ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্প শুধু গল্প নয় / নভেম্বর ২০২৬

সবুজ পৃথিবী

সেদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই সপ্তম শ্রেণির খোকা জানলার কাছে ছুটে গেল। আকাশটা কেমন মলিন। পাখিরা আজ যেন গান গাইতে ভুলে গেছে। বাতাসেও নেই সেই চেনা মিষ্টি গন্ধ। ঘুলঘুলিতে চড়ুই পাখি দুটোও এখন আর আসে না। খোকা মোবাইলে চোখ রাখতেই অবাক হয়ে গেল। সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় বড় অক্ষরে লেখা—আর্জেন্টিনায় হঠাৎ সাগরের জল শুকিয়ে গেল!

খোকা দৌড়ে মায়ের কাছে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, দেখো দেখো মা, কী অবস্থা!

মা মোবাইলে চোখ রেখে অবাক হয়ে একটা গোটা সাগরের জল শুকিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে লাগল।

খোকা বলে চলল, এসবই ভগবানের লীলাখেলা,

তাই না, মা?

মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

হ্যাঁ রে খোকা! ভগবানের ইচ্ছা ছাড়া কি কিছু হয়?

খোকা একটু চুপ করে রইল। তারপর মনে পড়ল তার বিজ্ঞান ম্যাডামের কথা।

সে বলল, কিন্তু মা, বিজ্ঞানের ম্যাডাম বললেন, প্রকৃতিতে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে তার কারণ খুঁজতে হয়। পরিবেশের ওপর মানুষের অত্যাচারও প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলেই হঠাৎ একটা গোটা সাগর শুকিয়ে যাওয়ার মতো অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে পারে…! তাকে ভগবানের লীলাখেলা বলে ভুল করলে চলবে না…।

মা অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।

—তাই নাকি?

—হ্যাঁ মা। ম্যাডাম আরও বললেন, শুধু নির্বিচারে গাছ কাটা নয়, বাতাসে ধোঁয়া ছড়ানো, নদী-সাগরে প্লাস্টিক ফেলা, অতিরিক্ত দূষণ—সবকিছুই পৃথিবীকে অসুস্থ করে তুলছে। তারপর অতিরিক্ত এসি মেশিনের ব্যবহার, পরিত্যক্ত টায়ার পোড়ানো, পুজো থেকে বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানে অকারণে মাত্রাতিরিক্ত বাজি ফাটানো—সবকিছুর ধোঁয়া পরিবেশকে বিষিয়ে দিচ্ছে। এইসব বিষাক্ত কালো ধোঁয়া সবুজ পাতার ওপর মোটা লেয়ার তৈরি করছে। তারা সঠিকভাবে সূর্যের আলো পাচ্ছে না। তাই সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটছে।

মা, বিভোর হয়ে তার খোকার কথা শুনতে লাগল…!

 

পরদিন স্কুলে গিয়ে খোকা ম্যাডামের কাছে আরো অনেক কথা শুনল। ম্যাডাম বোর্ডে পৃথিবীর একটা ছবি আঁকলেন। নীল পৃথিবীর চারপাশে কালো ধোঁয়ার মেঘ।

ম্যাডাম বললেন,

—বাচ্চারা, পৃথিবী আমাদের মা। মা যেমন আমাদের কোলে আগলে রাখেন, তেমনি পৃথিবী আমাদের জল, বাতাস, খাদ্য আর আশ্রয় দেয়। কিন্তু আমরা যদি মায়ের বুকেই আঘাত করি, তাহলে একদিন মা কাঁদবেন।

খোকা হাত তুলে বলল,

—ম্যাডাম, প্রকৃতি কি সত্যিই কাঁদে?

ম্যাডাম মৃদু হেসে বললেন,

—কাঁদে খোকা। নদীর জল যখন কালো হয়, সেটি প্রকৃতির কান্না। গাছ যখন একের পর এক কাটা পড়ে, সেটি প্রকৃতির কান্না। পাখিরা যখন বাসা হারিয়ে শহর ছেড়ে চলে যায়, সেটিও প্রকৃতির কান্না।

  খোকা জানলার বাইরে তাকাল। একটা ছোট্ট চড়ুই ক্লাসরুমের জানলার কার্নিশে বসে ছিল। তার ঠোঁটে শুকনো ঘাসের টুকরো। হয়তো সে বাসা বানাবে।

খোকা মনে মনে বলল, ছোট্ট পাখি, তোর ঘর যেন না হারায়, সব বাড়ির ঘুলঘুলিতে তোর ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ দুষ্টুমি যেন ফিরে ফিরে আসে।

 

সেদিন বাড়ি ফিরে খোকা মাকে বলল,

—মা, আমি কি আমাদের সবুজ প্রকৃতিকে বাঁচাতে কিছু করতে পারি?

মা বললেন, তুই এখনো অনেক ছোট বাবা !

খোকা হেসে বলল,

—ছোট হলেও একটা প্রদীপ তো অন্ধকারে আলো জ্বালতে পারে! তোমার সহযোগিতা পেলে সেটা পারব।

তারপর থেকে মা-ছেলে মিলে বাড়ির সামনে গাছ লাগাল। পলিথিনের পরিবর্তে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার শুরু করল। প্লাস্টিক যেখানে-সেখানে না ফেলে ডাস্টবিনে ফেলল। এখন আর কলের জল অযথা নষ্ট করে না তারা। জামাকাপড় ধোওয়া জল নষ্ট না করে নিয়মিত গাছের গোড়ায় ঢালে।

খোকা তার বন্ধুদেরও বলল, “পৃথিবীকে ভালোবাসো, পৃথিবীও তোমাদের ভালোবাসবে।”

 

কয়েকদিন পর স্কুলে ম্যাডামের পরামর্শে ‘সবুজ পৃথিবী’ নামে একটা ছোট্ট দল তৈরি হলো। সবাই মিলে গাছ লাগাল, পুকুরের পাড় পরিষ্কার করল, মানুষকে প্লাস্টিক কম ব্যবহার করার কথা বলল।

একদিন খোকা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল—সাদা মেঘের ভেলায় নীল আকাশ হাসছে। গাছের পাতায় পাতায় বাতাস দোল খাচ্ছে। দূরে সেই চড়ুইটি কিচিরমিচির সুরে গান গাইছে।

খোকা মাকে বলল, মা, আজ মনে হচ্ছে প্রকৃতি হাসছে!

মা ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,

—হ্যাঁ রে খোকা। প্রকৃতিকে ভালোবাসলে প্রকৃতিও আমাদের জীবনকে ফুলের মতো সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়।

খোকা মৃদু গলায় বলল—

গাছ বাঁচুক, নদী বাঁচুক,

বাঁচুক নীল আকাশ,

পৃথিবী যদি সুস্থ থাকে,

সুস্থ থাকবে শ্বাস।

মানুষ, পাখি, পশু সবাই—

এই পৃথিবীর সন্তান,

প্রকৃতিকে ভালোবাসাই

হোক আমাদের পণ।

সেদিন থেকে খোকা জেনে গেল—প্রকৃতির সব রহস্যকে শুধু ‘ভগবানের লীলাখেলা’ বলে পাশ কাটিয়ে গেলে চলবে না। ধর্মবিশ্বাসের পাশাপাশি যুক্তি দিয়ে জানতে হবে, বুঝতে হবে, আর নিজের দায়িত্বটুকুও পালন করতে হবে। কারণ পৃথিবীটা শুধু আমাদের নয়—আগামীর শিশুদেরও।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up