নির্ভেজাল শান্তির খোঁজে নির্জন তেন্দ্রাবং-এ
মৃণালিনী ঠাকুর

একটু আগেই ধূসর মেঘ ঢেকে দিয়েছে শরতের আকাশ। সঙ্গে কুয়াশার আস্তরণ চরাচর জুড়ে। পাহাড়ের এটাই মজা–ঝলমলে রোদ্দুর হোক বা মেঘ কুয়াশার গাঢ় গোপন রহস্য, রূপের অতীত অরূপরসের যোগানে ঘাটতি নেই। গাড়ি কালিম্পং শহর পার হয়ে, আলগরা ছুঁয়ে একটু এগোতেই নির্জনতার ডানা যেন উড়িয়ে নিয়ে যায় কোন অচিনপুরে। চড়াই-উৎরাই গামী রাস্তার দু’পাশে প্রাচীন বিশাল গাছেদের সঘন উপস্থিতি বলে দেয়, এসে গেছি অচেনা পথে হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানায়।
প্রথমে ছোট এক জনপদ। হোমস্টে কর্তৃপক্ষের আঞ্চলিক প্রতিনিধি শাওনজি খুব যত্ন করে তাঁর নিজের বাড়িতে বসালেন। বিজয়া চলছে। তাই জল-মিষ্টি সহকারে আপ্যায়ন। কিছুক্ষণ বসে তারপর পৌঁছলাম হোমস্টে-র মূল বাড়িটিতে। আহা, একেই তো বলে স্বর্গ ! চারপাশে পাহাড়। মাঝে ছোট্ট এক মালভূমির মতো অংশ। সেখানেই ছিমছাম লালরঙের একতলা বাড়িটি দাঁড়িয়ে। ততক্ষণে শেষ বিকেলের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। বাগানের ফুলেরা মেখে নিয়েছে সেই আলো। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাই কালিম্পং জেলার মিষ্টি গ্রাম তেন্দ্রাবংয়ের।

কিছুক্ষণ পরে ইকো রিসর্ট-এ কর্মরত এলাকাবাসী দুই তরুণের হাতে আমার দেখভালের দায়িত্ব তুলে দিয়ে বিদায় নিয়েছেন শাওনজি। তারপরের দু’টি দিন সেই দু’জন কর্মীর যত্নে যেভাবে কাটালাম, তা এককথায় তুলনাহীন। একটু আগেই চা আর পকোড়া দিয়ে গেছে একজন কর্মী। রাতের রান্না ও অন্যান্য তদারকিতে ব্যস্ত অপরজন। অন্ধকারে নিজেকে আগাগোড়া মুড়ে নিয়েছে তেন্দ্রাবং। শুক্লপক্ষের চাঁদ মেঘের আড়ালে। তারারাও লুকিয়েছে মেঘের আঁচলের নিচে। ঝিঁঝিদের কনসার্ট শুরু। মাঝে মাঝে তাতে সুর মেলাচ্ছে গাছের পাতা থেকে টুপটাপ ঝরে পড়া জলের ফোটা।
চা-পকোড়া আস্বাদনের অবকাশে তেন্দ্রাবং সম্পর্কে কিছু তথ্য জানানো যাক। মাঝারি মাপের গ্রাম তেন্দ্রাবংয়ে মোটামুটি ৩০০ ঘর লোকের বসবাস। চাষবাসই বেশিরভাগ মানুষের পেশা। ডাক বিভাগ, সেনা, পুলিশ ইত্যাদি সরকারি দফতরে কর্মরত লোকজনও আছেন। তবে, শতাংশের হিসেবে নগন্য। বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের অধিকাংশই গ্রামের বাইরে, কাছে-দূরের শহরে থাকেন। ছুটিছাটায় বাড়ি আসেন তাঁরা। এছাড়া, পর্যটন ব্যবসা তো আছেই। বেশ কয়েকটি হোমস্টে রয়েছে এখানে, এই মুহূর্তে।

ডিনার খেলাম কিচেনের পাশেই তৈরি ডাইনিং রুমে। জায়গাটা বাড়ির পিছন দিকটায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘন হচ্ছে ঠাণ্ডা। গরম গরম রুটি, সবজি আর চিকেন দিয়ে ডিনার সেরে ঘরে প্রবেশ করি। এই মুহূর্তে হোমস্টে-র অতিথি আমি একাই। পরিবেশ তাই একটু বেশি শান্ত। গত কয়েকদিন নাকি দারুন ভিড় ছিল। আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন। নিঝুম পরিবেশে আপাতত নির্ভেজাল বিশ্রাম। হোমস্টে-র আলো ছাড়া চারপাশ অন্ধকার। ঘরের আলো নেভানো। পথ ভুলে গোটা দুই জোনাকি ঢুকে পড়েছে কখন। তাদের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়ি। নিটোল একখানা ঘুম। আর সেই ঘুম ভাঙতেই দেখি, রোদ্দুর উঁকি দিচ্ছে জানালায়।
আজ আমার দ্বিতীয় দিন এখানে। এক হোমস্টে কর্মীর সঙ্গে হাজির তার কন্যা চুকিলা, এককথায় ছোটখাটো একটি পুতুল। দারুন স্মার্ট চুকিলা। তেমনই তার সহবত জ্ঞান। আমার সামনে ব্রেকফাস্ট নিয়ে তার বাবা হাজির হতেই দূরে সরে যায় চুকিলা। আমার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুতেই আসে না সে। সিকিমের এক স্কুলে পড়ে চুকিলা। সেখানেই মায়ের সঙ্গে মামাবাড়িতে থাকে সে। এখন পুজোর ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। একটু আধটু ইংরেজি, বাকি নেপালি আর আমার অতি কাঁচা হিন্দি ভাষা–তাই নিয়েই মিলিয়ে মিশিয়ে সংযোগ স্থাপন করি আমি আর চুকিলা। হৃদয়ে হৃদয় মিলে গেলে, ভাষা আর কবে অন্তরায় হয়েছে ?

চুকিলা আপাতত কাছেই তার বাড়িতে গেছে। এই অবকাশে আরও কিছু তথ্য জানাই। কেন সে সিকিমের স্কুলে পড়ে, প্রশ্নটা মনে জেগেছিল ! খবর পেলাম, তেন্দ্রাবংয়ে একটা মাত্র সরকারি প্রাইমারি স্কুল। আর রয়েছে সেন্ট মেরিজ হোম স্টাডি সেন্টার। ফলে, ছাত্রছাত্রীর চাপ বেশি। হাইস্কুলে পড়তে হলে পেডংয়ের সেন্ট জনস বা আলগরা সরকারি স্কুলে যেতে হয়। কলেজের জন্য কালিম্পং বা শিলিগুড়ি এবং কলকাতা। কাছাকাছির মধ্যে, ২০১৫ সালে পেডংয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্থাপিত হয়েছে গভর্নমেন্ট জেনারেল ডিগ্রি কলেজ, এলাকার তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়েছে যা।
আজ আকাশে শরতের সাদা মেঘ। অপূর্ব সুন্দর ফুলের দল। তাদের রঙের বাহার পাগল করে দেয়। আসার পর থেকেই শুনছি জল প্রবাহের শব্দ। জানতে পারলাম, অনেকটা নিচ দিয়ে বহমান প্রাকৃতিক এক নালা এর উৎস। আমরা শহরবাসী নালা শুনলেই নাক কুঁচকে ফেলি, তার চেহারা কল্পনা করে। এখানে বিষয়টা বিপরীত। এই নালার শরীরে বহতা প্রাকৃতিক স্বচ্ছ জল। আবহে সেই কুলুকুলু প্রবাহিনী, আকাশে সাদা-ধূসর মেঘের সঙ্গে সূর্য কিরণের দুষ্টু খেলা, বাতাসে মৃদু ঠাণ্ডা আমেজ–বড় ভালো কাটে মুহূর্তগুলি। দূরে পাহাড়ের সারি। এই বাড়িরই কোনাকুনি একটি জায়গা থেকে দুর্দান্ত কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ মেলে শুনেছিলাম। তবে, আমার কাছে বেশিরভাগ সময়ের মতোই এবারেও অধরা থাকলেন তিনি।

লাঞ্চে ছিল দারুন স্বাদের ডিম কষা, বেশ অন্যরকম একটি সবজি (সবই গ্রাম-জাত এবং অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা), ডাল, পাঁপড় ভাজা ও আঁচার। রান্নায় দুরন্ত ছোটু। পেট পুরে খেয়ে দুপুরে ক্ষণিক বিশ্রাম। আর সঙ্গে আরও কিছু তথ্য। গতকাল সন্ধ্যায় দারুণ এক খবর জানলাম। তেন্দ্রাবংয়ে ওরা মাছ চাষ শুরু করেছে সম্প্রতি। শুনে চমকে উঠেছিলাম। ৫০০০ ফুট ওপরে মাছ চাষ ? হ্যাঁ, কালিম্পংয়ের এই গ্রামটির উচ্চতা মোটামুটি এমনই। উজ্জ্বল মুখে গ্যাব্রিয়েল জানিয়েছিল, আপাতত ছোট আকারে, কৃত্রিম জলাধারে–প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হলে, ভবিষ্যতে বড় আকারে ভাববে ওরা। যেখানে ঝর্না অর্থাৎ প্রাকৃতিক জলের যোগান রয়েছে, তারই আশপাশে কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। আপাতত গ্রাস কার্প (grass carp), আমাদের চেনা রুই মাছ একই পরিবারের অন্তর্ভূক্ত। জানা গেল, ওরা ট্রাউটের (trout) চাষও করছে। পাশাপাশি চিন্তাভাবনা চলছে মাছ সরবরাহের বিষয়টি নিয়েও।

নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও লড়ে যাচ্ছে পাহাড় গ্রামের বাসিন্দারা। চাষের ক্ষেতে ফলাচ্ছেন আলু, স্কোয়াশ, রাই শাক, গাজর, কপি, বিন, মুলো, শসা, কুমড়ো, লাউ ইত্যাদি। ফলের মধ্যে প্লাম ও আপেল। এখন আপেল চাষও ব্যাপক হারে হচ্ছে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে। তেন্দ্রাবংয়েও রয়েছে আপেল বাগান। এছাড়া ফুলঝাড়ু গাছের চাষ, বাজারে ঝাড়ু বানিয়ে বিক্রিও বহু মানুষের জীবিকার অন্তর্গত। গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু, ছাগল, শুয়োর–সঙ্গে মুরগি। এতেও উপার্জনের কিছুটা সুরাহা হয় দুধ, ডিম, মাংস ইত্যাদি বিক্রি করে।
বিকেল হতেই চুকিলা হাজির। সঙ্গে তার মা, পিসি। চুকিলার পিসি হোমস্টে-র ঘরদোর পরিষ্কার, বিছানা বদলানো ও ধোয়াধুয়ির কাজ করে। আন্তরিকতায় সবাই সমান প্রাণবন্ত। আলোয় সুন্দর সাজানো হয়েছে হোমস্টে। সবাই মিলে সেই ব্যাকগ্রাউন্ডে একপ্রস্থ ফটোসেশন হলো। বিকেলের শেষ থেকেই আকাশের মুখ আবার ভার। তারপর শুরু হলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। তারই মধ্যে জমে উঠলো গল্পগাছা। ফুল আর অর্কিডের স্বর্গ জেলা কালিম্পং। এখানে এসে অবধি আক্ষরিক অর্থেই পাখির ডাকে ঘুম ও জাগরণ ঘটেছে আমার। শুনলাম বার্ড ওয়াচাররা এই গ্রামে আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। পাহাড়ের মতোই জঙ্গল ঘিরে রেখেছে গ্রাম। বুনো জন্তুর আবির্ভাব তাই অতি চেনা ঘটনা গ্রামের মানুষের কাছে। ভালুক, হরিণ ছাড়াও আছে লেপার্ড। লেপার্ড ভালোই উৎপাত করে–গ্রামে ঢুকে কুকুর, বাছুর, ছাগল ধরে নিয়ে যায়।

দুর্গাপূজা পরবর্তী উৎসব মরশুম চলছে এখানেও। পুজো এবং দশেরা। কপালে টিকা লাগিয়ে, একে অপরের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে উদযাপন। এরপর দিওয়ালি ও লোসার এবং খুব বড় করে বড়দিন যাপন। গ্রামটিতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বসবাস প্রধানত। রয়েছে মোট ৪টি চার্চ। একটি তো বেশ প্রাচীন। শুধু এলাকার মানুষের ধর্মপালনের জন্য নয়, পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব আছে চার্চগুলির। এছাড়াও রয়েছে একটি সাইবাবার মন্দির। উৎসবের ক্ষেত্রে লেপচা সম্প্রদায়ের নাম্বুন সেলিব্রেশন উল্লেখযোগ্য। এটা তাঁদের নববর্ষ উদযাপন। লোসার যেমন বৌদ্ধদের নতুন বছর পালন উৎসব।
কাছাকাছি দেখার মধ্যে রয়েছে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ, সিকিম বর্ডার, রংপো নদী, একটি দুর্দান্ত ঝর্না আর অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘা। এছাড়া কালিম্পং শহর খুব কাছে। সেখানকার দ্রষ্টব্যগুলির সবই দেখার সুযোগ রয়েছে। এঁরা সাইট সিয়িংয়ের ব্যবস্থাও করেন। আর যাঁরা কোত্থাও না গিয়ে নির্ভেজাল শান্তির বিশ্রাম চান, তাঁদের জন্য এককথায় অতুলনীয় তেন্দ্রাবং। লাঞ্চ ও ডিনারে যা পাবেন–ভাত, রুটি, সবজি, ডিম কারি, চিকেন, ভাজি, স্যালাড, পাঁপড় ও আঁচার। ব্রেকফাস্টে পুরি সবজি বা রুটি সবজি, স্ন্যাকস-এ ভেজ বা চিকেন পকোড়া। ২/৩ বার চা দেওয়া হয়। বার-বি-কিউর সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। অক্টোবর থেকে মে মাস তেন্দ্রাবং যাওয়ার জন্য উপযুক্ত সময়। তবে, মার্চ-এপ্রিলে নানা রঙ ও বৈচিত্রে ফুলের বাহারে দারুন সেজে ওঠে এই গ্রাম।

শিলিগুড়ি তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ড, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে কালিম্পং শহর পর্যন্ত যাওয়ার প্রচুর শেয়ার গাড়ি ও সরকারি বাস রয়েছে। কালিম্পং থেকে হোমস্টে কর্তৃপক্ষ পিক আপ ও ড্রপের ব্যবস্থা করেন।
রাত বাড়তেই নির্জনতা শান্তির আশ্বাস হয়ে নেমে আসে চরাচরে। জোনাকিরা আজও উড়ে বেড়ায় ঘরে। নিচে বহমান জলস্রোত যেন ঘুমপাড়ানি গান ! ঘুমের দেশে যেতে যেতে এই সব অনুষঙ্গই অন্তরের অন্দরে টেনে নিই। বিদায় তেন্দ্রাবং। ভালো থেকো। ভুলে যেও না আমায়।
যোগাযোগ : +91 80011 21884.
পাঠকদের মন্তব্য
250