প্রকৃতির আশ্চর্য সৃষ্টি একস্তরের জীবন্ত সেতু
শর্বরী ব্যানার্জি

প্রতি বছর মা দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে থাকি আমরা। পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে পুজোর ছুটি। আর পূজো শেষ হতেই ভ্রমণপিপাসু মন ছুটে যায় প্রকৃতির সৌন্দর্য অন্বেষণে। তোমরাও নিশ্চয়ই সুযোগ পেলেই পুজোর ছুটিতে বেরিয়ে পড়ো এদিক-ওদিক। গতবছর পূজোর ছুটিতে আমাদের গন্তব্য ছিল মেঘের দেশ মেঘালয়। মেঘ আর বৃষ্টির লুকোচুরি উপভোগ করার জন্য মেঘালয়ের কোনও বিকল্প নেই। এবার তোমাদের সেই মেঘালয়ের এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৃষ্টির গল্প বলব।
আমরা সপরিবারে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ধরে প্রথমে পৌঁছে গেলাম গৌহাটি। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, বন্দে ভারতে আমাদের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত আরামদায়ক। চা, বিস্কুট, কাটলেট, মিষ্টি, ফলের রস সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেশ তৃপ্ত হয়েই গৌহাটি স্টেশনে পৌঁছেছিলাম। স্টেশনে পৌঁছে বেশ কয়েকজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে দরদাম করে অবশেষে একটিতে চেপে বসলাম। শিলংকে তার সৌন্দর্যের জন্য বলা হয় পূর্ব ভারতের সুইজারল্যান্ড। শিলং পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে ট্যাক্সি কিছুটা এগোতেই হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি নেমে এলো আর নিমেষেই পাহাড়কে ধূসর চাদরে মুড়ে দিলো কুয়াশা। মজার কথা হলো, দুপুর দুটো নাগাদ যখন আমরা আমাদের থাকার জন্য নির্ধারিত ‘হোটেল শিলং’-এ পৌঁছলাম, তখন মেঘ আর কুয়াশা উধাও, সূয্যিমামা সোনালি রোদ ছড়িয়ে দিয়েছে l

সেদিনটা হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে, সন্ধ্যায় হোটেল থেকে বেরিয়ে বাজারের দিকে গেলাম। সেখানেই পরিচয় হলো অরিস নামের এক খাসি ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে। এরপর হাসিখুশি অরিস পরবর্তী তিনদিনের জন্য হলো আমাদের সঙ্গী এবং পথপ্রদর্শক। ঠিক হলো, শিলং, চেরাপুঞ্জি, ডাউকি, মাওলিনং ঘুরিয়ে শেষে আমাদের গৌহাটি পৌছে দেবে সে। পরদিন সেই মতোই যাত্রা শুরু হলো। ঘোরা হলো শিলংয়ের এয়ারফোর্স মিউজিয়াম, ডন বসকো মিউজিয়াম, চার্চ ও এলিফ্যান্ট ফলস ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, প্রত্যেকটি দ্রষ্টব্যই ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত শরীরে যখন হোটেলে ফিরলাম, তখন ঘড়ির কাঁটায় বিকেল পাঁচটা। ব্রেকফাস্টের পর আর কিছু খাওয়া হয়নি। বেশ খিদে পেয়েছিল। সুস্বাদু চাউমিন আর মোমো খেয়ে হোটেলের বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। সেই ঘুম ভাঙলো পরদিন সকাল আটটায় l
পরবর্তী গন্তব্য চেরাপুঞ্জি, থাকব সেখানকার এক হোমস্টে-তে। কথামতো গাড়ি এসে গিয়েছিল। আমরাও স্নান, ব্রেকফাস্ট সেরে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কুয়াশামাখা, বৃষ্টিস্নাত চেরাপুঞ্জি পৌঁছে হোমস্টে-তে আমাদের লাগেজ রেখে, চা পান করে সকলে বেশ তরতাজা হয়ে চেরাপুঞ্জির বিখ্যাত সেভেন সিস্টার ফলস দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। সে এক অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য! কুয়াশামোড়া পাহাড় অদৃশ্য। পর্যটকরা চাতকের মতো অপেক্ষা করছে কুয়াশামুক্ত পাহাড়কে সাতটি জলপ্রপাতসহ দেখবে বলে। আমরাও সজাগ! এরই মাঝে একটি বাচ্চা ছেলের থেকে বনকুল কিনে খেলাম। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, দৃশ্যমান হলো পাহাড় তার রূপালী জলধারার সাতটি জলপ্রপাত নিয়ে। সে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা !! এরপর একে একে দেখলাম আরও কয়েকটি জলপ্রপাত। প্রতিটি তার গর্জনে, পতনে, উল্লাসে অনন্য। হোমস্টে-তে ফিরে ডিনারে গরম মুরগির মাংসের ঝোল আর ভাত খেয়ে পাড়ি দিলাম ঘুমের দেশে।

পরদিন অরিস আমাদের জানালো, এবারে সে আমাদের নিয়ে যাবে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলিনং-এ l তবে, মাওলিনং পৌঁছনোর আগেই আমাদের জন্য আরও এক চমক অপেক্ষা করছিল। অরিস বাংলাদেশ বর্ডারের পাশ দিয়ে কিছুটা ঘুরপথে আমাদের নিয়ে এল ডাউকি নদীর সামনে। সে নদীর জল এতটাই স্বচ্ছ যে জলের নিচের নুড়ি-পাথর পরিষ্কার দেখা যায়। প্রচুর বৃষ্টি হওয়াতে রাস্তায় ধস নেমেছিল। তাই মাওলিনং পৌঁছতে আমাদের প্রায় বিকেল পাঁচটা বেজে গেল। অরিস প্রস্তাব দিল, হোমস্টে-তে ঢোকার আগে একস্তরের জীবন্ত সেতু দেখে নিতে, কারণ, পরদিন সকালে হাঁটা পথে মাওলিনং গ্রাম দেখা অধিক সুবিধাজনক হবে।
অতএব চললাম একস্তরের জীবন্ত সেতু দেখতে। মাওলিনং-এর দশ মিনিট আগেই রিওয়াই গ্রামে প্রায় তিনশো বছরের পুরানো রাবার গাছের শিকড় জুড়ে খাসি উপজাতির তৈরি স্থাপত্য একস্তর জীবন্ত সেতু দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম আমরা। এই সেতু সম্পর্কে একটু জানাই তোমাদের। লিভিং রুট ব্রিজ বা জীবন্ত শিকড়ের সেতু একটি অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময়। গাছের শিকড় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে প্রাকৃতিকভাবেই এই সেতু তৈরি হয়েছে। শক্ত শিকড় দিয়ে তৈরি হওয়ায় এটি অত্যন্ত মজবুত। সেতুর নিচ দিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে যাচ্ছে। এর চারপাশের শান্ত, মনোরম পরিবেশ সহজেই মুগ্ধ করে। সেতুর ওপরে সহজে যাতায়াতযোগ্য পথটি সব বয়সের মানুষের জন্য উপযোগী। মানুষ এই সেতু দিয়ে নিরাপদে নদী বা ঝরনা পারাপার ও চলাফেরা করতে পারে। পরিচ্ছন্ন ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ প্রশংসনীয়। চারপাশের ঘন সবুজ বনভূমি, নির্মল বাতাস এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে এই সেতু পর্যন্ত হাঁটার পথটিও হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ ও আনন্দদায়ক।

সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। পাহাড়ী উপত্যকায় আমরা নিচে নামার পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। সৌভাগ্যবশত মোবাইলে টাওয়ার থাকায় অরিসকে ফোনে যোগাযোগ করতে পারি। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে সে-ই ত্রাতা হয়ে আমাদের গাড়িতে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করে। সে রাতে মাওলিনং-এর হোমস্টে-র খাবার সাধারণ হলেও সুস্বাদু ছিল। হোমস্টে-র মালিক এবং তাঁর স্ত্রীর ব্যবহার ছিল অমায়িক। সকালে ছবির মত মাওলিনং-এর সাজানো গ্রাম আমাদের মুগ্ধ করলো। সুন্দর একটি চার্চ, স্কাইওয়াক করার স্থান, শান্ত পরিবেশ, ঝকঝকে রাস্তা—সবই ছিল চমৎকার। অবশেষে অরিস আমাদের পৌঁছে দিল গৌহাটি স্টেশনে। এবারে শিলিগুড়ি ফেরার পালা, বিদায় অরিস, বিদায় মেঘালয়, আবার দেখা হবে l

পাঠকদের মন্তব্য
250