ছোটোদের চাঁদের হাসি / হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা / এপ্রিল ২০২৬

একটা দিন, বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যে

 

আচ্ছা, বলো তো সব সময় আগাম প্ল্যান করে হিসেব মতো ঘোরাঘুরি ভালো লাগে ? ছোট্টো বন্ধুরা, আমার কিন্তু মাঝে মাঝে এলোমেলো বেড়াতেও তেমন মন্দ লাগে না ! এমনই এক বেড়ানোর গল্প আজ তোমাদের বলব। সে এক শীতের ভোর, সাড়ে ছ'টার সময় একগাদা শীতের পোশাক গায়ে চাপিয়ে গাড়ির ভিতর সেঁধিয়ে গেলাম। প্রথমে চাকলা ধাম, লোকনাথ বাবার মন্দির। রাস্তায় শুধু একবার চায়ের বিরতি। দু' ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম চাকলা। কয়েকজন স্থানীয় মানুষ ছাড়া পুজো দেওয়ার ভিড় নেই। খুব ভালোভাবে পুজো দিয়ে বেরিয়ে দেখি, সবে ঘড়িতে সময় সকাল দশটা। চায়ের তেষ্টা নিয়ে এদিকওদিক তাকিয়ে একটি দোকান পেয়ে গেলাম। চা পান করতে করতেই ভাবি, এবার যাই কোথায়? খোঁজার জন্য গুগল ভরসা। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম পারমাদান, যার বর্তমান নাম বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য।

 

চাকলা থেকে একটু দূরে, প্রায় সত্তর কিলোমিটার। চায়ের দোকানী দাদাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, রাস্তা খুব ভালো। দু'ঘণ্টাও লাগবে না। ব্যাস, নিশ্চিন্ত। আবার চেপে বসলাম গাড়িতে। গ্রামের ভিতরের রাস্তা একটু ঘোরানো-প্যাঁচানো হলেও মসৃণ। দোকানী দাদার বলে দেওয়া পথে এগোচ্ছিলেন। আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য গুগল ম্যাপ খুলে নিলাম। কত গ্রাম, কত মফস্বল শহর পেরিয়ে যাচ্ছি। পথচলতি মানুষগুলিকে অচেনা লাগছে না। আমরা তো একই দেশের মানুষ। একসময় গুগল ম্যাপ আমাদের নিয়ে গিয়ে এক তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিল। আসার পথে রাস্তায় ইছামতি নদীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। সেই যাকে নিয়ে রবিঠাকুর লিখেছিলেন, ‘যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি/ আমি তবে এক্ষনি হই ইচ্ছামতী নদী…’। এখানেই তো কোথাও আছে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। ঠিক করলাম, ফেরার পথে দেখব।

 

 

এক ভদ্রমহিলা বসে মাদুর বুনছিলেন শীতের রোদে পিঠ দিয়ে । তাঁকেই  জিজ্ঞেস করলাম, জঙ্গলে ঢুকব কোন পথে? তিনি বললেন, সামনেই নীলকুঠির প্রাঙ্গণে গাড়ি রেখে নৌকা করে জঙ্গলের ভিতর যেতে। গাড়ি নিয়ে গেলে শুধু শুধু অনেকটা ঘুরতে হবে। আমরা রাস্তা বুঝে নিয়ে চলে এলাম ইছামতি নদীর ধারে নীলকুঠিতে। অবশ্য রাস্তা তৈরির কাজ হচ্ছিল বলে গাড়ি বেশ খানিকটা দূরে রেখে পায়ে হেঁটে আসতে হলো।

 

নীলকুঠির খানিকটা অংশ পূর্বের স্মৃতি বহন করলেও, এখন একটি স্কুল হয়েছে এখানে। বোধহয় টিফিনের বিরতি। তাই বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে। এইসব দেখতে দেখতে চলে এলাম একদম নদীর ধারে। অনেকে প্যাডেল বোট ভাড়া নিয়ে নিজেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে ইছামতির বুকে। আমরা দাঁড়টানা ডিঙি নৌকার মাঝি দাদার সঙ্গে কথা বললাম। দরদাম করে ঠিক হলো, দাদা আমাদের চার কিলোমিটার জঙ্গল ঘোরাবেন নদী দিয়ে। আর ওপারের জঙ্গলে নামিয়ে দেবেন ও ফিরিয়ে আনবেন এখানেই। টলমল করতে করতে নৌকায় উঠে পড়লাম। ডিঙি নৌকায় অনেকদিন আগে একবার চেপেছিলাম। একটু যে ভয় করছিল না, সেটা বলব না। তবে ইছামতীতে স্রোত কম। নৌকায় বসেছি পা মুড়ে। খানিকটা সময় পরেই ভয় কেটে গেল।

 

 

এমনিতে স্বচ্ছ জল। কিন্তু বৈঠার ওঠাপড়াতে যেই জল নড়ছে, তখন নদীর তলা থেকে উঠে আসা জলঝাঁঝির শ্যাওলা সবুজ রং ধরছে ইচ্ছামতীর জল। জঙ্গলের কিনারা দিয়ে নৌকা চলেছে। নাম জানা নেই এমন কত বিশাল গাছ ঝুঁকে পড়েছে জলে। পার ঘেঁষে কচুরিপানার পার্পেল রঙের ফুলের সমারোহ। আর উল্টোদিকে জলের গা ঘেঁষে সবুজ মাঠ বেয়ে মাঝে মাঝে নেমে আসছে হাঁসের দল। বেশকিছু পরিযায়ী পাখি উড়ছে মাথার উপর উদার আকাশে । মাছ ধরার জন্য নদীর মাঝ বরাবর গাঁথা রয়েছে জাল।

 

জঙ্গল বেশ ঘন। মাঝে একটি জায়গা খাঁড়ির মতো জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। সেখান থেকে একটি নৌকা নিয়ে বেরিয়ে এলো একজন মানুষ। জলে হাত ডুবিয়ে ঝাঁঝিগুলো ছুঁয়ে দিচ্ছিলাম আমরা। খুব ভালো লাগছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক এইভাবে চলার পর একটি ভাঙাচোরা ঘাটে এসে দাঁড়ালেন মাঝিদাদা। জিজ্ঞেস করে জানলাম আমরা প্রায় চার কিলোমিটার এসেছি ইছামতি বেয়ে। সাবধানে নামতে হলো। এটাই বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য অথবা বিভূতিভূষণ ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি।

 

 

পারের সামনেই আছে একটি বনবিভাগের রেস্ট হাউস। পায়ে পায়ে এগোতেই পাখির কিচিরমিচির কানে তালা ধরিয়ে দিল। বিশাল বিশাল খাঁচায় অসংখ্য পাখি। কত তাদের রং, কেউ সবুজ, কেউ লাল, কেউ বা রামধনু রংয়ের। সবার নাম তো জানি না। সে যে নামই হোক, তাদের কলকাকলিতে অরণ্য মুখর হয়ে আছে। পাশের খাঁচায় রয়েছে ময়ূর। তিনি বেশ গম্ভীর প্রকৃতির।

 

আর একটু এগোতেই শুরু হল হরিণের রাজত্ব। যখন এই অভয়ারণ্য তৈরি হচ্ছে, তখন আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে চারটি চিতল হরিণ আনা হয়। ১৯৬৪ সালে তিনটি বাচ্চা সহ পনেরোটি চিতল হরিণ ছিল। পরে নানা কারণে সংখ্যা কমে যায়। লোহার তারজালি দিয়ে ভ্রমণার্থীদের চলার পথ আলাদা করা হয়েছে। খাঁচা নামেই, আসলে হরিণদের চলাফেরা খেলাধূলা সুরক্ষিত করা হয়েছে। প্রচুর হনুমানেরও দেখা পাওয়া যাচ্ছে।

 

 

অর্ধেক জঙ্গল ঘুরতে ঘুরতেই সূর্যের আলো কমছিল, বিকেল নেমে আসছিল দ্রুত। আবার ফিরতে হবে সেই ডিঙি নৌকায় চেপে, জলপথ ধরে। একটা গোটা দিন কম পড়বে পুরো জঙ্গল ঘোরার জন্য। আবার সেই আনন্দ যাত্রা ইছামতির কোল বেয়ে। কোথা দিয়ে যে পাঁচ ঘণ্টা সময় চলে গেল বুঝতেই পারলাম না। এখানে নদীর ধারে পিকনিক করা যায়। কিন্তু, কোনো খাবার নিয়ে জঙ্গলে ঢোকা মানা। কারো যদি জলে ভয় থাকে, তবে, এপথে না গিয়ে সড়ক পথে জঙ্গলে যাওয়াই ভালো।

 

ফেরার সময় স্থানীয় মানুষদের জিজ্ঞাসাবাদ করে  পৌঁছলাম সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। ‘স্মৃতির রেখা’ নামের এই বাড়িটি দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। লেখক এবং তাঁর স্ত্রীর মূর্তি আছে বারান্দায়। চারদিক আগাছা গুল্মে ভরা। এখানেই জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছিলেন এই স্বনামধন্য বাঙালি সাহিত্যিক।

 

 

গাড়ি পথে সরাসরি কলকাতা থেকে বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটার। এছাড়া ট্রেনেও যাওয়া যায়। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে বনগাঁ অথবা রানাঘাট স্টেশনে নেমে নলডুংরি যাওয়ার বাস ধরতে হবে। দূরত্ব কমবেশি ২৫ কিলোমিটার। সেখান থেকে টোটোতে অথবা পায়ে হেঁটে পৌঁছতে হবে বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য। একটু খুঁজলে সারাদিনের জন্য গাড়িভাড়াও পাওয়া যায়। জঙ্গল খোলা থাকে সকাল ন'টা থেকে বিকেল পাঁচটা। বৃহস্পতিবার বন্ধ।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up