ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্পগাথা / এপ্রিল ২০২৬

গল্প-বিড়াল

 

একটা ছিল গল্প-বিড়াল গল্প ঝুড়ি খুলে

বসত সরোবরের পাড়ে জগতটাকে ভুলে!

ছন্দ দিয়ে শব্দ জুড়ে বলত সুর করে

এসেছে নাকি দেশ-বিদেশের নানান বই পড়ে!

 

এবার তবে শুরু করা যাক সেই গল্প-বিড়ালের কাহিনি। সে এক ছিল ছোট্ট সবুজ বন। সে বনে থাকত কেবল নিরীহ পশুর দল। তারা সবাই সবার আপনজন। কেউ কারও সঙ্গে কোনো বিবাদে জড়াত না। উল্টে কেউ কোনো সমস্যায় পড়লে সবাই এক জায়গাতে জড়ো হয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সে সমস্যার সমাধান করে নিত। আর সেই বনের মধ্যে ছিল একটি বেশ বড় সরোবর, যার জল খুব মিষ্টি। সেখানে ছিল প্রচুর মাছের বাস। আর সেই সব মাছগুলো ছিল খুব সুস্বাদু। বনের বাসিন্দাদের খুব গর্ব ছিল সেই সরোবরটাকে নিয়ে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সরোবরের মিষ্টি জল আর সুস্বাদু মাছেদের কথা।

 

হঠাৎই সেখানে আগমন ঘটল সেই গল্প-বিড়ালের।

সে এসেই বলল–

বলতে পারি গল্প আমি শুনতে যদি চাও

এই বনেতে কয়েকটা মাস থাকতে যদি দাও।

ভূতের দাদু বাঘের মেসো কোথায় করে বাস

কেমন করে রকেট ওড়ে গজায় চাঁদে ঘাস।

 

তার মুখ থেকে ঝরে পড়া ছন্দময় মিষ্টি কথাগুলো শুনে সবার খুব ভালো লাগল। বনের সবাই তাকে থাকতে দিতে রাজি হয়ে গেল। তারা কেউ বুঝতেই পারল না বিড়ালটার উদ্দেশ্যটা ঠিক কী ! সে বিড়াল নাকি সারাদিন কিছুই খায় না। রাতে কেবল নিজের মতো সবজি সেদ্ধ বানিয়ে খায়। নিরামিষাশী বিড়াল, সবাই খুব অবাক হলো! সে ছাড়াও সে বনে বেশ অনেকগুলো বেড়াল ছিল, তাদের তো দু-বেলা মাছ না পেলে মন খারাপ হয়ে যায়। ওর গল্প বলার ক্ষমতা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিড়ালটা অন্য বিড়ালদের মতো নয়। তার আচার আচরণ সবকিছুই তাই আলাদা, যা আগে কেউ কোনোদিন দেখেনি। হয়তো পৃথিবীর বাইরের কোনো জগত থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে গল্প বলে সবার মন ভালো রাখার জন্য।

 

যেহেতু সেই বনে একটাই জলাশয়। তাই মাছ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে হিসেব করেই সপ্তাহে একদিন সেখানকার আমিষাশী পাখি-জন্তুরা সেই মিষ্টি সরোবরের মাছ ধরে খায়। বাকি দিনগুলোতে বনের বাইরে থেকে নিজেদের খাবার সংগ্রহ করে আনে। এ বনে আসার আগেই গল্প-বিড়াল এসব খবর সংগ্রহ করেছিল। এটাও জেনেছিল, ওই মিষ্টি সরোবরের মাছ খুব সুস্বাদু। আর সেটা জানার পরেই সেই মাছ খাওয়ার লোভে সে সেই বনে বাস করতে এসেছিল। প্রথম দুদিন সে তারজন্য বরাদ্দ বাসার চারপাশে ঘুরপাক খেয়েছে আর সকাল-বিকেল বনের সবাইকে সুন্দর সুন্দর গল্প শুনিয়েছে। তার গল্প শোনার উপহার হিসেবে ফলমূল আর সবজিও পেয়েছে বনের বাসিন্দাদের কাছ থেকে। কিন্তু দুদিন পরেই তার মনে হয়েছে সে বলে দেবে এভাবে আর কারও কাছ থেকে সে কিছুই নেবে না। নিজের খাবার সে নিজেই জোগাড় করে নেবে।

 

পরের দিন বিড়াল তার সিদ্ধান্তের কথা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিল। আসলে কতদিন আর নিরামিষ খেয়ে থাকা যায়। দু-দিন কেটে গেল, এখনও সে মিষ্টি সরোবরের মাছের স্বাদ পেল না। আর সহ্য হচ্ছেনা তার। তাই সে সবাইকে ডেকে বলল–

শুনছে পাখি শুনছে পশু গল্প অনর্গল

পায় না কেবল শুনতে ছোটো-বড়ো মাছের দল।

বসব গিয়ে বিকেল বেলা সরোবরের পাড়ে

গল্প শুনে পড়বে সাড়া মাছের সংসারে।

 

তার কথাগুলো ভালো মনেই মেনে নিল নিরীহ  পশু-পাখির দল। সত্যিই তো, ওরাও তো এই বনেই বাস করে। তাদের মতো গল্প শোনার অধিকার মাছেদের অবশ্যই পাওয়া উচিত। মাছ খাওয়ার সুযোগটা যে এত সহজে পাওয়া যাবে সেটা গল্প বিড়াল কল্পনাও করতে পারেনি। বনের বাসিন্দাদের ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে এবার সে তার আগেই ভেবে রাখা ফন্দির সদ্ব্যবহার করতে আরম্ভ করল। রোজ বিকেলে সে তার গল্পের ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে সরোবরের পাড়ে বসে জলে পা ডুবিয়ে মাছেদের গল্প শোনাতে লাগল।

    মাছেরা তার গল্প শোনার জন্য জমা হতো সরোবরের চারপাশের পাড় ঘিরে। প্রথম দিনেই মাছেদের চেহারা দেখে গল্প বিড়ালের জিভে জল চলে এলো। কখন তাদের ধরে খাবে আর তর সইছে না তার। অবশেষে সন্ধেবেলা সে তার গল্পের ঝোলা কাঁধে নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে তার বাসায় পৌঁছে গেল। 

 

চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সূর্য ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পশু-পাখিরা যে যার বাসায় ঢুকে পড়েছে। কাল ভোরের আগে কেউ আর বাসা থেকে বের হবে না। এবার চারপাশে একটু নজর বুলিয়ে নিয়ে গল্প-বিড়াল নিশ্চিন্তে তার শিকার করা মাছগুলো দিয়ে জমিয়ে রাতের খাওয়ার পর্ব মিটিয়ে ফেলল। সত্যিই এমন মিঠে মাছ আগে সে কোনোদিন খায়নি। মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কেবল কয়েকটা মাস নয়, সে আর কোনোদিনই ওই বন ছেড়ে কোথাও যাবে না।

 

ওদিকে সরোবরের প্রতিটা মাছের হিসেব যে রাখে সেই বিশাল মাগুর মাছ দেখছে সপ্তাহে একদিন বনের বাসিন্দাদের মাছ খাওয়ানোর পর যতগুলো মাছ থাকার কথা তা নেই। এমনটা তো আগে কোনোদিন ঘটেনি। সে কথাটা তার সঙ্গী-সাথীদের কাছে বলার পর তারা বেশ অবাক হলো। তারপর নিজেদের মধ্যে কথা বলার পর ধরেই নিলো বয়সের ভারে হিসেবের গরমিল করে ফেলছে মাগুর দাদা, এ নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই।  আবার এটাও হতে পারে, আমরা তো কখনো কখনো নিজেদের সন্তানদের সঙ্গে অন্য মাছের পোনাদেরও না গুনেই খেয়ে ফেলি। কেউ হয়তো বেশি খেয়ে ফেলেছি।

 

যাই হোক, এভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।  মাগুর দাদা একটু মুষড়ে পড়েছে তার হিসেবের গরমিল হওয়াতে। তার জন্ম থেকেই সে রয়েছে এই জলাশয়ে। আগে কোনোদিন এমন ভুল সে করেনি। তবে কী সত্যিই তার বয়স হয়ে গেছে? সেই কারণেই মাথাটা আর সঙ্গ দিচ্ছে না! ঠিক কবে থেকে এমন গরমিল শুরু হলো? শ্যাপলা পাতার হিসেবের খাতা খুলেই সে আশ্চর্য হলো। গল্প-বিড়াল আসার পর থেকেই তার হিসেবে গরমিল শুরু হয়েছে। কিন্ত বিড়ালটা তো কেবল গল্প শোনায়। তাকে তো সে কোনোদিন শিকার করতে দেখেনি!

 

ওদিকে বনের পশু-পাখিদের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে গল্প-বিড়ালের চেহারার পরিবর্তন দেখে। সে যে শরীর নিয়ে বনে এসেছিল, সেই শরীরের বাড়বাড়ন্ত দেখে তাজ্জব বনে গেল সবাই। সেদ্ধ সবজি খেয়ে কারো শরীরে এত জেল্লা বাড়া সম্ভব? তবে কী রাতের বেলা বন থেকে বেরিয়ে বাড়ি বাড়ি চুরি করে দুধ-ঘি খেয়ে আসে? কেউ কেউ আবার বলল,তা কেন হবে? তোমরা এটা কেন ভাবছ না, ওর এমন কোনো শ্রোতা হয়তো আছে, যারা মুগ্ধ হয়ে ওকে দুধ-ঘি দান করে।

  একজন বলল, তাহলে হয়তো সন্ধের পর যখন আমরা বাসায় থাকি ও কোথাও গল্প শোনাতে যায়, আর সেখান থেকেই ভালোমন্দ খেয়ে আসে।

  বনের শিয়ালদের কথাগুলো ঠিক হজম হলো না, ওরাই তো বনের মধ্যে সবচেয়ে চালাক। তারা সবার সামনে মুখ ফুটে কিছুই বলল না। বাসায় ফিরে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসল। আগে কোনোদিন আলাদা করে এভাবে আলোচনায় বসতে হয়নি তাদের। বাধ্য হয়েই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলো। তারা তাদের এই সবুজ বনের শান্তির পরিবেশ কিছুতেই নষ্ট হতে দেবে না। পালা করে রাত জেগে গল্প-বিড়ালকে পাহারা দিতে লাগল তারা। পরপর চারদিন লক্ষ্য রাখার পরেও সরোবর থেকে ফেরার পর বিড়ালকে তার বাসার বাইরে কোথাও বেরতে দেখল না! তাহলে রহস্যটা কী? কী করে ওর শরীরের এভাবে পরিবর্তন হচ্ছে?

 

গল্প-বিড়ালটাও কম চালাক নয়। সে’ও বুঝতে পারছে তার শরীরের বদল দেখে তার ওপর নজরদারি করা শুরু হয়েছে। আর সেটা প্রথম শেয়ালরাই শুরু করেছে। যেভাবেই হোক সেটাকে না থামাতে পারলে তাকে এই বন ছেড়ে পালাতে হবে। ধরা পড়লে আর রক্ষে নেই।  পরদিন সকালের গল্পের আসরে গল্প শুরু করার আগে সে বলল,

করছো করো নজরদারি পাবে না খুঁজে কূল

আমায় নিয়ে ভাবতে গিয়ে করছো বড় ভুল।

গুরুর আশিস মাথায় ঝরে আদেশ মেনে চলে

গল্প শুনে দুঃখ ঘোচে গেছেন তিনি বলে।

 

আর আজ তাঁর সেই আদেশ পালন করতে গিয়ে আমি অসম্মানিত হচ্ছি। কারও কারও বিশ্বাস হারাচ্ছি। আমি আর এই বনে থাকব না। বুঝেছি, এই বনের বাসিন্দাদের আর আমার গল্প পছন্দ হচ্ছে না। আমি যেহেতু কয়েকটা মাস থাকতে চেয়েছি, আমি তার অন্যথা করতে পারব না। তাহলে গুরুর আশীর্বাদে গল্প বলার ক্ষমতা আমাকে হারাতে হবে। এই কয়েকটা মাস তোমরা আমাকে সহ্য করো, তারপরেই আমি চলে যাব।

 

কারা এমন কাজ করেছে? গল্প বিড়ালের ওপর সন্দেহ করা মোটেই উচিত হয়নি তাদের। অতি চালাক হওয়ার পরেও বিড়ালের মায়া কান্না মেশানো কথাগুলো শুনে থাকতে না পেরে শেয়ালরা ক্ষমা চাইল তার কাছে। বনের অন্যান্য বাসিন্দারও কাকুতি মিনতি করে তাকে সবুজ বনে থেকে যাওয়ার অনুরোধ জানাল। গল্প-বিড়াল তো এটাই চেয়েছিল। সে সবদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের ইচ্ছেমতো জীবন চালাতে লাগল। ভাবল, ভাগ্যিস সে গল্প বলার বিদ্যেটা রপ্ত করেছিল।

 

ওদিকে সরোবরে রোজ মাছের হিসেবে গরমিল হওয়ার কারণে মাগুর অনুসন্ধান করতে লাগল কারণটা ঠিক কী? কেন এইভাবে দিনের পর দিন তাকে বয়সের কথা শুনতে হবে। যতই বয়স হোক তার, সে জানে এখনো সে তার কাজ খুব মন দিয়ে করে। সেদিন গল্প-বিড়াল সরোবরের পাড়ে এসে জলে পা ডুবিয়ে বসতেই মাগুর খুব সাবধানে ডুবুরিদের মতো জলের তলায় ভেসে সোজা হাজির হলো বিড়ালের পায়ের তলায়। তারপর যা বোঝার সে বুঝে নিল। এর আগে সে কোনোদিন গল্প শুনতে আসেনি। আজ প্রথম এলো, নিজের বেহিসেবি বদনাম ঘোচানোর জন্য। অপেক্ষা করল গল্প শেষ হওয়া পর্যন্ত। বিড়াল যখন জল থেকে পা তুললো, তখন তার দুই পায়ের তলায় আটকে আছে খান চারেক মাছ। ওর খাওয়ার জন্য যেটা যথেষ্ট। বিড়াল এসব কিছুই জানতে পারল না। সে ভেবেছিল মাছেরা কোনো হিসেব রাখে না। কারণ তারা নিজেদের ছোট্ট বাচ্চাদের নিজেরাই খেয়ে ফেলে। সেদিন চারটে বেশ বড় সাইজের তেলাপিয়া মাছ পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল সে। রাতে খেয়ে একটু তাড়াতাড়িই শুয়েও পড়েছিল।

 

ওদিকে তখন মাগুর সব মাছেদের ডেকে পাঠিয়েছে। সবিস্তারে তাদের সামনে বর্ণনা করল পাজি বিড়ালের শিকার ধরার কৌশলের কথা। সে মাছেদের গল্প শোনাতে সরোবরের পাড়ে এসে জলে পা ডোবানোর আগে পায়ে এমন জুতো পরে নেয় যে জুতোর তলায় অজস্র কাঁটার মতো দেখতে খোঁচা খোঁচা কিছু লাগানো আছে। গল্প শেষ করার পর সে যখন পাড়ের কাছাকাছি গোড়ালি অবধি জলে পা ডুবিয়ে উঠে দাঁড়ায়,তখনই গল্পে বিভোর কিছু মাছের শরীর সেই কাঁটায় গেঁথে যায়।

   সবাই তো তার কথা শুনে অবাক! কেউ ভাবতেই পারছে না এভাবে গল্পের নামে ঠকিয়ে কেউ শিকার করতে পারে। তারা সবাই ঘোষণা করে দিল আর কেউ তার গল্প শুনতে যাবে না। কিন্তু মাগুর দাদা তাদের উল্টো কথা বলল, সে বলল অবশ্যই যাবে। তোমাদের না দেখলে সে জলের মধ্যে তার পা দুখানি ডুবিয়ে বসবেই না। আর পা না ডোবালে ওকে কাঁটা মেরে শাস্তিও দিতে পারব না।

পরেরদিন বিড়ালের হাজির হবার আগেই সব মাছেরা পাড়ে এসে হাজির হলো। অন্যদিন গল্প শুরু হবার পর একে একে সবাই আসতে থাকে। সেটা দেখে বিড়াল একটু আশ্চর্য হবার পরেও লোভ সামলাতে না পেরে তাড়াতাড়ি পা দুটো জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিল। মাগুর দাদা প্রস্তুত হয়েই ছিল। গোড়ালির ঠিক ওপরে সজোরে তার কাঁটা বিঁধিয়ে দিয়ে মাথাটা জলের ওপর ভাসিয়ে বলল–

পাজি বিড়াল নাকটা বোঁচা

দিলাম তোকে জবর খোঁচা

আবার যদি আসিস ফিরে

কাঁটার ঘায়ে ফেলব চিরে।

 

সেই যে বিড়াল যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে পা নিয়ে বাসায় ফিরল–তারপর থেকে আর কেউ তার দেখা পায়নি। কেবল তার গল্পের ঝোলাটা আজও সবুজ বনের বাদাম গাছের ডালে ঝুলতে দেখা যায়।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up