বৈচিত্র-বৈভবে অতুলনীয় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ
অজন্তা চৌধুরী

তোমরা অনেকেই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নাম শুনেছ। যারা জানো না, তাদের বলি–আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ হলো ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যা বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য এই দ্বীপপুঞ্জ পর্যটকদের অত্যন্ত প্রিয়। প্রকৃতি ছাড়াও এই দ্বীপপুঞ্জের খ্যাতি এখানকার সেলুলার জেলের জন্য। আজ তোমাদের প্রথমে সেই কুখ্যাত সেলুলার জেলের গল্পই বলব। কেন কুখ্যাত, সেটা সবার আগে বলি। দেশ তখন পরাধীনতার নাগপাশে আবদ্ধ। দেশ জুড়ে চলছে স্বাধীনতা আন্দোলন। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তৈরি করেছিল এই সেলুলার জেল।

মূল ভূখণ্ড থেকে হাজার মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরের মাঝে এই দ্বীপটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং দেশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করাই ছিল ব্রিটিশ সরকারের লক্ষ্য। এই জেলের নামকরণ হয়েছিল এর অনন্য কাঠামোর জন্য, যেখানে কোনো সাধারণ ডরমিটরি ছিল না—শুধু পৃথক কুঠরি বা সেল ছিল। ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬-এর মধ্যে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে সেলুলার জেল। তিনতলা এই জেলে ৭টি শাখায় সারি সারি ৬৯৮টি সেল ছিল। ১৯৪১-এর ভূমিকম্পের ফলে ৪টি উইং ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে সেল সংখ্যা ২৯৬। প্রতিটি জানালাহীন সংকীর্ণ সেল অর্থাৎ কক্ষ, যার ৩ মিটার উঁচুতে রয়েছে ছোট্টো গবাক্ষ।

জেলের ছাদ থেকে চারপাশের নয়নাভিরাম প্রকৃতি সুন্দর দৃশ্যমান। রাজদ্রোহের অপরাধে ১৮৫৮ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দীপান্তরে সেলুলার জেলে পাঠায় ব্রিটিশ সরকার। ব্রিটিশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শহীদ হন বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী। টাওয়ারের দোতলার দেওয়ালে ১৩টি ফলকে অঙ্কিত রয়েছে তেমনই ৩৩৬ জন শহীদের নাম। স্বাধীনতার পরে নবসাজে সেজে উঠেছে এই জেল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গোবিন্দবল্লভ পন্থ হাসপাতাল। ১৯৯৩ সালের ২৮শে মে সেলুলার জেলের ভিতরে তৈরি হয়েছে ন্যাশনাল মেমোরিয়াল আর্ট গ্যালারি, যেখানে প্রদর্শিত হয় বিপ্লবীদের নানাবিধ স্মারক। সেলুলার জেলের light & sound একটি আকর্ষনীয় দ্রষ্টব্য, যেখানে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নানান উপাখ্যান উপস্থাপনা গুণে আগত দর্শকের মনে শিহরণ জাগায়। তোমরা আন্দামান বেড়াতে গেলে অবশ্যই সেলুলার জেল দেখে এসো।

এবার তোমাদের বলব, হ্যাভলক দ্বীপের (এখন নাম স্বরাজ দ্বীপ) কথা। রাজধানী পোর্ট ব্লেযারের (এখন শ্রী বিজয় পূরম) উত্তর-পূর্বে ৫০ কিলোমিটার জলপথে ১০০ বর্গ কিলোমিটার ব্যাপ্ত নয়নাভিরাম হ্যাভলক দ্বীপ । পাহাড়, সবুজের সমারোহে উজ্জ্বল এর শ্বেতশুভ্র বালুকাবেলা। অগভীর স্বচ্ছ জলে অগুনতি প্রবাল, সঙ্গে মাছেদের আনাগোনা। ঘুরে আসতে পারো হ্যাভলকের রাধানগর বিচে। হ্যাভলক থেকে বাস-অটো-ট্যাক্সি–যে কোনো ভাবেই ঘুরে আসা যায় রাধানগর বিচ। অর্ধবৃত্তাকার সৈকতবেলা,পাহাড় আর অরণ্য সব মিলিয়ে এই বিচ অতুলনীয়। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত–দুটোর জন্যই বিখ্যাত রাধানগর বিচ।

পোর্ট ব্লেযারের পূর্বে ৩৬ থেকে ৪০ কিমি দূরত্বে জলপথে যাওয়া যায় বাঙালি প্রধান নীল দ্বীপে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত এই দ্বীপকে বর্তমানে শহীদ দ্বীপ বলা হয়। এটি একটি শান্ত ও সুন্দর পর্যটনকেন্দ্র। আকারে ছোট হলেও আকর্ষণে হ্যাভলক-তুল্য। শ্রী বিজয় পুরম (পোর্ট ব্লেয়ার) বা স্বরাজ দ্বীপ (হ্যাভলক) থেকে ফেরির মাধ্যমে এখানে পৌঁছানো যায়। স্বরাজ দ্বীপ থেকে ফেরিতে সময় লাগে প্রায় ১ থেকে ২ ঘণ্টা। প্রধান আকর্ষণ হলো ভরতপুর বিচ ও লক্ষ্মণপুর বিচ। ভরতপুর বিচে স্নোরকেলিং ও বিভিন্ন জলক্রীড়ার ব্যাবস্থা রয়েছে। অপরূপ সূর্যাস্ত দেখার জন্য লক্ষ্মণপুর বিচ বিখ্যাত। এছাড়াও এখানে আছে প্রাকৃতিক সেতু (ন্যাচারাল ব্রিজ) যা সমুদ্রের ঢেউয়ের প্রভাবে ক্ষয়ে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক শিলা। এখানে এলে দেখতে পাবে প্রবালে ভরা অগভীর সমুদ্র, সোনালি বালুকাবেলা আর চমৎকার সবুজ দ্বীপ। হাতে দিন সাতেকের ছুটি পেলেই ঘুরে আসা যায় আন্দামান। বিমান কিংবা জাহাজ দুটোতেই যেতে পারো। একটু বেশি সময় হাতে থাকলে জাহাজের কোনো বিকল্প নেই। কারণ, এর মজাই আলাদা। থাকার জন্য সরকারি ও বেসরকারি নানা হোটেল ও রিসর্ট রয়েছে। ইন্টারনেটে সার্চ করলে সব খবর পেয়ে যাবে।

পাঠকদের মন্তব্য
250