আম
শোভন শেঠ
নীল পড়তে বসলেই যত রকমের অনাসৃষ্টি করবে। ওর আর দোষ কী? এটা কি পড়ার বয়স? এই তো সবে চারে পড়ল।
গত সোমবারের কথাটাই তাহলে বলি। সন্ধে সাতটা হবে হবে সারাদিন প্যাচপ্যাচে গরম। নীলের মা ঠাকুরঘরে। বাবা তখনও অফিস থেকে বাড়ি ফেরেনি। আমি বললাম, “এই বই নিয়ে আয়।”
গোলগোল সে চোখে বলল, “কেন?”
আমি বললাম, “কেন আবার? পড়াব।”
“কাকে পড়াবে?”
“কাকে আবার? তোকে?”
“এই দাদু কতবার পড়াবে শুনি? ওবেলা তো পড়ালে।
খাতা আনতে বললে। আমি তো খাতা আনলাম। তুমি মুখে মুখে আমায় ওয়ান থেকে হান্ড্রেড বলতে বললে। আমি বললাম। আমি তো কোনো ভুল বলিনি দাদু।”
“না তা বলোনি।”
“তারপর তুমি ওয়ান থেকে টোয়েন্টি ফাইভ লিখতে দিলে।”
“দিয়েছিলুম!”
“সব লিখেছি। ভুল তো লিখিনি, তাই না ?”
“সে তো ওবেলার কথা। এবেলা পড়তে হবে না?”
“ও দাদু, তোমার ঘটে এক্কেবারে বুদ্ধি নেই।”
“মানে?”
“আরে বাবা, ওবেলা মানে তো আজই লিখেছি। তবে আজ আর পড়ব কেন?”
“যত সব পাকা পাকা কথা। বাংলা বই নিয়ে এসো। এবেলা অ, আ পড়াব। এখনও স্বরবর্ণ চিনতে শিখলে না!”
নীল বই নিয়ে হাজির হলো। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, চোখ দুটো ছলছল করছে। মায়া হলো। ছোট ছেলে। এখন খেলার বয়স। দুষ্টুমির বয়স। কিন্তু সময় বদলে গেছে। আমাদের কাল আর নেই। আমাদের সময় পাঁচবছর পূর্ণ হলে, তবে সরস্বতী পুজোর দিন বামুন ঠাকুর খড়ি দিয়ে ‘অ’ লিখিয়ে হাতেখড়ি করতেন। এখন তো দু'বছর পূর্ণ হতে না হতেই মুখে খড়ি হয়ে যায়। বাড়িতে অ, আ–A, B শেখানো হয়। স্কুলে ভর্তি করাবার সময়ই প্রিন্সিপাল একটা কাগজে বাঘের ছবি দেখিয়ে প্রশ্ন করেন, হোয়াট ইজ দিস?
বলতে হয়, টাইগার।
না বলতে পারলেই এডমিশন হয় না। তাই আজকাল বড় হয়ে কেউ টাইগার হচ্ছে না।
আমি বর্ণপরিচয়-এ চোখ নামালুম,” বলো ‘অ’ কোনটা?”
হাত রাখল ‘আ’ অক্ষরে–‘আ’-এর পাশে পাকা আমের ছবি। নীল ‘অ’-এ হাত দিল না–পাশে অজগরের ছবি। বলল,”এই যে দাদু, এইটা ‘অ’। জানো দাদু আমি আম খেতে খুব ভালোবাসি।” বুঝলাম পড়ায় মন নেই। কেবল খাওয়ায় মন। গল্প জমাবার মতলব। আমি এক দাবড়ানি দিয়ে বললাম,
“ঠিক করে বলো, কোনটা ‘অ’?”
থতমত খেয়ে নীল ‘ই’-য়ে হাত রেখে বলল “এইটা দাদু।”
আমার এবার রাগ হল। কড়া এক ধমক দিয়ে বললাম, “চালাকি পেয়েছো? কিছু শিখলে না। ওটা তো ‘ই’। দেখছ না নিচে একটা ইঁদুরের ছবি আঁকা। কতবার তোমায় পড়িয়েছি। তোমার দেখি কিস্যু মনে থাকে না। শুধু খাওয়ার দিকে নজর!”
আশ্চর্য! নীল আমার ধমক গ্রাহ্য করল না। আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “জানো দাদু, আমি না আম খেতে খুব ভালোবাসি। হিমসাগর, ল্যাংড়া। খুব মিষ্টি।”
আমি বুঝলাম, আজ আর পড়া হবে না। গল্প জমাবার মতলব করছে। দুষ্টুসোনার এখন পাকা আমের দিকে নজর। আর পড়াশোনার ইতি হয়ে গেল।
নীল ছুটে চলে গেল ফলের জায়গায়। আমার কাছে শুকনো মুখে এসে দাঁড়িয়ে গোল গোল হাতদুটো নেড়ে বলল, “দাদু নেই।”
“ কী নেই দাদুভাই?”
“একটাও আম নেই।”
ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বড় মায়া হল। আম খেতে খুব ভালোবাসে। আবার ছুটে গিয়ে ফ্রিজটা খুলল।
আমি বললাম, “করো কি, করো কি। ফ্রিজ খুলো না।
মা রাগ করবে।”
আর খুলো না। দুষ্টু তখন ফ্রিজ খুলে একটা বাক্স টেনে বার করেছে। ওতে খেজুর আছে। হাতের ছোট মুঠোয় যে ক’টা পারল তুলল। তারপর আমার মুখে একটা খুঁজে দিয়ে বলল, “তুমি একটা খাও দাদু। খেতে খুব ভালো।”
নিজেও একটা খেল। আজ আর পড়াশোনা হবে না, বুঝলাম। বললাম, “যাও, বই তুলে রাখো। কাল সকালে কিন্তু বই নিয়ে বসতে হবে।”
“আচ্ছা দাদু।”
বইপত্র ব্যাগে গুছিয়ে লঘুপদে জায়গায় রেখে এলো।
এই সময় দরজায় কলিংবেল বাজল। বউমা দরজা খুলল।
দেখি আমার ছেলে অফিস থেকে ফিরল। ওর হাতে হলুদ প্যাকেট।
নীলকে বলল, “আম এনেছি। খাবে তো?”
বাবার হাত থেকে আমের প্যাকেটটা নিয়ে আমার কাছে এসে বলল, “দাদু, বাবা আম এনেছে। রাতে খাওয়ার সময় সবাই মজা করে খাব।”
আমি নীলের মুখে হাসি দেখলাম। মনে হলো বেথেলহেমের ছোট্ট যিশু যেন হাসছে।
পাঠকদের মন্তব্য
250