তিতলির পুরস্কার
কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়
তিতলি স্কুল থেকে বাড়িতে ফেরার সময় রোজ রাস্তা থেকে দেখতে পায়, ঠাকুরমা বারান্দায় বসে। ঠাকুরমা তিতলিকে দেখে হাত নাড়ে। তিতলির মনে হয় কতক্ষণে সে ঠাকুরমার কাছে যাবে।
বাড়িতে ঢুকেই সে ঠাকুরমাকে জড়িয়ে ধরে। ঠাকুরমা বলে, “দিদিভাই ছাড়ো আমাকে। এখন তোমাকে খেতে দেব তো!”
তিতলির সামনে বসে থাকে ঠাকুরমা। যা দেবে সবটা খেতে হবে। না বলার উপায় নেই। তিতলি বলেও না। ঠাকুরমার তৈরি খাবার তার খুব ভালো লাগে। স্কুলে সে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুরমার রান্না নিয়ে গল্প করে।
ঝিমলি একদিন বলল, “যেভাবে বলছিস, তাতে তো আমার জিভে জল চলে আসছে।” বন্ধুরা সবাই ঠিক করে, একদিন তিতলির সঙ্গে ওর বাড়ি যাবে, ঠাকুরমার হাতের রান্না খাবার খেতে।
সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে তিতলি। ঠাকুরমাকে বারান্দায় না দেখতে পেয়ে সে ভাবল, হয়তো কোনো কাজে ঘরের ভিতরে গেছে, এক্ষুণি চলে আসবে। সে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল। কিন্তু কতক্ষণ আর এভাবে আস্তে হাঁটা যায়! ঠাকুরমা তো আসছে না!
বাড়িতে গিয়ে তিতলি দেখল, গ্রিলের দরজায় তালা দেওয়া। তার ইস্কুলের ব্যাগে বাড়ির একগোছা চাবি থাকে। সে গ্রিলের দরজা খুলে তালা লাগিয়ে দিল। শুনতে পেল ঠাকুরমার কাতর গলার আওয়াজ, “দিদিভাই এলে?”
স্কুলের ব্যাগ রেখে তিতলি চট করে ঠাকুরমার ঘরে ঢুকল। দেখল ঠাকুরমা বিছানায় শুয়ে আছে। কপালে হাত রাখল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। কি করবে সে এখন?
থার্মোমিটারের কথা মনে পড়ল। সে কোনোদিন থার্মোমিটারে হাত দেয়নি। তবু দেখতে চাইল জ্বর কতটা। থার্মোমিটার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না কত টেম্পারেচার। ঘরের আলো জ্বালাল। ঠাকুরমা ইশারায় কাছে ডাকল তিতলিকে। থার্মোমিটার হাতে নিয়ে দেখে কোনোরকমে বলল, “তিন !”
তিতলির যখন জ্বর হয়েছিল তখন মা আর ঠাকুরমা মিলে তার কপালে জলে ভেজানো কাপড় দিয়েছিল। সেটা মনে পড়তেই সে বাটিতে করে জল নিয়ে, তাতে তার একটি পরিস্কার রুমাল ভিজিয়ে ঠাকুরমার কপালে রাখল। তারমধ্যেই সে ফোন করল মা ও বাবাকে।
বাবা বলল, “আমি ডাক্তারবাবুকে বলে দিচ্ছি। উনি এলে দরজা খুলে দিও। আর প্রেসক্রিপশনের একটা ছবি তুলে আমাকে পাঠিয়ে দিও।”
মা বলল, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি আসছি। চিন্তা কোরো না।”
ঠাকুরমার কপাল থেকে ভেজা রুমালটা তুলে তিতলি দেখল সেটা গরম হয়ে আছে। সে জল বদলে নিল।
ডাক্তারবাবু এসে দেখে ওষুধ লিখলেন। তিতলি প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে বাবাকে পাঠাল।
বাবা, মা–দু’জনেই চলে এলো। বাবা বলল, “আমি ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলেছি। তিতলি তুমি যে বুদ্ধি করে ঠাকুরমাকে জলপট্টি দিয়েছ এটা খুব কাজে লেগেছে।” কথাটা বলতেই ঠাকুরমার মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
মা অস্থির হয়ে ঠাকুরমাকে বলল, “মা তোমার এখন কিছু খাওয়া দরকার। ওষুধগুলো খালি পেটে খাওয়া চলবে না।”
“আমি ঠাকুরমাকে খাইয়ে দিয়েছি।”
“তুই! কি খাওয়ালি?”
“দুধ গরম করে, সঙ্গে বিস্কুট দিয়েছি।”
“তুই দুধ গরম করেছিস! ওভেনের সামনে যেতে তো ভয় পাস। করলি কি করে?”
“কি করব? ঠাকুরমাকে কিছু খেতে না দিলে তো, দুর্বল হয়ে পড়ত।”
“তুই কিছু খেয়েছিস?”
“কী যে বলো মা! আমার কত কাজ। ঠাকুরমার এই অবস্থায় আমি খেতে বসব? তাছাড়া ঠাকুরমা খেতে না দিলে আমার খেতে ভালো লাগে না। এই সময়টা জানো তো আমার সঙ্গে ঠাকুরমার খেতে খেতে কত গল্প হয়।”
তিতলির মা বলল, “আমি ক’দিন অফিসে যাব না।”
ঠাকুরমা বলল, “আমার তো আর জ্বর নেই। শুধু শুধু অফিস কামাই করবে কেন? বিমলা রান্না করে দিয়ে যাবে। খেতে আমার অসুবিধা হবে না।”
তিতলি বলল, “চিন্তা নেই। পরীক্ষার আগে কয়েকদিন স্কুল ছুটি থাকবে। আমি তো বাড়িতেই থাকব!”
কয়েকটা দিন তিতলির বাবা-মা তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরল। সন্ধ্যায় তিতলির হাতের চা, মুড়ি আর গরম গরম বেগুনি পেয়ে দু’জনেই অবাক। তিতলি এসব নিজের হাতে করেছে!
ঠাকুরমা বলল, “বুঝলে বউমা, মেয়েটা বড়ো অবাধ্য হয়েছে। যত বলি আমাকে কিছু কাজ করতে দাও! তা মেয়ে কিছুতেই করতে দেবে না। বলে আগে সম্পূর্ণ ঠিক হয়ে যাও তারপর আমার স্কুল খুললে তো তুমিই করবে। ক্লাস এইটেই এখন এম এ পাশ দিদিমনির মতো কথা।” বলে ঠাকুরমা হাসল।
পাড়ায় অনুষ্ঠান হবে দু’দিন। প্রথম দিন পাড়ায় যে মেয়েরা স্কুলে পড়ে, তারা তাদের মনের ভাবনার কথা বলবে। তাদের সবাইকে পুরস্কার দেয়া হবে। থাকবে একটি বিশেষ পুরস্কারও।
যারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল, সবাই বড় হয়ে কী হতে চায়–এই নিয়ে তাদের মনের ইচ্ছের কথা বলল। তিতলি সবার কথা মন দিয়ে শুনছিল। হাততালি দিচ্ছিল। একসময় তিতলিকে বলতে বলা হলো।
তিতলি বলল, “আমি সবার প্রথমে সভাপতি, প্রধান অতিথি, যাঁরা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন ও উপস্থিত গুরুজনদের প্রণাম জানাই। বন্ধুদের জানাই ভালোবাসা। আমি আমার মা-বাবার কাছে কৃতজ্ঞ। এইজন্য যে, তাঁরা আমাকে ঠাকুরমার স্নেহ ও আদর থেকে বঞ্চিত করেননি। আমি যখন স্কুলের বন্ধুদের কাছে আমার ঠাকুরমার গল্প করি, তখন দেখি তাদের চোখ ছলছল করে ওঠে। অনেকের ঠাকুরমা, ঠাকুরদা মারা গেছেন। যাদের আছে, হয় তাঁরা অন্য কোথাও থাকেন, নয়ত বৃদ্ধাশ্রমে। আমি চাইব সব ঠাকুরমা, ঠাকুরদারা যেন তাঁদের বাড়িতেই থাকেন। সুস্থ থাকেন।”
সে আরো বলল, “যেদিন আমার ঠাকুরমার জ্বর হলো, আমি মাথায় জলপট্টি দিলাম। আমার যখন জ্বর হয়েছিল, তখন ঠাকুরমা, মা এইরকম করেছিল। তখন মনে হলো, আমি তো একটু চেষ্টা করলেই অনেক কিছু করতে পারি। সেদিন থেকে ঠিক করলাম, বাবা-মা অফিসে চলে গেলে ঠাকুরমা যেমন আমাকে যত্ন করে, আমিও তেমন করে অসুস্থ ঠাকুরমার জন্য সব কাজ করব। ঠাকুরমা চাইত, আমি যেন কোনো কাজ না করে শুধু লেখাপড়া করি। আমার তখন মনে হলো, আমি তো কত সময় বৃথা নষ্ট করি। যদি লেখাপড়ার সময় ফাঁকি না দিই, তবে কাজ করতে অসুবিধা কোথায়?”
“আমি যে কোনোদিন এত কিছু করতে পারব, তা ভাবতে পারিনি। আমি ঠাকুরমার পরামর্শ নিয়ে এখন সব কাজ করতে পারি। মনে হয়, কখন যে মানুষকে কোন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, তারজন্য সবরকম ভাবে তৈরি থাকা উচিত। আমার সৌভাগ্য যে, আমি ঠাকুরমাকে রোজ কাছে পাই। তাই খুব খুশি”–কথা শেষ করে হাত জোড় করল তিতলি। বলল, “এটাই আমার মনের কথা।”
এরপর পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শুরু হলো।
তিতলির বক্তব্যের জন্য তাকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হবে। এই ঘোষণা হতেই সবাই হাততালি দিতে শুরু করল।
তিতলিকে মঞ্চে ডাকা হলো। অনুষ্ঠানের সভাপতির হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে তাঁকে প্রণাম করে, তিতলি মাইক হাতে নিয়ে বলল, “যদি আমার ঠাকুরমাকে মঞ্চে আসতে বলা হয়, তবে আমি খুব খুশি হবো।”
ঠাকুরমা মঞ্চে এলে তিতলি বলল, “আমি আজ যে পুরস্কার পেয়েছি এরজন্য খুব খুশি। এই আনন্দ আমি সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। এই পুরস্কার চিরকাল মাথায় করে রাখব। আমি মঞ্চে যখন কথাগুলি বলছিলাম, দেখছিলাম আমার ঠাকুরমার মুখে হাসি।” তিতলি তার পুরস্কার ঠাকুরমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, “এই পুরস্কার আমার কাছে অনেক শ্রদ্ধার। এটা আমি ঠাকুরমার কাছে রেখে দিচ্ছি।”
একটু থেমে তিতলি বলল, “তবে আজ আমি ঠাকুরমার মুখে যে হাসি দেখেছি, সেটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। এই পুরস্কার আমি হৃদয়ে ধরে রাখব।”
তিতলির কথা শেষ হতেই চারিদিকে হাততালির ঝড় বয়ে গেল।
পাঠকদের মন্তব্য
250