রোমাঞ্চকর ভিতরকণিকা
অজন্তা চৌধুরী

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই সুন্দরবনের বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ অরণ্যের কথা জানো। আমাদের চেনা সুন্দরবন ছাড়াও এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যের দেখা মেলে আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশায়। এই জায়গাটির নাম হলো ভিতরকণিকা। আজ তোমাদের সেই ভিতরকণিকার গল্পই বলব। অতীতের শবরদের রাজ্য কণিকা আজ হয়েছে ভিতরকণিকা। পূর্ব ভারতের ওড়িশার পূর্ব কেন্দ্রাপাড়া জেলার বৃহৎ জাতীয় উদ্যান এটি। আকৃতিতে বিশাল এই অভয়ারণ্য, বৈতরণী ও ব্রাহ্মণী নদীর সঙ্গমস্থলে ১৭০ বর্গ কিমি জুড়ে অবস্থিত। ১৯৭৫ সালে জাতীয় উদ্যানের স্বীকৃতি পায় ভিতরকণিকা।

সুন্দরী, হেতাল, বাইন, গেদ, কেওড়া, গেউয়া দিয়ে ছাওয়া ভিতরকণিকা অভয়ারণ্য। আর সারা পৃথিবীর মোট ৭২ প্রজাতির ম্যানগ্রোভের মধ্যে ৬৩ প্রজাতির সন্ধান মেলে ভিতরকণিকায়। শুধু ম্যানগ্রোভই নয়, চেনা-অচেনা হাজারো পাখির (প্রায় ১৭০ রকম) দেখা মেলে এই অভয়ারণ্যে। মৌটুসি, শামুকখোল, ফটিক জল, সাদা কাক, সোনা জঙ্ঘা, সাদা কাস্তেচোরা, খয়েরি রঙা মাছরাঙা, ব্রাহ্মণী হাঁস, হারগিলে, পেন্টেড স্টক, লার্জ ইগ্রেটস আরও কত কিসিমের পাখি যে এখানে আছে, তা এককথায় বলা মুশকিল।

আছে হরিণ, বন্য শুয়োর, চিতা, বনবিড়াল। পর্যটকদের কাছে আর একটি বিশেষ আকর্ষণীয় বিষয় হলো এখানকার পরিযায়ী পাখির দল, যারা দেশ-দেশান্তর থেকে শীতকালে আসে। তাদের কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত হয়ে ওঠে ভিতরকণিকার অরণ্য পরিবেশ। এছাড়া ওপেন বিল্ড স্টকস, ইগ্রেটস, ফ্লেমিংগো, হেরন, হোয়াইট আইবিস, পেলিকান, স্নেকবার্ড, স্যান্ড পাইপার–সবাই মিলেমিশে একত্রে বিরাজ করে ভিতরকণিকার বৃক্ষ শাখে। এ তো গেল ডাঙ্গার কথা। জলেও রয়েছে রকমারি প্রাণীকুল। আছে অগণিত কুমির ও কচ্ছপ। সাপও আছে নানা ধরণের।

তবে, তোমরা গেলে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমির প্রকল্পটিও অবশ্যই দেখো। এটি ভিতরকণিকার অন্যতম দ্রষ্টব্য। বউলা প্রজাতির পাশাপাশি বিরল প্রজাতির সাদা কুমিরের (অ্যালবিনো) দেখাও মেলে এই অরণ্যে। ভিতরকণিকার অদূরে গহিরমাথা দ্বীপের একাকুলায় ডিম পাড়তে আসে বিপুলাকার সামুদ্রিক কাছিম অলিভ রিডল টার্টল, লেদার বেকড টার্টল প্রভৃতি। তারা কোথা থেকে আসে জানো? সেই সুদূর দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ভারত মহাসাগর পেরিয়ে এখানে এসে পৌঁছয় তারা। ব্রাহ্মণীর সঙ্গমের বালুচরে বাসা গড়ে ডিম পাড়ে এরা।

ধামরা নদীর তীরে দুপাশ জুড়ে সুন্দরী, গরান, হেতাল, হোগলা–সব মিলিয়ে ভিতরকণিকা একেবারে সবুজে সবুজ। কয়েক ঘণ্টা থাকলেই মনপ্রাণ একেবারে জুড়িয়ে যাবে হলফ করে বলতে পারি। পড়াশোনার ফাঁকে মাত্র তিনদিনের ছুটি পেলেই বাবা-মায়ের সঙ্গে একবার ঘুরে এসো ভিতরকণিকা। যাওয়ার জন্য অসংখ্য ট্রেন আছে হাওড়া থেকে। নামতে হবে ভদ্রক স্টেশনে। ভদ্রক থেকে ভিতরকণিকা যেতে সাধারণত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগে। সড়কপথে প্রায় ২ ঘণ্টায় চাঁদবালি বা কস্তুরিকোণা ঘাটে পৌঁছতে হবে। এরপর সেখান থেকে নৌকায় বা বোটে ভিতরকণিকা যেতে আরও ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। সকালের দিকে যাত্রা শুরু করা ভালো, কারণ বিকাল ৫টার পর বোট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভিতরকণিকা জাতীয় উদ্যানে থাকার জন্য মূলত বন বিভাগের সরকারি গেস্ট হাউস (Nature Camps) আছে। এছাড়াও পাওয়া যাবে প্রচুর হোটেল, রিসর্ট ও হোমস্টে। ইন্টারনেটে যোগাযোগ পেয়ে যাবে। আগাম বুকিং করে যাওয়াই ভালো। আরও খবরের জন্য ওড়িশা পর্যটন উন্নয়ন নিগমের (OTDC) ওয়েবসাইট দেখতে পারো।

পাঠকদের মন্তব্য
250