ডোবার খোঁজে
ছন্দা চট্টোপাধ্যায়
বাড়ি ফিরে মায়ের তাড়ায় কোনোরকমে স্নানটা সেরেই পড়ার টেবিলে ডায়েরি খুলে লিখতে বসল মুনু। তার বাবা সুহাস তাকে ডায়েরি লেখা অভ্যাস করিয়েছে। গত দশদিন তারা রাজস্থান বেড়াতে গেছিল বলে ডায়েরি লেখাটা বাদ পড়ে গেছে। তবে কী লিখবে, সেসব কথা স্মৃতির পাতায় লেখা হয়ে আছে মুনুর।
কদিনের অনুপস্থিতিতে বাড়িঘর বেশ নোংরা-অগোছালো। মা সুরূপা সেসব কিছুটা সামলে নিয়ে মুনুকে খাবার জন্যে ডাকতে এসে দেখে নিবিষ্ট চিত্তে ডায়েরি লিখছে মুনু।
—আঃ মুনু তুমি এখন ডায়েরি লিখতে বসে গেলে কেন? এর চেয়ে স্কুলের ডায়েরিটা খুলে দেখে নিতে পারতে কী কী করা দরকার! এ ক’দিনে তো সব ভুলে বসে আছ!
মায়ের কথা গায়ে না মেখে মুনু বলল, একটা প্রবলেম আছে কিন্তু মা। উটের গায়ে গন্ধ বলে তুমি নিজেও উটের পিঠে চাপলে না, আমাকেও চাপতে দিলে না। বাবার না হয় পায়ে লাগা আছে, আমাকে একবার চাপতে দিলে কি ক্ষতি হতো! উটওয়ালা নাকি আমাকে চুরি করে নিয়ে পালাতো! একথা শুনলে সব্বাই হাসাহাসি করবে না ? এখন বন্ধুদের কী বলব আমি—কেন উটে চাপতে পারিনি!
—-কেন বন্ধুদের বলবে, কী চমৎকার সূর্যাস্ত দেখেছ মরুভূমিতে। উটের পিঠে চাপার চেয়ে সেটা অনেকবেশি রোমাঞ্চকর। উটের এখন আর সেই আগের মর্যাদা আছে নাকি! গতবার পুরীতে গিয়ে দেখলে না—সি-বিচে এখন ঘোড়াদের সঙ্গে সঙ্গে উটও চলে এসেছে !
—কি হলো! ‘মেয়েকে ডেকে আনি’ বলে আমাকে খাবার টেবিলে বসিয়ে দুজনে গল্প জুড়ে দিয়েছ—বলতে বলতে সুহাস ঘরে ঢুকল।
সুরূপা হেসে বলল, আর বোলো না তোমার মেয়ে উটের পিঠে চাপা হয়নি বলে বন্ধুদের কি জবাব দেবে, তাই ভাবছে। আমি বললাম, জয়সলমীরের মরুভূমিতে সূর্যাস্ত দেখার কথা বলবে। তবে যাই বলো, সূর্যাস্ত যে কোনো ব্যাকগ্রাউন্ডেই অনবদ্য লাগে। আমার মনে আছে, আমাদের ছোটোবেলায় যখন ছুটিছাটায় মামারবাড়িতে যেতাম, তখন বাড়ির পিছনদিকের ছোট্টো ডোবার জলে সূর্যাস্ত দেখেও মুগ্ধ হতাম। যে কদিন থাকতাম, সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে আমি রোজ ডোবার কাছাকাছি এসে দাঁড়াতাম—বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে সূর্যাস্ত দেখব বলে।
মুনু জিজ্ঞেস করল, ডোবা কি মা ?
সুহাস-সুরূপা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। তারপরে সুরূপা বলল, তুমি পুকুর দেখেছ। ডোবা হচ্ছে ছোটো পুকুর মানে যেখানে অল্প জল থাকে। গ্রামাঞ্চলে ডোবার জলেই বাসনমাজা-কাপড়কাচা এসব করা হয়।
মুনু বলল, আমাকে একদিন ডোবা দেখাবে মা?
সুহাস বলল, যাও একদিন ডোবা দেখিয়ে নিয়ে এসো। এমনকিছু কঠিন ব্যাপার নয়। কলকাতার আশেপাশে কয়েকমাইলের মধ্যে প্রচুর গ্রাম। কোনো একটা ছুটির দিন বা রবিবার দেখে ঘুরিয়ে আনলেই হলো। আমার তেমন কাজ না থাকলে আমিও সঙ্গ দেব। এখন চলো খিদে পেয়েছে।
সুরূপা বলল, ডোবা দেখানোর জন্যে গাঁ খুঁজতে যাব কেন? আমার মামারবাড়িতে গেলেই তো হয়। মামারা কেউ নেই সেখানে। দেখাশোনার কেউ নেই বলে বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়েছে। তবু কিছু চেনা মানুষ ঠিক পাওয়া যাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা আমার দেখা ছোটবেলার সেই ডোবাটাও মুনুকে দেখানো হবে।
মাসখানেকের মাথায় এক রবিবারে ওরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সুরূপার মামারবাড়ি দখিনাপুরের উদ্দেশে। কাছাকাছি শহর কাটোয়ায় একরাত কাটিয়ে পরদিন ভোরবেলায় ফিরে আসার প্রোগ্রাম।
সুহাস বলল, লাস্ট কবে তুমি ওখানে গেছ মনে আছে?
সুরূপা বলল, ক্লাস নাইনে পড়ার সময় লাস্ট গেছিলাম। তারপরে পড়ার চাপ বেড়ে গেল। দিদা মারা যাবার পরে বাড়িটা পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গেল। তা ধরো প্রায় কুড়ি বছর আগে!
—চিনতে পারবে তো! কারণ গত দশ-পনেরো বছরে রাস্তাঘাট-কমিউনিকেশনের এত উন্নতি হয়েছে, এত বছর পরে যাচ্ছ, গুলিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
—- চলো, দেখাই যাক কী হয়!
দখিনাপুরে পৌঁছতে তেমন অসুবিধা কিছু হলো না। কিন্তু সুরূপা অবাক হলো, যেখানে গোরুমোষের গাড়ি ছাড়া কোনো যানবাহন চলতো না, বর্ষায় জুতো হাতে কাদায় পা ডুবিয়ে হাঁটা ছাড়া চলাফেরার কোনো উপায় ছিল না, সেই গ্রামের এত উন্নতি হয়েছে! রাস্তার কন্ডিশন তেমন ভালো নয়, তবু পুরোটা পাকা রাস্তা! রাস্তার দুপাশে প্রচুর বাড়িঘর হয়ে গেছে—যেসব জায়গায় আগে চাষের জমি ছিল। সেই কারণে তার মামাদের বাড়িটা ঠিক কোন জায়গায় ছিল, খুঁজে পেতে অসুবিধা হচ্ছিল। সেইসময় এক মধ্যবয়েসী মহিলা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কাউকে খুঁজছেন আপনারা?
সুরূপা বলল, আসলে এখানে আমার মামাদের বাড়ি ছিল—সর্বময় মুখার্জি আমার দাদুর নাম। বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে শুনেছি। কিন্তু কোন জায়গায় ছিল ঠিক বুঝতে পারছি না।
ভদ্রমহিলা হেসে বললেন, বুঝতে পেরেছি। আপনার মামারবাড়ি খুঁজে পাবেন কি করে! যে কিনেছে, সে ওটাকে ভেঙেচুরে নতুন করে বানিয়ে নিয়েছে। আমার সঙ্গে আসুন দেখিয়ে দিচ্ছি। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, ওই বাড়িটা। একটা কথা বলুন তো, আপনারা কি বাড়িটা দেখতে এসেছেন! নাকি অন্য কোনো…!
সুরূপা বলল, আমরা কলকাতায় থাকি। আমার মেয়ে গ্রাম দেখেনি। তাই ওকে এখানে নিয়ে এলাম, যেখানে আমি ছোটবেলায় অনেকটা সময় কাটিয়েছি—
মাকে থামিয়ে মুনু বলল, আর ডোবাটার কথা বলো মা।
ভদ্রমহিলা অবাক চোখে তাকাতেই সুরূপা বলল, ওই যে আমার কাছে গল্প শুনেছে, আমি রোজ বিকেলে বাড়ির পেছনের ডোবাটায় সূর্যাস্ত দেখতাম, তাই…!
ভদ্রমহিলা বললেন, ও বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সে ডোবা তো আর নেই সোনা। শুধু সেটা নয়, এই গ্রামে আর কোনো ডোবাই দেখতে পাবে না। পুকুর-ডোবা সব বুজিয়ে বাড়ি-ঘর তৈরি হচ্ছে। নাম বললে আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন—কাজী পুকুর আর নতুন পুকুর এই দুটো পুকুরকে কোনোরকমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, গ্রামের মানুষেরা প্রতিবাদ করেছিল বলে।
সুরূপার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এরকম ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরতে হবে, স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।
মুনুর গলায় আক্ষেপ, তাহলে আমরা এখন কি করব মা! কোথায় ডোবা দেখতে যাব?
ভদ্রমহিলা বললেন, মনখারাপ করো না সোনা। ডোবা তুমি ঠিক দেখতে পাবে। ভারতবর্ষে হাজার হাজার অনুন্নত গ্রাম। ডোবা ছাড়া তাদের চলবে কি করে ? আচ্ছা একটা কথা, আপনার মামারা নেই, কিন্তু আমরা তো আছি! আমি এখানকার বউ। স্বামীর চাকরির সুবাদে বাইরে থাকি আমরা। আমার শাশুড়ি-মা এখানে থাকেন। তাই মাঝে মাঝে আসি এখানে। তাঁর কাছে আপনার মামাদের অনেক গল্প শুনেছি।
সুরূপা বলল, আপনার শাশুড়ির নামটা একটু বলবেন ?
—নিশ্চয়ই। সুধাময়ী মুখার্জি।
সুরূপা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, সুধাদিদু! চলুন চলুন। আমার প্রিয় মানুষদের একজন উনি। আসলে ছোটোদের সবারই খুব প্রিয় ছিলেন উনি! খুব ভালো গল্প বলতেন।
—তবে আর কি! আসুন প্লিজ! উনিও আপনাকে দেখে খুশি হবেন।
সুহাস বলল, যাক ডোবা না-দেখার দুঃখ কিছুটা মিটে গেল মনে হচ্ছে। চলো মুনু…!
পাঠকদের মন্তব্য
250