তিনটে দিন জলপ্রপাতের শহরে
লিপি চক্রবর্তী

ছোটনাগপুর অঞ্চলের রাজ্য ঝাড়খণ্ড, যা আগে ছিল বিহার। এই ঝাড়খণ্ডের রাজধানীর নাম হলো রাঁচি। তবে, লোকজন এই শহরকে ’জলপ্রপাতের শহর’ বলেই অধিক চেনে। কেন বলো তো ? রাঁচি শহরের মধ্যে একাধিক বিখ্যাত ও বিশাল জলপ্রপাত থাকার কারণেই এমন নামকরণ !! মজার ব্যাপার হলো, শুরুতে এই শহরের নাম ছিল আর্চি। এককালে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন টমাস উইলকিনসনস সাহেব, আর্চি নামের ওরাওঁ আদিবাসীদের একটি গ্রামকে তাদের সদর দপ্তর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। আর্চি অর্থ বাঁশবন। পরবর্তী কালে আর্চি হয়ে যায় রাঁচি। নৃতত্ত্ববিদ শরৎচন্দ্র রায় লিখেছেন, মুন্ডারি ভাষা আরঞ্চি থেকে এসেছে রাঁচি। আরঞ্চি মানে গবাদি পশু চরানোর জন্য ব্যবহৃত ছোট লাঠি। আবার স্থানীয় মানুষের কথায় এর অর্থ হলো দ্বি-সাপ্তাহিক হাট।
ভোর ভোর হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গিয়ে হাওড়া-রাঁচি শতাব্দী এক্সপ্রেসে উঠে বসলাম। একসঙ্গে আটজন চলেছি। হই-হুল্লোড় আর ট্রেনে দেদার খাওয়াদাওয়া চলতে-চলতেই আমরা বেলা দেড়টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম রাঁচি স্টেশন। আগে থাকতে হোটেল এবং গাড়ি বুকিং করা ছিল। আমাদের গাড়ির চালকরা বললেন, ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লে দুটো সুন্দর স্পট ঘোরা হয়ে যাবে। তাই হোটেলে জিনিসপত্র রেখে রোদ একটু কমলে আমরা বের হলাম সাড়ে তিনটে নাগাদ।

চালককে জিজ্ঞেস করে জানলাম, আমরা এখন যাব পত্রাতু জলাধার। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমরা পৌঁছলাম পত্রাতু জলাধারের উপরে। সেখান থেকে অনেক নিচে জলাধারের নীল জল দেখা যাচ্ছে। চারদিকে নাতিউচ্চ সবুজ পাহাড় যেন ঘিরে রেখে জায়গাটাকে পাহারা দিচ্ছে। ওখান থেকে নেমে এলাম একদম ড্যামের কাছে। একটা সুন্দর পার্কের মধ্যে দিয়ে জলাধারের কাছে পৌঁছতেই নামল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। পারে থাকা নৌকাগুলো বৃষ্টি পড়ার আনন্দে যেন দড়ির বাঁধন কেটে জলে ভেসে যেতে চাইছে, এমন তাদের ছলাৎছল ওঠাপড়া। বেশ অনেকটা ভিজলেও খুব মজা লাগছিল, ঠিক ছোটবেলার মতো।
বৃষ্টি একটু কমলে ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা এলাম 'পলানি ফলস'। খুব কম মানুষ আসেন এই জলপ্রপাতটি দেখতে। অথচ আমরা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পত্রাতু উপত্যকার এই জলপ্রপাতে যেতে হলে হাঁটতে হবে বেশ অনেকটা। চারদিক সবুজে মোড়ানো। পলানির খুব কাছে যেতে হলে অনেকটা রাস্তা নামতে হবে সিঁড়ি বেয়ে, আবার কিছুটা এবড়ো-খেবড়ো পাথরে পা রেখে। পাহাড়ের অনেক উপর থেকে লাফ দিয়ে পলানি নামছে একদম আমাদের পায়ের কাছে। তারপর খরস্রোতা ঝোরা হয়ে বয়ে গিয়েছে পাহাড়ের বুক চিরে আরো নিচে। সন্ধে হয়ে আসছিল। তাই আমরা ফিরে চললাম হোটেলের দিকে।

পরের দিন আমাদের গন্তব্য রাজারাপ্পার ছিন্নমস্তা মন্দির, দামোদরের উৎস, হুড্রু ফলস এবং সীতা ফলস।খুব সকালে পৌঁছে গেলাম ছিন্নমস্তা মন্দিরের প্রধান দরজায়। এই মন্দিরটির বয়স আনুমানিক প্রায় ৬০০০ বছর। কথিত আছে, আদি শঙ্করাচার্য এখানে পুজো করেছিলেন। রাস্তা থেকে গাছ-গাছালি ঘেরা উঁচুনিচু রাস্তা দিয়ে মূল মন্দিরে পৌঁছলাম। দামোদর ও ভৈরবী (স্থানীয় নাম ভেরা) নদীর সঙ্গম স্থলে এই ছিন্নমস্তা মন্দির। এটি একটি শক্তিপীঠ। একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিই তোমাদের। মন্দিরের পিছনে একটি জায়গায় ধূপ জ্বালিয়ে, লাল চেলি বাঁধে দর্শনার্থীরা। সেইখানে দেখি অজস্র বোলতা আর মৌমাছি ঝাঁক বেঁধে উড়ছে। সামান্য অসাবধানে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। আমরা অবশ্য পালিয়ে বাঁচলাম। এটি একটি মন্দির কমপ্লেক্স। মোট দশটি মন্দির আছে এখানে। মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে এক অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। ভৈরবী আর দামোদর নদীর মিলিত স্রোত দুরন্ত গতিতে পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে ছুটে চলেছে। পাথরে বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে একদম কাছে চলে গিয়েছিলাম, জলকণা ছিটকে এসে লাগছিল গায়ে।
এবার আমাদের গন্তব্য হুড্রু ফলস। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমেছে এরমধ্যে। হুড্রু জলপ্রপাত সুবর্ণরেখা নদীর গতিপথে অবস্থিত, যেখানে নদীটি প্রায় ৯৮ মিটার উচ্চতা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। রাঁচি মালভূমির উচ্চতম জলপ্রপাত এটি। বর্ষাকালে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা এই জায়গা। রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে ভিউ পয়েন্টে হুড্রুর মুখোমুখি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে অনুভব করতে পারছিলাম ভয়ংকর সুন্দর কাকে বলে। অনেক নিচে কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছিল স্নান করতে। নিচে নামতে হলে প্রায় ৭৪০টার মতো সিঁড়ি ভাঙতে হবে। ইচ্ছে থাকলেও আমরা নিচে নামতে পারলাম না, খুব জোরে বৃষ্টি আসার জন্য। বর্ষাকালে যদি তোমরা ওখানে যাও, তবে কিন্তু স্নানের চেষ্টা কোরো না। এই জলপ্রপাত তখন পাগলপারা হয়ে ওঠে। সারা বছর হুড্রু অপেক্ষা করে পর্যটকদের জন্য। একেক ঋতুতে এক এক রূপ তার।

এরপর দ্বি-প্রাহরিক ভোজন সেরে আজকের অন্তিম গন্তব্য সীতা ফলস। রামচন্দ্রজায়া সীতা দেবী বনবাস কালে নাকি এই জায়গায় কিছুদিন ছিলেন। যেখানে আমাদের চালকরা গাড়ি থামালেন, বললেন, সেখান থেকে মেরেকেটে গোটা সত্তর-আশি সিঁড়ি নামলে সীতা জলপ্রপাতের পাশে আমরা পৌঁছে যাব। যদিও যেতে গিয়ে দেখলাম, সংখ্যায় সেটা অনেক বেশি। মনে পড়ছে, আড়াইশোর পরে আর গুনিনি। অর্থাৎ, সংখ্যাটা আসলে তারও বেশি। তবে নির্জনতা বলতে সত্যিকারের কী বোঝায়, এখানে না এলে কোনোদিন জানতেই পারতাম না। সিঁড়ি দিয়ে যত নামছি, চারদিক থেকে ঘন সবুজ গাছপালা ঘিরে ধরছে আমাদের। একটা বাঁকের মুখে দূর থেকে দেখা গেল অঝোর ধারায় ঝরে পড়ছে এক সুন্দরী জলপ্রপাত। সুবর্ণরেখার উপনদী রাদুর চলার পথের প্রপাত এই সীতা ফলস। প্রায় দেড়শো মিটার উপর থেকে ঝাঁপিয়ে নামছে সে।
পাথরে পাথরে পা রেখে জমে থাকা জলে পা ডুবিয়ে একেবারে নতজানু হলাম প্রপাতের পাদদেশে। চারদিক জঙ্গলাকীর্ণ। অনেকটা জায়গা জুড়ে দিঘির মতো তৈরি করে, ঝরনার জল নেমে গিয়েছে কোথাও, যেখানটা ঢেকে রেখেছে ঘন জঙ্গল। কেউ কোথাও নেই, আমরা ক'জন ছাড়া। না, আর একজন আছেন, নৌকা নিয়ে বসে। ঝরনায় জল যখন বেশি থাকে, তখন হয়তো কোনো উৎসাহী মানুষের ইচ্ছে অনুসারে ঝরনার পায়ের কাছে জমে থাকা জলে নৌকায় ঘুরিয়ে দেন। প্রকৃতি এখানে এমন নির্জন আর নিস্তব্ধ যে, আমরাও বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু ঝরনার পতনের শব্দ শুনেছি তখন। আমার তো একে জংলি প্রপাত নামে ডাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল। এরপর আবার সেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা। ক্লান্ত হয়ে হোটেল পৌঁছলেও মন ছিল তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ।

রাঁচিতে অবস্থানের তৃতীয় তথা শেষ দিনে আমাদের গন্তব্য সূর্য মন্দির, দশম ফলস, রক গার্ডেন, জোনা ফলস ও কাঁকে জলাধার । সকালবেলাতেই পৌঁছে গেলাম সূর্য মন্দিরে। সাতটি ঘোড়া ধারণ করে আছে সূর্যদেবের রথ। সাদা ধবধবে এই মন্দিরটির কারুকাজ অসাধারণ। এবার জলপ্রপাতের দিকে যাত্রা। সুবর্ণরেখা নদীর আর এক উপনদী কাঞ্চি। এই কাঞ্চি নদীর চলার পথে তৈরি হয়েছে এক জলপ্রপাত, দসম বা দসাম ফলস। দসম শব্দটি ‘দাঃসং’ শব্দের পরিবর্তিত রূপ, যার অর্থ মুন্ডারি ভাষায় জল ঢালার কাজ। ‘দাঃ’ মানে জল এবং ‘সং’ মানে ঢালা বা মাপা। জলপ্রপাতটি দেখে মনে হয় কেউ যেন জল ঢালছে। আগের নাম ‘দাঃসং’ পরিবর্তন করে দসম বা দাসম রাখা হয়।
এই জলপ্রপাতের বিশালতা এবং রূপ বর্ণনাতীত। অনেকটা উপরে দাঁড়িয়ে এর চারদিক থেকে বেগে ছুটে আসা দেখা যায়। আর যখন নিচে পৌঁছলাম, তখন এমন এক আকর্ষণ বোধ করলাম, যার হাত থেকে যেন মুক্তি নেই। এবার যাব জোনা ফলস। জোনা জলপ্রপাত, যা গৌতমধারা জলপ্রপাত নামেও পরিচিত। রাঁচি মালভূমির একপ্রান্তে এটি অবস্থিত। জলপ্রপাতটি প্রায় ৪৩ মিটার উচ্চতা থেকে লাফিয়ে নামছে। যেখানে আমাদের গাড়ি নামিয়ে দিলো, তারপর থেকে অনেকটা উঁচুনিচু রাস্তা হেঁটে এসে ঝরনার চলার পথের পাশে পৌঁছলাম। প্রচুর গাছপালা নিজেদের রাজ্য বিস্তার করে ঝরনার বয়ে চলার দৃশ্য আড়াল করে রেখেছে। তাই তার মুখোমুখি হতে নামতে হলো সাতশোরও বেশি সিঁড়ি বেয়ে। জংলিপনায় ইনিও কম যান না। অপূর্ব তার ঝরে পড়ার নূপুরধ্বনি।

জলপ্রপাত ছাড়াও, পাহাড়ের চূড়ায় ভগবান বুদ্ধের মন্দির রয়েছে। স্থানীয় লোকেরা এখানে প্রার্থনা করতে আসেন। প্রতি মঙ্গলবার এবং শনিবার মন্দিরে মেলা বসে। কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধ নাকি এই জলপ্রপাতে স্নান করতেন। সেই কারণে সেখানে ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্যে একটি মন্দির নির্মাণ করিয়ে দেন রাজা বলদেবদাস বিড়লা। জোনা জলপ্রপাতের জলধারাটি গঙ্গা নদী থেকে উৎপন্ন হয়েছে এবং এই কারণে স্থানটি গঙ্গা নালা নামেও পরিচিত। এবারের মতো আমাদের অন্তিম গন্তব্য রক গার্ডেন। প্রকৃতিকে একটুও কষ্ট না দিয়ে, তাকে প্রাকৃতিক ভাবেই রক্ষা করে তৈরি হয়েছে এই রক গার্ডেন। কাঁকে রোডের উপর গোন্ডা পাহাড়ে অবস্থিত এই রক গার্ডেন। পাথর কেটে তৈরি মূর্তি, ফুলের বাগান, ঝুলন্ত সেতু, ছোট্ট ঝরনা সব মিলিয়ে শান্তির পরিবেশ। মন ভরে যায়। এখান থেকে দেখা যায় কাঁকে জলাধার। অনেক উপর থেকে নিচে ড্যামের বিস্তৃত জলরাশি বেলাশেষের রোদে ঝিলমিল করছিল। সে এক অপূর্ব দৃশ্য।
পরদিন ভোরবেলা বন্দেভারত এক্সপ্রেস ধরে বাড়ির পথে রওনা দিলাম। রাঁচিতে থাকা-খাওয়ার খরচ সাধ্যের মধ্যে। প্রচুর হোটেল আছে। তবে সুবিধের জন্য আগে থেকে বুক করে যাওয়া ভালো। স্টেশনের বাইরে গাড়ির স্ট্যান্ড আছে। আগে বুকিং না করে গেলে, ওখান থেকে দরদাম করে গাড়ি নেওয়া যায়। পত্রাতু জলাধার, রক গার্ডেন ইত্যাদি কয়েক জায়গায় ঢুকতে অর্থমূল্য দিতে হয়।

পাঠকদের মন্তব্য
250