ছবিকবি
সঞ্জিতকুমার সাহা
অন্যদিন বালিশে মাথা ছোঁয়ানোর সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ে রূপু। কিন্তু সেদিন শুয়ে ঘুম আসছিল না কিছুতেই। শুয়ে শুয়ে কেবল সেই ছবিটার কথাই মনে পড়ছে বারে বারে। ছোটকা আর বাসুকা দুজনে মিলে একটা ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে একটা ছবি কেটে কাঁচের ফ্রেমে আটকাচ্ছিল। ছবিটা একজন বুড়ো মানুষের। তার আবার লম্বা লম্বা দাড়ি, চুলগুলোও তেমনি বড়ো বড়ো। দেখতে অনেকটা ঠাকুর-ঠাকুর মতো। আর তার চারদিকে লেখা রয়েছে অ আ ই ঈ উ ঊ...। অ আ-য়ের নিচে লেখা আছে, ‘ছোটো খোকা বলে অ আ/ শেখেনি সে কথা কওয়া’। তেমনিভাবে ‘হ্রস্ব ই দীর্ঘ ঈ/ বসে খায় ক্ষীর খই’। এইভাবেই রয়েছে ‘ডাক পাড়ে ও ঔ/ ভাত আনো বড়ো বউ’।
ক্যালেন্ডারের পাতা জুড়ে রূপুর বইয়ের লেখাগুলোর ভিতর দিয়ে ছবিটা যেন ভুস করে ভেসে উঠছে। ছবির নিচে একটা আবছা ছবি। তাতে ফুটে উঠেছে একটা গ্রাম, গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা একটা ছোটো নদী। নদীর একধারে আমবাগান। অপর দিকের ঢালে ছোটো ছোটো ক্ষেত। তাতে ফলে আছে সবজিপাতি। এদিকের ঢাল গড়িয়ে, নিচে কতগুলি বাচ্চা ছেলেমেয়ের নদীতে গামছা ছেঁকে জল তুলে হই হই করে গায়ে ঢালার ছবি। ওই ছবির গায়ে কচি হাতের ছোঁয়ায় আঁকাবাঁকা অক্ষরে ছোটো ছোটো হরফে লেখা, ‘আমাদের ছোটো নদী চলে আঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/পার হয়ে যায়…’। রূপু এখন এই কবিতাটাও পড়তে পারে। চেষ্টা করলে মুখে মুখে বই না দেখেও বলতে পারে।
এই লেখাগুলোর মাঝখান দিয়েই ভেসে উঠেছে সেই বুড়ো-দাদুর ছবি। রূপু সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জিজ্ঞেস করে, বাসুকা ওই দাদুটা কে? কার ছবি গো?
রূপুর ধারনায় ওটা কোনও দেব-দেবীর ছবি হতে পারে। ঘরে তো কত দেবদেবীর ছবি। দেবদেবীর ছবি ক্যালেন্ডারেই আসে, তারপর সেগুলো বাঁধিয়ে ঘরের দেয়ালে টাঙানো হয় সেই ছবিগুলোর দিকে বড়োদের অনেকেই হাত জোড় করে প্রণামও সারে। রূপু প্রণাম করার কারণ জিজ্ঞেস করলে বড়োরা বিশেষ কিছু বলে না। কেন বলে না রূপু তা জানে না। অথচ রূপুর জানার ইচ্ছে খুব। রূপু দেখেছে বড়োদের কিছু জিজ্ঞাসা করলে সব জিজ্ঞাসার উত্তর ওনারা দেন না।
কেউ বলে, ও মা এটা জানিস না! কেউ বলে, নিজে পড়ে জেনে নে। এখন এত কথা বলা যাবে না। আবার কেউ বলে, বড়ো হ’, বড়ো হয়ে জানিস। তাই এখন জিজ্ঞাসা করতে ভয় হয়। রূপু ধরেই নিয়েছে, ওর সব জিজ্ঞাসার উত্তর বড়োরা দেবে না। তবে কখন কখনও আবার দেয়ও।
ক্যালেন্ডারের ছবিটা কার শুধোতে বাসুকার মুখ দেখে মনে হলো, ও হয়তো বলত, কিন্তু তার আগেই বাদ সাধল ছোটকা। তিনি বলে উঠলেন, তুই চিনিস না?
চিনলে কি জিজ্ঞেস করত রূপু? ছোটকা যে কী মনে করে নিজেকে! রূপু বাসুকা ছোটকা কারুর উপরেই রাগ করল না। কেবল বোকা বোকা মুখ করে বলল, চিনি না বলেই তো জানতে চাইছি।
সত্যি রূপু চেনে না। তাই শুকনো মুখ করেই দাঁড়িয়ে রইল।
রূপুকে দেখে হয়তো বাসুকার মনে দয়া হলো। তিনি কাঁচের ফ্রেমের পিছন দিকে একটা পিচবোর্ড আটকাতে আটকাতে বলল, ছবিটা রবি ঠাকুরের।
রবি ঠাকুর? সে আবার কে? রূপুর মুখ ফুঁড়ে দুম করে প্রশ্নটা বের হয়ে এল।
এবারে দুই কাকাই এমনভাবে রূপুর দিকে তাকাল যে ওর মনে হতে লাগল, কথাটা বলে যেন খুব অপরাধ করে বসেছে। মানে এমন ধরনের প্রশ্ন করাই উচিত হয়নি। অথবা এই ছবিটার কথা সবাই জানে, কেবল রূপুই জানে না। রূপুর খানিক লজ্জা বোধ হতে লাগল। ঠিক এমন সময়ে ঘরে ঢুকলেন অমর জেঠু। তিনি দোতলায় থাকেন। নিচে নামেন কম। আজ নেমেছেন। তিনি ঘরে ঢুকেই বাসুকা ও ছোটকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি রে এখনও হয়নি? এই একটা ছোট্ট কাজ করতে ক’ঘন্টা লাগাবি?
বাসুকাই জবাব দিল, এই হয়ে এসেছে। পিছনে বাঁশপাতার ধূসর কাগজটা আটকে দিলেই হয়ে যাবে।
অমর জেঠুকে দেখে রূপু একটু ভরসা পেল। তাই জেঠুর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রূপু জানতে চাইল, জেঠু রবি ঠাকুর কে? এই ছবিটা কি ঠাম্মির পুজোর ঘরে দিয়ে আসবে? ঠাম্মি রোজ পুজো করবে? এই ঠাকুরকে পুজো করলে কি হয়?
এক সঙ্গে অনেক প্রশ্ন। ছোটকা এবং বাসুকা একসঙ্গে হি হি করে হেসে উঠল। ওদের এই হাসিটা রূপুর পছন্দ হলো না।
অমর জেঠুও বোধহয় সেটা বুঝতে পারলেন। রূপুকে তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসে সামনের বাগানটায় বসলেন। তিনি রূপুকে বোঝাতে লাগলেন, রূপু ছবিটা হচ্ছে একজন মানুষের। তিনি আমাদের দেশের মস্ত বড়ো কবি। দেশে-বিদেশে তাঁর নাম। ওই ছবিটার চারপাশ জুড়ে যে লেখাগুলো সে তো তোদের সহজ পাঠেরই। অ আ…ছোটো খোকা বলে অ আ/ শেখেনি সে কথা কওয়া। ই ঈ …!
সে তো রূপু জানে। রূপু তো এখন বই দেখে এসব পড়তেও পারে। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু তবুও ‘কবি’ ব্যাপারটা রূপু বুঝে উঠতে পারে না। মনের ভিতরে কেমন খচখচ করতে থাকে। কবি শব্দটা মাথার ভিতরে পাক খেতে থাকে। কিছুটা সময় নিয়ে অমর জেঠুর দিকে তাকিয়ে ফের জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা জেঠু কবি কি? রবি ঠাকুর কবি কেন?
অমর জেঠু নিজেও কবিতা লেখেন। কিন্তু এখন কবি ও কবিতা ব্যাপারটা এই ছোট্টো রূপুকে তিনি বোঝাবেন কী করে! তিনিও পড়লেন মহা ফাঁপড়ে। শেষে বললেন, যাঁরা কবিতা লেখেন তাঁদের কবি বলে।
কবিতা কি জেঠু? অবাক বিস্ময়ে জানতে চাইল রূপু।
সাংঘাতিক প্রশ্ন। অমর জেঠু ভাবতে লাগলেন, তিনি এতকাল অনেক কবিতা লিখেছেন, অনেক জায়গায় কবিতা পড়েছেন। কিন্তু কখনও এমন একরত্তি ছেলের কাছে এমনতর প্রশ্নের মুখোমুখি হননি। তাই খুব চিন্তায় পড়লেন, এই একরত্তি ছেলেকে তিনি বোঝাবেন কি করে?
তিনি বাগানের গাছগাছালির দিকে তাকালেন। ওদের বাগানটা পেরিয়ে, রাস্তা পেরিয়ে, সামনের বড়ো পুকুরের মাথার উপরে আকাশটার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে রূপুকে বোঝাতে শুরু করলেন, কবিতা হচ্ছে ছবি। যেমন ধর আমাদের বাড়ির সামনে যে পুকুরটা আছে তার মাথায় যে একটা বিরাট আকাশ আছে সেই আকাশে কখনও রোদ, কখনও মেঘ, কখনও ছায়া দেখিস তো?
হ্যাঁ, চটপট উত্তর দেয় রূপু।
অমর জেঠু বলে চললেন, ওই যে এক টুকরো মেঘের ছায়া, বাতাসে ভেসে ভেসে, কী সুন্দর হেলেদুলে, হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে পুকুর পেরিয়ে, পুবের চন্ডীতলার মাঠ পেরিয়ে, রেললাইনের পাশের ঝিল পেরিয়ে তারপর সেই বনের মাথায় গিয়ে কোথায় হারিয়ে যায়। ছায়ারা তখন ঘন হয়ে আমবাগানের মস্ত পেটমোটা শিমূল গাছটার গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। আর দিনের আলো ফুরোতে থাকে কোনওরকম শব্দ না করে। এটা একটা ছবি। এই ছবি সবাই দেখতে পায় না। আমরাও পাই না। তবে চেষ্টা করলে আমাদের বাড়ির এই বারান্দায় বসেও আমরা কিছুটা দেখতে পাই। তার সঙ্গে বাকিটা ভেবে নেয় কেউ কেউ। এই কিছুটা দেখা ও কিছুটা ভেবে নেওয়ার ব্যাপারটা দুয়ে মিলে একটা কল্পনা। কল্পনা মানে একটা ছবি। এই ছবি থাকে মনের ভিতরে। এই দুয়ে মিলে হয় কবিতা। আর যাদের মনের ভিতরে এই ছবি ফুটে উঠে তারা হয় কবি।
রূপু এইসবের কিছু বুঝল কী বুঝল না, কেবল অমর জেঠুর মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে পুকুরের মাথার উপরের মস্ত আকাশটার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে রইল। রূপু দেখল সেখানে ডানা মেলে উড়ছে এক ঝাঁক পাখি।
অমর জেঠু আরও বললেন, রূপু বড়ো হয়ে তুইও কবি হতে পারিস। কবিদের মধ্যে যে সব গুণ থাকা দরকার তার সবগুলিই তোর ভিতরে আছে। আমি দেখেছি, তুই জানালায় চোখ রেখে আকাশ দেখিস, তুই বাগান ঘুরে ঘুরে গাছ দেখিস, পতঙ্গ দেখিস, ফড়িং দেখিস, প্রজাপতি দেখিস। আমি দেখেছি যখন এসব দেখিস তখন কেমন কোথায় যেন তুই হারিয়ে যাস। রবি ঠাকুরও তাঁর ছেলেবেলায় এইসব দেখত আর এইসবের ছবিগুলো মনের ভিতরে কোথাও জমিয়ে রাখত। কাগজ কলম পেলে সেইসব জমানো ছবি মনের ভিতর থেকে তুলে এনে লিখে ফেলত। এইসব দেখতে দেখতে, ভাবতে ভাবতে, লিখতে লিখতেই তিনি একদিন মস্ত কবি হয়ে গেলেন।
তাই তো কবি হতে পারলে একদিন রূপুরও ছবি হয়তো এইভাবে ক্যালেন্ডারে ছাপা হতে পারে। ক্যালেন্ডারের ছবি তখন কেউ হয়তো ছোটকা ও বাসুকার মতো কেটে নিয়ে ফ্রেমে আটকে ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখবে। এইসব ভাবতে ভাবতেই রূপু নিজের ভিতরেই কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
রূপু ভাবে, ছবি দেখতে তো ভালোই লাগবে। কিন্তু কবি কি ও হতে পারবে? আর কবি না হলে তো সে ছবি হতে পারবে না। আর ছবি না হলে…, কত সহজভাবে প্রশ্নগুলো রূপু নিজেকেই করতে থাকে। তারপর…!
তারপর?
রূপু সেদিন ইস্কুল থেকে ফেরার পথে কত কী-ই দেখল।
নিমগাছের একটা ডালে একটা কাককে একা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখল। ছাতিমগাছের পাতার আড়ালে বসন্তবৌরি পাখিকে দেখল। একটা একঠেঙে ইউক্যালিপটাস গাছের মাথার উপর দিয়ে এক টুকরো ধূসর মেঘের উড়ে যাওয়া দেখল।
বড়ো রাস্তার ধারে ফণিমনসার ঝাড় দেখল, ঝাড়ের মাঝে মাঝে হলুদ রঙের ফুল দেখল। আর ধুলোর কুচিতে ভরে থাকা গাছেদের সারা গা দেখল। ইস্ কী নোংরা, গাছগুলোকে জল দিয়ে চান করাতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তো তা সম্ভব নয়। তাই অন্যদিকে চোখ ফেরাতেই রূপু একসঙ্গে দেখতে থাকল, অনেক মানুষের ছুটে চলা, বাস-ট্যাক্সি এবং ঘোড়ায় টানা গাড়ি। এইসব দেখে আর রূপু ভাবে, আচ্ছা এত এত মানুষ, এত এত গাড়ি সব আসে কোত্থেকে আর যায়ই বা কোথায়?
রূপুর মনে কত কত জিজ্ঞাসা, কত কত যে প্রশ্নের আঁকিবুকি। রূপু নিজেই ভেবে পায় না এত এত জিজ্ঞাসা ওর মনে আসে কি করে? কিন্তু কোনও উত্তর খুঁজে পায় না। আবার কিছুক্ষণের মধ্যে সেসব প্রশ্ন হারিয়েও যায়। অদ্ভুত ব্যাপার তো! মনে পড়লে নিজের মনেই খানিক ফিক করে হেসেও ফেলে।
সেদিন বিকেলে পুকুরপাড়ে বসে রূপু এক অপূর্ব দৃশ্য দেখল। পুকুরটা পার হয়ে চন্ডীতলার মাটি থেকে বেশ কিছুটা উপরে জমাট বাঁধা মেঘের মতো কুয়াশা শূন্যে ঝুলে রয়েছে। অবাক হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। চমৎকার সেই ছবি। হয়তো জমাট বাঁধা এই কুয়াশাই রাতের বেলা শিশির হয়ে ঝরে পড়বে মাটি থেকে উঠে আসা গাছ, গাছের পাতায় ও ঘাসের ডগায়। তারপর হয়তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লতাগুল্মেও পড়বে।
অমর জেঠুর কথামতো এইরকম অনেক অনেক ছবি এখন থেকে মনের ভিতরে, বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে শুরু করেছে রূপু। শুয়ে শুয়ে এইসবই ভাবছিল। আর ভাবতে ভাবতেই ঘুম আসছিল না। তখন রূপু ভাবল, এইসব ছবিগুলোই কি কবিতা? আর ছবিগুলোর কথা লিখে ফেললেই কি কবি হওয়া যায়? কবি হলেই কি ক্যালেন্ডারের পাতায় ছবি হয়ে উঠবে ও? কে জানে!
ওর যে ক্যালেন্ডারের পাতায় ছবি হয়ে ওঠার খুব ইচ্ছে হচ্ছে। যেমন ওই ছবিকবি হয়েছেন। এইসব সাতসতের ভাবতে ভাবতেই, রূপু এক সময়ে ঠিক ঘুমিয়ে পড়ে।
পাঠকদের মন্তব্য
250