নাম তার ইচ্ছামতী
মৃণালিনী ঠাকুর

সে এক কাক-ডাকা ভোর। সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাতে এক বান্ধবীর সঙ্গে রওনা দিলাম টাকির পথে। তোমাদের জানাই, টাকি হলো উত্তর ২৪ পরগনা জেলার এক শহর ও প্রাচীন পৌরসভা এলাকা, যা ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত। কলকাতা থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত টাকিতে যাওয়ার একাধিক পথ রয়েছে। আমরা মালঞ্চ রোডের পথ বেছে নিয়েছিলাম। আমাদের গাড়ি সায়েন্স সিটি পেরিয়ে এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণ পরেই পার হলাম ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ির গতি ছিল যথেষ্ট দ্রুত। ফলে, অচিরেই শহর ছাড়িয়ে পৌঁছে গেলাম শহরতলী। আর একটু যেতেই বদলে গেল পথের ধারের দৃশ্যপট। একের পর এক ঘুমন্ত গ্রাম ছাড়িয়ে একটা সময় একটি গঞ্জ-মতো এলাকায় দাঁড়ালো আমাদের গাড়ি।
রাস্তার ধারের এক চায়ের দোকানে একটু চা-বিস্কুট খেয়ে আবার পথে বেরিয়ে পড়লাম। শেষে বিদ্যাধরী নদী পার হয়ে আমরা সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম টাকিতে। থাকার জন্য বুকিং করা ছিল টাকি মিউনিসিপালিটি গেস্ট হাউসে। ফ্রেশ হয়ে, গরম গরম পুরি সবজি সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা গেলাম ইছামতীর পাড়ে। সেখানে ইতিমধ্যেই জমে উঠেছে টুরিস্টদের ভিড়। নদীর পাড় ঘেঁষা পার্কে ছুটোছুটি করছে তোমাদেরই মতো ছেলেমেয়ের দল। সব মিলিয়ে প্রথম দেখাতেই মন ভালো হয়ে গেল।

এবার তোমাদের জানাই ইছামতী ও সংলগ্ন এলাকা সম্পর্কে। এখানে ইছামতী বয়ে গেছে আমাদের দেশ ভারত ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে দু’পাশে রেখে। তাই এর ভৌগলিক গুরুত্ব অসীম। আন্তর্জাতিক সীমান্তের গুরুত্ব ছাড়াও, টাকি তার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্যও সমানভাবে পরিচিত। এখানে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন রাজবাড়ি, যদিও বেশিরভাগই এখন ভগ্নপ্রায়। তবু টাকি আজও তার গৌরবময় অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসের পাশাপাশি প্রকৃতির দিক থেকেও টাকি অনন্য। বিখ্যাত সুন্দরবনের অতি কাছেই অবস্থিত হওয়ায়, টাকিতেও দেখা মেলে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের। সংক্ষেপে বলতে গেলে, টাকি ইতিহাস, স্থাপত্য, প্রকৃতি এবং নদী ও আশেপাশের পুকুর থেকে ধরা টাটকা মাছের সুস্বাদু নানা পদ–সব মিলিয়ে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা উপহার দেয়।

কিছুটা সময় নদীর ধারে কাটিয়ে গেস্ট হাউসে ফিরলাম। লাঞ্চে ছিল ইলিশের দুর্দান্ত উপাচার। পেটপুজো সেরে ক্ষণিক বিশ্রাম। তারপরই বেরিয়ে পড়লাম গ্রামের পথে। প্রথমেই দেখতে গেলাম রায়চৌধুরী বাড়ির দুর্গাদালান, যা দেশের প্রাক্তন সেনাপ্রধান শঙ্কর রায়চৌধুরীর পরিবারের সম্পত্তি। এরপর দেখলাম জোড়া মন্দির, ম্যানগ্রোভ গাছ আর গোলপাতার জঙ্গল। মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখলাম অতি প্রাচীন এক ভগ্ন টাওয়ার, যাকে বলা হয় নলকূপ (Tube Well)। এইসব দেখতে দেখতেই বিকেল গড়ায় সন্ধ্যার দিকে। অপরূপ সূর্যাস্ত তখন ইচ্ছামতীর বুকে।
এবার টাকি ঘুরে বেড়াবার জন্য কিছু জরুরি তথ্য। জেনে রাখা ভালো, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এটি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BSF) নজরদারিতে থাকে। গোলপাতা বনে প্রবেশ করতে হলে পরিচয়পত্র (আই-কার্ড) সঙ্গে রাখতে হয়। গাড়ি প্রবেশের অনুমতি নেই, তাই মোটরভ্যান যাত্রীদের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। উঁচু কাঠের পায়ে চলা পথ ধরে হাঁটলে দেখা যায় ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য, যেগুলির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো শ্বাসমূল। এই পথ দুটি ভাগে বিভক্ত–একটি বনভূমির গভীরে চলে গেছে, আরেকটির অভিমুখ নদীর তীরের দিকে। এই পথে যেতে যেতেই নানাজাতের পাখির দেখা পেয়েছিলাম। সন্ধ্যা নামছে। তাই তাদেরও ঘরে ফেরার তাড়া। কিচিরমিচির শব্দে বনপথ ভরিয়ে তুলেছে পাখির দল, সে এক ভারি মজার কান্ড !!

আগেই বলেছি, ইছামতী নদীই ভারত ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত নির্ধারণ করে। তাই নদীই টাকির প্রধান আকর্ষণ। নৌভ্রমণের সুযোগ থাকলেও, বর্ষার কারণে আমরা সেটি এড়িয়ে গিয়েছিলাম। ইছামতী নদীর ধারে রয়েছে বেশ কয়েকটি পার্ক, যেখানে ওয়াচ টাওয়ার ও উঁচু মঞ্চ থেকে নদীর অপূর্ব ছবি দৃশ্যমান। ভারতীয় নৌকাগুলিতে ভারতের পতাকা আর বাংলাদেশের নৌকাগুলিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখা যায়। দুর্গাপূজার বিসর্জনের সময় এই নদী-সীমান্ত পরিণত হয় এক মিলনমেলায়, যখন দুই দেশের নৌকাগুলি থেকে পাশাপাশি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
গেস্ট হাউসে ফিরে কফি আর চিকেন পকোড়া খেয়ে আবার যাই নদীর ধারে। ভিড় এমন, মানুষের মেলা বসেছে যেন ! একটু পরেই ঘন অন্ধকার নামে নদীর বুকে। ছলাৎ ছলাৎ মৃদু ঢেউ তুলে ভেসে যায় নৌকার সারি। দূর থেকে শোনা যায় মাঝিমাল্লার গান। পরদিন ব্রেকফাস্ট করে নদীর সঙ্গে দেখা করতে যাই শেষবারের মতো। একটু পরেই আমাদের ফেরা। হাঁটতে হাঁটতে গেলাম টাকি ইকো পার্কে। এটি আসলে একটি রিসর্ট, তবে বাইরের দর্শনার্থীরাও প্রবেশমূল্য দিয়ে ঢুকতে পারেন। পর্যটকদের অলস বিচরণে মুখর প্রাঙ্গন।
~2.jpg)
এই অবকাশে জানাই, গোলপাতা বনে প্রবেশ, মোটরভ্যান ভ্রমণ, এবং ইছামতী নদীতে নৌভ্রমণের জন্য আলাদা প্রবেশমূল্য দিতে হয়। টাকির স্থানীয় দর্শনীয় স্থানগুলি ঘোরার জন্য টোটো পাওয়া যায়। আমরাও গেস্ট হাউসে গাড়ি রেখে টোটোতেই অঞ্চলটি দর্শন করেছিলাম, যেখানে টোটো চালকই গাইডের ভূমিকা পালন করেন। গেস্ট হাউসে ফিরে লাঞ্চ আর লাঞ্চের পরই কলকাতার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া। বিদায় ইচ্ছামতী।
পাঠকদের মন্তব্য
250