ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্পগাথা / জানুয়ারি ২০২৬

সোনাইয়ের বন্ধু

এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যেস নেই সোনাইয়ের। কিন্তু আজ মায়ের তাগাদায় উঠতে হলো–এবং উঠতে হলো বলেই ঠিক সময়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে উঠে বসতেও পেরেছে। ট্রেনও ঠিক সময়ে ছেড়ে দেয়। সোনাইয়ের বাবা ততক্ষণে ওদের ঢাউস স্যুটকেসটা ওপরের বাঙ্কে তুলে রাখতে পেরেছেন। লম্বা কম্পার্টমেন্টের কোথাও ফাঁকা জায়গা দেখতে পায় না সোনাই। সে জানলার ধারে বসেছে। কাচের জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখল, বৃষ্টিও শুরু হয়েছে ঝিরঝির করে। ট্রেনের গতি তখনও বাড়েনি তত। সোনাই তার বাবা ও মা-র সঙ্গে পাশাপাশি তিনটে চেয়ারে বসেছে। ওদের সামনের চেয়ারের কারোর মুখ দেখা সম্ভব নয়। সে ঘাড় ফিরিয়ে দ্যাখে পাশের সারির তিনটে চেয়ারেও ওদের মতন একটা পরিবার। মেয়েটির বাবা মোবাইলে গান চালিয়ে শোনাচ্ছেন তার মেয়েকে। সে মাঝে মাঝে খিলখিল করে হেসে উঠছে। 

 

         সোনাইয়ের মা ততক্ষণে একটা কাপড়ের ব্যাগ থেকে টিফিন কৌটো বের করে কাগজের প্লেটে লুচি, আলুর তরকারি ও সন্দেশ এগিয়ে দিলেন তার দিকে। সোনাই খাওয়া শুরুর আগে পাশের সারির সিটে বসা মেয়েটির দিকে তাকাল। মেয়েটি বোধহয় কথা বলতে পারে না। তার চোখের ভঙ্গিমায় বিরক্তির চিহ্ন। দুহাত তুলে ইশারায় কিছু বোঝাচ্ছে তার মাকে। সোনাই মায়ের হাতের বাক্স থেকে একটা সন্দেশ তুলে নিয়ে এগিয়ে গেল মেয়েটির দিকে। তারপর ইশারায় সন্দেশটা খেতে বলে মেয়েটিকে। সে কিছুক্ষণ সোনাইয়ের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। এবং মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত শরীর দোলাতে দোলাতে উত্তেজিত হয়ে সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মেয়েটির বাবা সোনাইয়ের হাত থেকে সন্দেশটা নিয়ে বললেন, “ঠিক আছে তুমি বোসো গিয়ে। আমি দেখছি।” তারপর নিজের মেয়েকে দু’হাত দিয়ে জাপটে ধরে সিটে বসাতে বসাতে বললেন, ‘শান্ত হও রুমা। কেউ বকছে না তোমাকে। সবাই ভালবাসছে।”

 

         সোনাই নিজের সিটে ফিরে গিয়ে তার মায়ের কাছে জানতে চায়, “ও এমন কেন করছে মা? আমি তো কিছুই করিনি ওকে।”

“ওর নাম রুমা। দেখলে না, ওর বাবা মেয়েটির সঙ্গে ওই নামেই কথা বলছেন। আসলে রুমা হয়তো অসুস্থ।”

মায়ের কাছ থেকে কথাগুলো শোনার পর সোনাই একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। মনে আছে, ক্লাস টু-তে পড়ার সময় সায়ন্তনী নামের একটি মেয়ে তার পাশে বসত। চুপচাপ থাকত। কথা বলত না। কখনো হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার করে ওয়াটার বটল, টিফিনবক্স ছুঁড়ে ফেলে দিত। কিছুদিন পর সে আর স্কুলে আসত না। বাবার কাছে শুনেছিল পরে, সায়ন্তনীকে নাকি তার মা-বাবা অন্যরকম একটি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। সোনাই তার পাশে, একটু দূরে বসে থাকা রুমার সঙ্গে যেন সায়ন্তনীর মিল খুঁজে পাচ্ছে। সোনাই লক্ষ্য করছে রুমাকে যেন অনেকটা শান্ত মনে হচ্ছে এখন। তার বাবার মোবাইলে গান শুনতে শুনতে কখনো হেসে উঠছে খিলখিল করে।

 

          সোনাই তার মাকে একটা চকোলেট বের করে দিতে বলে। তারপর সেটা নিয়ে সে এগিয়ে যায়। রুমার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে অবশ্য সোনাইয়ের দিকে তাকাচ্ছে না। মগ্ন হয়ে মোবাইলে গান শুনে যাচ্ছে। সে আরও একটু কাছে গিয়ে ডাকে, “রুমা।”

সে তখনও গান শোনায় মগ্ন। সোনাই তখন রুমার মাকে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি ওকে একটা চকোলেট দিতে পারি?”

“হ্যাঁ অবশ্যই।” রুমার পিঠে হাত রেখে বলেন তার মা। তারপর রুমার দিকে তাকিয়ে, “দ্যাখো রুমা কে এসেছে?” এবার সে মুখ তুলে সোনাইয়ের দিকে তাকায়। গান শুনতে শুনতে যে হাসি তার মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল সেটা এখন হঠাৎ হঠাৎ-ই উধাও। সোনাই বলে, “আমি সোনাই। আমি তোমার বন্ধু হতে চাই। হবে না?”

রুমার বাবা হেসে রুমাকে বলেন, “তোমার বন্ধু তোমার জন্য চকোলেট এনেছে।” 

রুমা তার হাতের দিকে একবার তাকায়, তারপর হাত বাড়িয়ে সোনাইয়ের কাছ থেকে টেনে নেয় চকোলেট। সোনাইয়ের ভালো-লাগাও শুরু হয় তখন। রুমার মা সোনাইকে বসতে দিয়ে নিজে সোনাইয়ের সিটে গিয়ে বসেন। রুমা ততক্ষণে এলোমেলো ভাবে চকোলেটের মোড়ক খুলতে ব্যস্ত। সোনাই তাকে সাহায্য করতে হাত বাড়ায়। কিন্তু এক ঝটকায় রুমা তার হাত সরিয়ে দেয়। সোনাই আর সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে তাকে বলে, “রুমা, সেলোফেনের ওপরের দিকটা ধরে টানো, খুলে যাবে।”

 

           সোনাই অবাক হয়ে দ্যাখে, কয়েকবারের চেষ্টায় রুমা টেনে ছিঁড়ে খুলে ফেলল চকোলেটের মোড়ক। তারপর দাঁতে একটু টুকরো করে চিবোতে থাকে চকোলেট। এরপর রুমা সোনাইয়ের দিকে ফিরে তাকায়। ভালো-লাগার দৃষ্টি বুঝল সোনাই।

সে বলে, “তুমিই’ খাও। আমি খেয়েছি আগে।” সোনাই আলতো করে রুমার কাঁধে হাত রাখে। এবার হাত সরিয়ে নেয় না রুমা। চোখেমুখে বিরক্তির ভাবও নেই। সোনাইয়ের মনে পড়ে যায়, তার ক্লাসের সায়ন্ন্তনীর কথা। বুঝতে পারে, ভালোবাসা দিয়ে রুমার মনও জয় করা সম্ভব। কোনো একটা স্টেশনে ট্রেনটা দাঁড়িয়েছে। তৎক্ষণাৎ কম্পার্টমেন্টে একটা হল্লা। চা-কফি হাতে হকারদের ভিড়। আর রুমাও জানলার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলাতে শুরু করল। একসময় তীব্র হলো সেই দুলুনি। রুমার বাবা তাকে শান্ত করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। সোনাই কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দেখছিল সব। তারপর হঠাৎই দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল রুমাকে। ফিসফিস করে তার কানে কানে বলল সোনাই, “তুমি সত্যিই খুব ভালো মেয়ে। আজ থেকে আমার বন্ধু হলে তুমি।” সোনাই তখনও তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। আর রুমার অস্থিরতাও ধীরে ধীরে কমে আসছে। ট্রেন ততক্ষণে আবার চলতে শুরু করেছে। হকাররা নেমে গেছে সবাই। ভেতরের হইহল্লাও এখন কম।

 

সোনাইয়ের মা দূর থেকে ওকে ডাকেন, “তুই কি আসবি এবার? আমরা লাঞ্চটা সেরে নেব।” 

“আসছি” মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে সোনাই। তারপর রুমার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠতে চায়। কিন্তু সে বুঝতে পারে, তার জামার একদিক মুঠো করে ধরে আছে রুমা। তার দৃষ্টি চলন্ত ট্রেনের জানলার দিকে। সোনাই বুঝতে পারে না কী করবে। সে ফের বসে পড়ে রুমার পাশে। মাকে বলে, “তোমরা খেয়ে নাও। আমি পরে আসছি।”

ট্রেন যেন হঠাৎ তার গতি বাড়িয়ে দিল। সোনাই কোনভাবেই রুমার বেষ্টনী থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারছে না যেন। রুমার বন্ধু হতে পেরে এখন খুবই ভালো লাগছে তার। নিশ্চয়ই রুমারও ভালো লাগছে, নাহলে তাকে ছা

ড়তে চাইছে না কেন!


পাঠকদের মন্তব্য

তনুজা চক্রবর্তী লিখেছেন... ১১ই জানুয়ারি, ২০২৬
ভালোলাগল গল্পটি।

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up