্যবাদী কবির হৃদয় আনন্দে প্লাবিত হয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের যে কোনো স্বৈরাচারী শাসকের পতনে।

     ভেঙেছে সাম্রাজ্যস্বপ্ন, ছত্রপতি হয়েছে উধাও,   

     শৃঙ্খল গড়ার দুর্গ ভূমিসাৎ বহু শতাব্দীর 

      সাথী, দৃঢ় হাতে হাতিয়ার নাও।

          ( রোম : ১৯৪৩)

বিশ্বব্যাপী ঘন অন্ধকার। কবির উদ্বেল প্রশ্ন–এই কি পৃথিবী? মহাপৃথিবী আজ নিস্পন্দ অসাড়। যে কারণে তাঁর উদাত্ত আহবান—

    বিপ্লবী প্রাণ প্রস্তুত রাখ কাস্তে

    হাতিয়ারে শান দাও উদয়াস্তে। 

‘এক যে ছিল’ কবিতায় কবির কিছু আত্মজৈবনিক হতাশা ফুটে উঠেছে।

   এক যে ছিল আপন ভোলা কিশোর

   ইস্কুল তার ভালো লাগত না,

   সহ্য হত না পড়াশুনার ঝামেলা 

   আমাদের চলতি লেখাপড়া সে শিখল না কোনোকালেই 

 অথচ সে ছাড়িয়ে গেল সারা দেশের সবটুকু পাণ্ডিত্যকে…!

 

সেই ক্ষণজীবী বিপ্লবী স্ফুলিঙ্গকে অভিবাদন !

 

◾ছবি ঋণ ইন্টারনেট 


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up