গাঁয়ের নাম পাবুং
মৃণালিনী ঠাকুর

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের আজ এমন একটি জায়গার গল্প বলব–যেখানে রয়েছে খরগোশ, রাজহাঁস, কুকুর, বেড়াল আর প্রচুর পাখি ও গাছপালা। আমি আর আমার এক বন্ধু গতকালই এসে পৌঁছেছি উত্তরবঙ্গের চারকোলের অন্তর্গত পাবুং গ্রামে। এলাকাটি কালিম্পং জেলার অধীনে। পাহাড়ী উঁচু-নিচু রাস্তার দুপাশের দৃশ্যপট মুগ্ধ করে দেয়। একদিকে খাড়া পাহাড়। অন্যদিকে নদী ও উপত্যকা–সেখানে দূর দূর পর্যন্ত গ্রাম, জঙ্গল। এপাশেও রয়েছে পাহাড়ের সারি। তবে, তারা বেশ কিছুটা দূরে। অনেকটা পথ যাবার পর আমরা প্রথমে চারকোল, সেখান থেকে জিজ্ঞাসা করে পৌঁছোলাম পাবুংয়ের চিত্রকূট ফার্ম হাউসে। আগামী কয়েকদিন এটাই আমাদের অস্থায়ী ঠিকানা।

সময়টা শরৎ। তবে, প্রকৃতির মেজাজ মোটেই সুবিধের নয়। গতকাল পাবুং পৌঁছতে দুপুর গড়ায়। ঘন কুয়াশার আস্তরণ তখন ঢেকে দিয়েছে পুরো গ্রাম। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে হাত-পা। দ্রুত লাঞ্চ করে কম্বলের নিচে ঢুকি। ক্লান্ত ছিলাম। তাই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। সেই ঘুম ভাঙতে সন্ধ্যা। তারপর আর বিশেষ অবকাশ ছিল না বাইরে আসার। কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। ঠান্ডা বেড়েছে। একবার শুধু ডিনারের জন্য ডাইনিংরুমে গেছি, এই যা !
আজ ঘুম ভেঙেছে ওম মণি পদ্মে হুম…সুরে। সেই সুর মনে কেমন শান্তির আবেশ ছড়িয়ে দেয়। অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো এই ফার্ম হাউসের মালিক একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মী। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পরিবারটির সকলেই খুব আন্তরিক, নম্র ও শান্ত স্বভাবের। ফার্ম হাউসের ছড়ানো বাঁধানো খোলা চাতালের রঙিন ছাতার নিচে বসে প্রকৃতির রূপসুধা পান করতে করতেই ব্রেকফাস্ট সারলাম। আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় আবহাওয়ার ভেজা ভাবটা কমেছে। গ্রামের খবর নেব। তার আগে ফার্ম হাউস ঘুরে দেখা যাক।

আগেই বলেছি মানুষ, গাছপালা এবং জীবজন্তুর সুন্দর সহাবস্থান এখানে। কুকুর, বেড়াল, খরগোশ, রাজহাঁস ছাড়াও রয়েছে গরু, ছাগল! চাতালের এক দিকে পাশাপাশি তিনটি ঘর অতিথিদের জন্য। অন্যদিকে ফার্ম হাউসের মালিক, তাঁর পরিবারসহ থাকেন। প্রত্যেকটি ঘরের সামনে ফুলের বিচিত্র বাহার। নানা ধরনের ফুল ও ফলের গাছ, অর্কিড ছাড়া আছে ওষধি গাছের সম্ভার। তোমাদের জানাই, ওষধি গাছ থেকে ওষুধ তৈরি হয়। গাছেদের কিছু আছে নার্সারির ভিতরে। বাইরে টবেও রয়েছে কিছু। বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে ভুট্টার ক্ষেত। আছে ফুলঝাড়ু গাছ ইত্যাদি। এখানকার উর্বর মাটিতে প্রায় সব ধরনের সবজি ফলে। উল্লেখ্য স্কোয়াশ ও রাই শাক। ফলের মধ্যে কলা, ন্যাসপাতি, ব্রাউন আপেল ও চাইনিজ আপেল। এছাড়া দারচিনি ও বড় এলাচের চাষ বহুল পরিমানে হয় এখানে। উৎপন্ন হয় মধু।

উৎসব-পার্বণের মধ্যে দুর্গা পূজা, দিওয়ালি ও বড় দিন তো আছেই। এছাড়াও গ্রামে বেশ কিছু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী থাকায় লোসা উৎসবও খুব বর্ণাঢ্য আকারে পালিত হয় এখানে। লাঞ্চ ও ডিনারের ক্ষেত্রে ভাত, রুটি, ডাল, শাকসবজি, চিকেন, ডিম পাওয়া যায়। ফার্ম হাউসেরই শাকসবজি, ফলে অত্যন্ত সুস্বাদু। ব্রেকফাস্ট ও স্ন্যাকস-এ ব্রেড-বাটার/জ্যাম, পুরি, রুটি, পরোটা, অমলেট, পকোড়া এবং চা-কফি মেলে। এদের বানানো স্পেশাল মোমো আর থুপপা এককথায় লা জবাব। আর পাওয়া যায় খাঁটি মধু এবং ফার্ম হাউসের গরুর দুধ ও তার থেকে তৈরি ঘি। দেখলাম গ্রামের মানুষের হাতে তৈরি বাঁশের হস্তশিল্পের সামগ্রী, যা এককথায় চমৎকার।

পাবুংয়ের উচ্চতা ৪৫০০ ফুট। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। উত্তরবঙ্গের সব থেকে বড় আকর্ষণ কাঞ্চনজঙ্ঘার দারুণ ভিউ মেলে এখানে, যা এই ফার্ম হাউস থেকেও দেখা যায়। উর্বর জমিতে গাছপালা বেড়ে উঠেছে আপন খেয়ালে। ফুল আর অর্কিডের স্বর্গ এই অঞ্চল। ফুল দেখার জন্য মার্চ-এপ্রিল। অক্টোবরেও কিছু মরশুমী ফুলের দেখা মেলে। আর আছে চা বাগান, সবুজের উৎসব সেখানে। জঙ্গলে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। মিনিবেট, সানবার্ড, থ্রাশ, রোলার্স, স্যালো ইত্যাদি পাখি দেখার জন্য ভিড় করেন পক্ষীপ্রেমীরা।
কাছাকাছি যাবার মধ্যে আছে কালিম্পং, চারকোল, লাভা, লোলেগাঁও। কালিম্পং মাত্র ৩৫ কিমি দূরে। পাবুং থেকে কিছুদূর এগোনোর পর রেলি খোলা–খোলা অর্থাৎ নদী। এই নদী পার হয়ে কালিম্পং পৌঁছতে হয়। রেলি খোলাকে ঘিরেও গড়ে উঠেছে ট্যুরিস্ট স্পট। এই নদীতে এক ধরণের ছোট ছোট মাছ পাওয়া যায়, যা দারুণ সুস্বাদু। অঞ্চলটি ভারি সুন্দর। পাহাড়, নদী, জঙ্গলের এক অপরূপ ক্যানভাস রচিত হয়েছে। ঘুরে দেখা যেতে পারে কমলালেবুর বাগান, দারচিনি বাগান, হনুমান পয়েন্ট। চারকোলে একটি অসাধারণ সান-সেট পয়েন্টও রয়েছে।

পাবুং যাওয়া যায় অক্টোবর থেকে মার্চ। তবে, সেরা সময় অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর। সেই সময় আকাশ মোটামুটি পরিষ্কার থাকে বলে কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন মেলার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যে কোনও বড় শহর থেকে ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন, প্লেনে বাগডোগড়া এয়ারপোর্ট, বাসে তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ড আসতে হবে। এখান থেকে গাড়িতে পাবুং। থাকবার জন্য আগাম বুকিং বা অন্যান্য খোঁজে যোগাযোগ করা যেতে পারে এই ফোন নাম্বারে–6296738572.

পাঠকদের মন্তব্য
250