ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্পগাথা / ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পাখি সব করে রব

এ বাড়ির রীতিই এরকম। গরমের দুপুরে আবশ্যিক ঘুম। খাওয়া-দাওয়ার পরে একটু ঘুমোতেই হবে। সে ঘুম আসুক আর না আসুক, বিছানায় তোমাকে যেতেই হবে। এই নিয়ম। অথচ তোজোর দুপুরবেলায় শুয়ে ঘুম আসে না। ওর তো দুপুর কাটে ইস্কুলে, ঘাম-রোদ পড়া-পড়া খেলা আর হইহুল্লোড়ে।

 

     সেই তোজোর এখন গরমের ছুটি। খুলবে সেই জুনের শেষে। পুরো একমাস। গতকাল ইস্কুলে একটা ফাংশন হয়ে ছুটি হয়েছে। তোজো পরী সেজেছিল। সেই সাজ নিয়ে বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই তো তোজো নিজেকে দেখে অবাক। ও এত সুন্দর! সকলে খুব প্রশংসা করছিল। তোজো অবশ্য মনে মনে ভাবে, ও যত না সুন্দর, তার চেয়েও বেশি সুন্দর করে সাজিয়েছিল রানিদিদি। রানিদিদি ওদের ক্লাস টিচার। তবে কেউ প্রশংসা করলে তোজোর ভালো লাগে। তখন মনের ভিতরটাও সুন্দর হতে থাকে। তোজোর বুকের ভিতরে তখন যেন ধীরে ধীরে একটা সুন্দর ফুল পাপড়ি মেলে বড়ো হয়ে ফুটতে থাকে।

 

       এই নিয়েই তোজো গতকাল দিনভর, বিকেল সন্ধে এবং পুরো রাতটা কাটিয়েছে। ঘুমের মধ্যেও স্বপ্ন দেখেছে রানিদিদির। রানিদিদি আর তোজো দুজনেই পরী সেজে আকাশে মেঘের দেশে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই স্বপ্নের কথা মনে হতেই তোজো নিজের মনেই খিলখিল করে হেসে ওঠে।

     তোজোর হাসির শব্দে বিরক্ত হন দিদুন, কি রে এখনও ঘুমোসনি? একা একা অমন করে হাসছিস কেন? পাগল হলি নাকি?

     তোজো মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করে।

      এই এক দিদুন। সারাদিন কেবল শাসন আর ধমক। এটা করিস না, ওটা করিস না। যেন ‘না’-এর শতনাম। আবার আদরও করে। খুব আদর করে। তোজোরও দিদুনকে ছাড়া চলে না। মা তো সেই সকালে নাকে-মুখে গুঁজে ছুটতে থাকে। মায়ের ইস্কুল শহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে। মহানন্দা-কালিন্দির সংযোগ তীরে। দুপারেই বালুচর আর বাঁশবন। দূরে আম-কাঁঠালের সারি। গাছের আড়ালে উঁকি মারে ঘরবাড়ি। নদী কিনারে ছোট্ট ডিঙি নৌকো। বাতাসের ছোঁয়া পেলে একটু একটু করে দোলে। অপূর্ব শোভা, অপূর্ব দৃশ্য। তোজো মায়ের সঙ্গে কখনো মায়ের স্কুলে গেলে, অবাক হয়ে নদী দেখে, গাছ দেখে, গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের খেলা দেখে। খুব ভালো লাগে তার। তোজোর ইচ্ছা হয় মায়ের সঙ্গে রোজ ওই স্কুলে যায়। কিন্তু মা নিয়ে যায় বছরে এক-দুদিন। এখনো মায়ের স্কুলের ছুটি হয়নি।

 

      আর বাবা তো বাড়িতেই থাকে না, পরিযায়ী পাখির মতো। মাসে এক-আধবার আসে, কোনো মাসে আসেও না। এলেও থাকে এক-দুদিন। বাবা ধানবাদের এক কয়লাখনির সুপারভাইজার। সেখানে যেমন কাজের চাপ, তেমনি ঝুঁকিও। তাই ইচ্ছে করলেই ছুটি নিয়ে এসে থাকতে পারে না। তাই তোজো বাবাকেও কাছে পায় না।

       অতএব দিদুন ছাড়া আর তোজোর কে আছে! দিদুনের কথা তো শুনতেই হবে। অনেকদিন ধরেই দিদুনের টিয়াকাঠি আসার ইচ্ছে। টিয়াকাঠিতে দিদুনের এক খুড়তুতো বোন থাকে, রাঙাদিদুনের বাড়ি। তিনিও সদরে গেলে তোজোদের বাড়িতেই ওঠেন। তিনিও খুব ভালো মানুষ, তোজোকেও খুব ভালোবাসেন। হাসিখুশিতেই থাকেন। হাসি যেন সবসময়ে তাঁর ঠোঁটেই ঝুলে থাকে। সেই রাঙা দিদুনের বাড়িতে তোজোরা এসেছে আজ সকালে।

 

   মালদা-বালুরঘাট ট্রেন চালু হয়েছে বেশ কিছুদিন। দিদুনের ইচ্ছে ছিল, ট্রেন চালু হলে ট্রেনে চেপে একদিন টিয়াকাঠি যাবে। যদিও টিয়াকাঠি নামে কোনও স্টেশন হয়নি। তবে, একলাখি নামের একটি স্টেশন হয়েছে। অথবা গাজোলে নেমেও দিব্যি যাওয়া যায়। এই দুটোর যে কোন একটা স্টেশনে নেমে, তারপর ঘোড়ার গাড়ি করে যেতে হয়। ওরাও সেভাবেই এসেছে। আগে তো ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা ছিল। এখন অবশ্য অটো- ট্যাক্সির উপদ্রব হয়েছে। দিদুন ওইসব গাড়িতে উঠতে চায় না। এক একটা গাড়িতে এত গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে বসায় যে বমি বমি লাগে। তাই ঘোড়ার গাড়িই ভালো।

 

     তাছাড়া ঘোড়ার পায়ের চলায় একটা অদ্ভুত শব্দ তৈরি হয়। সেই শব্দ শুনতেও বেশ লাগে। তাছাড়া সেই শব্দটা চারপাশের ধানক্ষেত, আমবাগান, সজনেবাগান এমনকি রাস্তার পাশের সারি সারি বকফুলের গাছেও ছড়িয়ে পড়ে। তোজোর খুব ভালো লাগছিল। সকালের নরম রোদের মধ্যেও একটা ফুরফুরে হাওয়ায় তোজোর কপালের চুল উড়েছে খুশিতে। তখন মনের ভিতরে ওড়াওড়ি করছে এক ঝাঁক চড়ুই পাখি।

 

     টিয়াকাঠি নামটা যত সুন্দর, গ্রামটা তত সুন্দর নয়। বেশ অপরিচ্ছন্ন, ভাঙাচোরা মাটির বাড়ি, খড়ের চাল। শুকনো পুকুর। অগোছালো গাছপালা। বাড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে যে রাস্তা–সেও উঁচু-নিচু। কোথাও আবার ডাঁই করা আবর্জনা। সেসব মাড়িয়ে পথ চলতে হয়। যেখানে সেখানে তালগাছ, দু একটি আম-কাঁঠালের গাছও চোখে পড়েছে। তবে বনজঙ্গল সেরকম নেই, অনেক দূরে নাকি একটা শালজঙ্গল আছে। সেটা নাকি ফরেস্টের।

     একটা লোককে সাইকেলের পিছনে চৌকোনা কাঠের বাক্সে কাঠি বরফের আইসক্রিম বিক্রি করতে দেখেছে তোজো। আশ্চর্য গ্রামের সব বয়সের মানুষই ওর খরিদ্দার। এখানে সব বয়সের মানুষই ওই কাঠি আইসক্রিম চুষে চুষে খাচ্ছে। এবং এই কাঠি আইসক্রিম চুষতে চুষতেই সবাই বেশ হাসি-মশকরা-মজা-কৌতুক করছিল,সেটাও অবাক হয়ে দেখার মতো। হ্যাঁ তোজো অবাক হয়েই দেখছিল।

 

     দিদুন চোখ মেলে দেখল তোজো ঘুমিয়েছে কিনা। তোজোকে চোখ পিটপিট করতে দেখেই, তোজোর মাথায় আলতো চাপড় মেরে ছড়া কাটতে শুরু করে দেন দিদুন–আয় ঘুম আয় ঘুম /রাঙাদিদার বাড়ি/ ঘুমের সঙ্গে তোজোর ভাব/জাগার সঙ্গে আড়ি। তোজো জানে, দিদুন এরকম ছড়া কাটতে কাটতে ঘুমিয়ে পড়বে। তোজো অবশ্য এর আগেও ছুটির দিনে, দিদুনের আদর খেতে খেতে কোনো কোনোদিন ঘুমিয়েও পড়েছে। আজ কিন্তু অনেকক্ষণ চোখ বুজেও ঘুম এলো না।

 

     পাশের ঘরে রাঙাদিদুন একা শুয়ে। এখানে বলতে গেলে রাঙাদিদুন একাই থাকেন। গ্রামের মধ্যে একমাত্র পাকা বাড়ি। কিন্তু কোনও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। গরমকালে হাতপাখা আর গাছের পাতা ভরসা। তবে দিদুনের বাড়িতে অনেক গাছ। দুটো আমগাছ, গোটা চার ঝাঁকড়া নিমগাছ, একটা কাঁঠাল গাছ, একটা সবেদা এবং গোটা তিন জামরুল গাছ। সেজন্য তেমন গরম কিন্তু লাগছে না। এখন তো আমগাছে আম, সবেদা গাছে সবেদা, জামরুল গাছে জামরুলে ভরতি। রাঙাদিদুন বললেন, এখানে আগে সবেদা-জামরুল হতোই না। আমি কলকাতার আমতলা থেকে চারা আনিয়ে লাগিয়েছি। এখন বেশ ফল  ফলছে।

 

     দিদুনের কাছে তোজো শুনেছে, এই রাঙাদিদুনের খুব সাহস, এরকম গ্রামে একাই থাকে। এখানে থেকে জমিজমা দেখাশুনা করেন। জমি ছাড়াও নিজেদের গোটা তিন পুকুর আছে। পুকুরগুলি নাকি বেশ বড়ো বড়ো। ওখানে মাছ চাষ হয়। কেউ না থাকলে এসব লোপাট হয়ে যাবে। রাঙাদিদুনের একমাত্র ছেলে বহরমপুরে থাকে। ওখানে চাকরি করে। তবে মাঝেমধ্যে এখানে আসে, রাঙাদিদুনের খোঁজ-খবর নেয়। কিন্তু এখানে এসে থাকতে চায় না। অথচ এখানে কত ঘর। কত বড় বাড়ি, বাড়ির পিছনে বাগান, পুকুর। তবে খুব অগোছালো, রুচি বলে কিছু নেই। ঘরের চালে কত কবুতর। যেখানে সেখানে পটি করছে।

 

     অনেকগুলো ঘর থাকলে কি হয়, সবই যেন গুদাম। কোনো ঘরে বস্তা ভরতি চাল। কোথাও বস্তা বস্তা ধান। খাটের নিচে মেঝেয় বিছানো আলু-পেঁয়াজ। এগুলি নাকি সারা বছরের। সেজন্য মাঝে মধ্যেই নাকে ভেসে আসছে পঁচা আলুর ঝাঁঝালো গন্ধ।

      এর মধ্যে তোজোর ঘুম হয়? দিদুনটা যে কি করে এর ভিতরেই ভসভস করে ঘুমোচ্ছে !  

      আর রাঙাদিদুনেরও অদ্ভুত নিয়ম, খাওয়ার পরে ঘুমোতেই হবে। বলে রেখেছে, বিকেলবেলায় পদ্মদিঘি নিয়ে যাবে। এখান থেকে খানিক দূরে একটা দিঘি আছে, সেই দিঘির নাম পদ্মদিঘি। ওই দিঘি জুড়ে নাকি কেবল পদ্মপাতা। চমৎকার দেখতে। দেখলেই নাকি মন জুড়িয়ে যাবে। পাশেই একটা শিবমন্দির আছে। অত বড় শিবলিঙ্গ নাকি দেখাই যায় না। ওটা দিদুনের জন্য আকর্ষণ।

 

     রানিদিদির মুখ ভেসে উঠল হঠাৎ। তাঁর গলা, এই শোনো সব ছেলেমেয়েরা। এখন যে একমাস ছুটি। এই ছুটিতে তোমরা কে কি করবে?

     অরিত্র বলল, মামাবাড়ি যাবো।

     দেবলীনা বলল, কলকাতা যাবো।

     অদ্রি বলল, দার্জিলিং যাবো।

     আর যারা জানে না কোথায় যাবে, তারা সবাই চুপ করেই ছিল। তার মধ্যে তোজোও ছিল। সে তো জানে, বাড়িতে মা আছে দিদুন আছে, তারা যা বলবে তোজো তাই করবে।

       রানি দিদিমণি বলল, শোনো তোমরা যে যেখানেই যাও, কিংবা বাড়িতেই থাকো, রোজ কিন্তু পড়াশুনা চাই। স্কুলের বই যেমন পড়বে, যেমন রোজ হাতের লেখা লিখবে, তেমনি প্রতিদিন দুপুরে ঘুমোতে যাওয়ার আগে গল্পের বই পড়বে। এবং ঘুম থেকে উঠে খাতার লাইন ভরে ভরে এক পৃষ্ঠা করে হাতের লেখা লিখবে–ইংরেজি ও বাংলা। স্কুল খুললে আমি কিন্তু দেখব। এটাই এই এক মাসের হোমটাস্ক।

 

     কথাগুলো মনে হতেই তোজো গুমড়ে ওঠে। কাগজ-পেনসিল কিছুই তো আনেনি। কি হবে? এখানে দিদুন কদিন থাকবে কে জানে? আসার আগে তো বলেছিল কালকেই ফিরে যাবে। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ নেই। উলটে রাঙাদিদুন বলছে, ইতুর (তোজোর মা) ছুটি হলে ও আসুক, কদিন থাকুক। তারপরে তোরা একসঙ্গে যাবি। রাঙাদিদুন যেমন বলছে, তাতে তো সাত দিনেও ছাড়া পাবে না। কারণ তোজোর মায়ের স্কুল ছুটি হতে এখনও চার-পাঁচ দিন দেরি। সামনের সপ্তাহে। তাহলে?

      তাহলে কি করবে? তোজোর মনটা খারাপ হয়ে গেল। আগে জানলে বইখাতা সব নিয়ে আসত। বাড়িতে তো কত গল্পের বই। জাতকের গল্প, ঈশপের গল্প, সইদূনের গল্প। সেসব তো কিচ্ছু নিয়ে আসেনি। এমন কি খাতা-পেনসিলও আনেনি।

 

      এদিকে তোজোর শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসছে না। এখন কি করবে? কি করবে মনে হতে অমনি রানিদিদি ভুস করে ভেসে উঠল। সামান্য চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, এত বড়ো দুপুর। ঘুমোতেই হবে। ঘুম আসছে না বললে হবে না। যাতে সহজেই ঘুম আসে সেজন্য একটা উপায় বলে দিই। ঘুমোনোর আগে একটু পড়তে হবে।

     পড়তে হবে?

     হ্যাঁ। বলে হাসল রানিদিদি–না, স্কুলের পড়া নয়।

     তবে কি?

     ওই সময়ে পড়বে যে কোনও গল্পের বই। দেখবে, পড়তে পড়তে ঘুম এসে যাবে। আর পড়তে পড়তেই ঘুমিয়ে পড়েছ। বিশ্বাস না হয়, কাল থেকেই অভ্যাস করে দেখো।

 

     তোজোর তো এখন ঘুম আসছে না। এদিকে দুপুরটাও বিরাট, বেশ লম্বা। তাহলে অভ্যাসটা তো আজ থেকেই শুরু করা যায়। কিন্তু কি করে করবে? ভাবতে থাকে তোজো।

     ভাবতে ভাবতেই তোজো বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। দেখল দিদুন ঘুমে তালকাদা। পাশের ঘর থেকে রাঙাদিদুনেরও নাকডাকার শব্দ ভেসে আসছে। এর মধ্যে ঘুম হয়? তবুও আবার তোজো চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু নাহ্‌, ঘুম আসছে না।

 

      আবার রানিদিদি ভেসে উঠল, ঘুম না এলে, ঘুমের আগে বই পড়বে। গল্পের বই হলে ভালো। গল্পের বই না হলে যে কোনও বইই হতে পারে। আজই তো সেই ‘কাল’। গতকাল ইস্কুল ছুটির আগে রানিদিদি এই কথাগুলি বলেছিল। তার কথা এখন খুব মনে হচ্ছে। অথচ সকালবেলায় যখন দিদুনের সঙ্গে বের হয়, তখন মনে হয়নি। তাহলে তো দু-একটা বই, লেখার খাতাও নিয়ে আসতে পারত। আসলে ট্রেনে চড়ার আনন্দে এসব কথা একবারের জন্যও মনে হয়নি। তাছাড়া তোজো জানতই না টিয়াকাঠিটা কতদূরে, ওখানে কদিন থাকবে বা জায়গাটা কেমন। আসলে নতুন পাতা রেললাইনে রেলগাড়িতে চেপে আসার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দেই তোজো দুপুর পর্যন্ত বুঁদ হয়ে ছিল। আর সত্যি তো ট্রেনে চেপে দু পাশের মাঠ-জমি গাছপালা, মানুষ, গরু-ছাগল দেখতে দেখতে একবারের জন্যও রানিদিদির কথাগুলো মনে হয়নি। এখন মনে হচ্ছে।    

           

     কিছুতেই যখন তোজোর ঘুম এলো না, তখন বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে, বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। উঠে বই খুঁজতে থাকে। রানিদিদি তো বলেছে, যে কোনও বই পড়লেই হবে। সে পড়ার বই হোক বা গল্পের বই, যে কোনও একটা বই হলেই হলো। বই নাকি ঘুম পাড়িয়ে দেয়।

     প্রথমে যে ঘরে ওরা শুয়েছিল সেই ঘরের তাক, খাটের নিচে, এখানে-সেখানে চোখ ঘুরিয়েও কোথাও কোনও বই পেল না। এমনকি একটা খাতা বা সাদা কাগজটাগজও চোখে এল না। এমনি করে যতগুলো ঘর আছে সবগুলো ঘরেই ও ঘুরল, বই খুঁজতে থাকল কিন্তু কোথাও কিছু পেল না।

       তোজো অবাক হয়ে ভাবে বই ছাড়া বাড়ি হয় নাকি! এ কেমন বাড়ি! রাঙাদিদুনদের ঘরে একটাও বই নেই।

     ওদের বাড়িতে তো কত বই। এত বই যে রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। আলমারিতে, খাওয়ার টেবিলে, টেবিলের নিচে, এমনকি খাটের নিচেও বই। কখনও কখনও বিছানাতেও দু-একটি বই গড়াগড়ি দেয়। এইসব বই মা পড়ে, দিদুন পড়ে, তোজোও পড়ে।

 

      তবে তোজো দু-একটার বেশি বই পড়তে পারে না। মা অবশ্য ওর পড়ার মতোই বই ওর জন্য এনে দিয়েছে। সময় পেলে তোজো সেসব বই পড়ে। তোজোর সইদূনের গল্প বইটা পড়তে বেশ লাগে। আসলে সইদূন যে ওরই সমান বয়সি। খুব কষ্টের মধ্যে বড়ো হচ্ছে, ওর আব্বু ট্রলারে চেপে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। ওদের বাড়িতে কেউ পড়াশুনা জানে না। তবুও মেয়েটার লেখাপড়ার প্রতি কী আগ্রহ। মেয়েটি স্বপ্ন দেখে, ও বড়ো হয়ে ওর রাখি দিদিমণির মতো দিদিমণি হবে। সইদূনের যেমন রাখি দিদিমণি আছে তেমনি তোজোরও রানিদিদি আছে। রানিদিদিও তোজোকে খুব ভালোবাসে। সইদূনের সঙ্গে তোজো নিজের অনেক মিল খুঁজে পায়। সেজন্যই হয়তো সইদূনের গল্প পড়তে তোজোর এত ভালো লাগে। কিন্তু সে তো হলো। এখন যে একটা বই চাই। হাতে বই পেলে, পড়তে পড়তে হয়তো ঘুম এসে যাবে।

 

      তোজো ভাবে, রাঙাদিদুন কী কোনও বইটই পড়ে না? বাড়িতে তো ছুটির দিনে মাকেও বই পড়তে দেখে। দিদুনও শুয়ে শুয়ে বই পড়ে। আজ কিন্তু বই না পড়েই দিদুন বেশ ঘুমিয়ে পড়েছে। আর আসার পর থেকে দুই দিদুনের যে কত কথা, ফুরোতেই চায় না। বকর বকর করে বকেই চলেছে। যেন দম দেওয়া পুতুল। তাই হয়তো ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

      আবার রানিদিদির কথা মনে হলো। বই পড়লে ঘুম আসবেই। রাঙাদিদুন রানিদিদির ছাত্রী নয়, তাহলে বুঝত! ইস্কুল খুললেই প্রশ্নের ঝাঁপি নিয়ে আসবে। এক এক করে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করবে, কে কি করেছে, কে কি পড়েছে। আর বলেছে, পড়ার অভ্যাসটা কাল দুপুর থেকেই শুরু করতে। শুরু তো করতে চায় তোজো, কিন্তু এখন বই পাবে কোথায়? এখানে তো কোনও বইই চোখে পড়ছে না।

 

     এখন তবে তোজো কী করবে? এসব ভাবতে ভাবতেই ঘর থেকে বাইরে, বারান্দায় এলো। উঠোনেই একটা জামরুল গাছ আছে সেদিকে তাকাতেই হঠাৎ দেখল ওই গাছের ডাল থেকে টুপ করে খসে পড়ল একটা কাগজের ঠোঙা। একটা কাক সেটা ঠোঁটে করে নিয়ে এসেছিল বোধহয়। হ্যাঁ, ঠিক তাই। তোজো তাকিয়ে দেখে একটা কাক জামরুলের ডালে বসে তোজোকেই আড়চোখে দেখছে। কাকের চোখ দেখে একটু ভয় পায় তোজো। তারপর কি মনে হলো, এক বুক সাহস মনে এনে, এক ছুট্টে বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে ঠোঙাটা তুলে এনে সোজা ঘরে ঢুকে পড়ে তোজো।

 

     বই না হোক, ছাপা একটা কাগজ তো পাওয়া গেছে। খুব সাবধানে ঠোঙাটাকে খুলে সমান করে সামনে মেলে ধরে। আর অবাক কাণ্ড! কাগজে বড়ো বড়ো হরফে লেখা আছে–পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল/কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল। তারপর আর পড়া যাচ্ছে না, কালিতে তেলেতে মাখামাখি। হয়তো কেউ তেলেভাজা খেয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এখনও পোড়া তেলের  গন্ধ নাকে আসছে। সে যাই হোক। ঘুমোনোর আগে পড়ার মতো তো একটা কিছু পাওয়া গেল। তোজো তাতেই খুশি। তোজো ওই ঠোঙার কাগজটা হাতে করে নিয়ে এসে বিছানায় দিদুনের পাশে শুয়ে শুয়ে ওই লাইনদুটিই বারে বারে পড়তে লাগল। পড়তে পড়তে তোজোর ঘুম এসে গেল। তারপর সত্যি সত্যি ঘুমিয়েও পড়ল। আর ঘুমের মধ্যেই তোজো স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নের ভিতরে তোজো আবৃত্তির মতো সুর করে এক মনে পড়ে চলেছে, পাখি সব করে রব…!

     আর রানিদিদি দূরে দাঁড়িয়ে তোজোর দিকে একভাবে তাকিয়ে কেবল মিটিমিটি হাসছে।

 


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up