আপনজন
পিয়ালী ভট্টাচার্য
ঘুম থেকে উঠেই আকাশের মন খারাপ। এত ভালো স্বপ্ন তো বাস্তবে হবে না। সকাল সকাল ফুলতোলার কাজ ওর। ঠাকুরের শয়্যা তোলা, ঝাঁট দেওয়া, মোছামুছি ও পূজার জোগাড় করা ইত্যাদি কাজ সকলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া আছে। ভোরেই এসব সেরে ওরা পড়তে বসে যায়। আজ ঘুম থেকে উঠতে এমনিই দেরি হয়ে গেছে, তার ওপর মনটাও আনচান করছে। পড়াতে মন নেই। আজ রবিবার। তাই স্কুলের তাড়াও নেই।
সবার অগোচরে গিয়ে আকাশ বড় চৌবাচ্চার সামনে এসে দাঁড়াল। স্থির হয়ে জলের দিকে তাকিয়ে আছে। মাছগুলো মাঝে মাঝে ওপরে উঠছে তারপর ওর দিকে তাকিয়ে আবার ডুবে যাচ্ছে। কচ্ছপ আছে প্রায় দশ-বারোটা। ওরা আবার বেলা না পড়লে ওপরে উঠে আসে না । এখন মাত্র বেলা এগারোটা। ওই জলের অতলে কী জানি ওরা কী করে ! মাছগুলো না হয় দল বেঁধে ঘোরাঘুরি করে। কিন্তু কচ্ছপ তো সারাদিন চুপচাপই কাটায়। ওরাও বোধহয় ওরই মতো মনে কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছে। বড়ো জলাশয় ছেড়ে ছোট্ট একটা চৌবাচ্চায় মানিয়ে নিতে পারছে না।
আকাশ ভাবে, বেশ দূরে দূরে ঘুরে বেড়াবে। ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে পৌঁছে যাবে দূরের কোনো জঙ্গলে। তারপর ঘুড়ির সুতো কেটে গেলে সারাদিন এ গাছ ও গাছে খুঁজতে খুঁজতে নানা পাখির বাসা দেখবে। হয়তো সেই বাসায় আবিষ্কার করবে ছোট্ট ছোট্ট পাখির ডিম কিংবা নরম নরম ক্ষুদে বাচ্চা–যার এখনও চোখ ফোটেনি। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রাতে। তারপর দারুণ সেই স্বপ্ন। যদিও সে জানে স্বপ্ন সত্যি হয় না। তারা গরীব।
এক পরিবার এসেছে কাল রাতে। ওদের জন্য অনেক লজেন্স এনেছে। মহারাজ ওদের হাতে এখনও দেয়নি। আজ হয়তো দেবে। এমনিতে খাওয়া-পরার অভাব নেই। বরং বাড়ির চেয়ে এখানে খাওয়া-দাওয়া ভালো। মাস ছয়েক এখানে এসেছে সে । ক্লাস সিক্সে পড়ে। বাবা মারা যাওয়ার পর আর মা চালাতে পারছিল না। মা বলে, তিন ভাই-বোনের পেট চালানো কী মুখের কথা ! দিদিরা টিউশান করে। মা বাড়ি বাড়ি কাজ করে। কাজেই এই আশ্রমে তার থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত।
গতকাল কী সুন্দর একটা সাদা বড় গাড়ি করে অতিথিরা এসেছিল। এমন প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসে। আশ্রমের বাচ্চারা অপেক্ষাও করে অতিথিদের কাছ থেকে নতুন কিছু পাওয়ার। কিন্তু তার কোনো অপেক্ষা নেই। মায়ের জন্য মন উচাটন হয়ে থাকে। মহারাজ যদিও ওদের মায়ের মতোই ভালোবাসে। এখানে ওদের খুব নিয়মের মধ্যে থাকতে হয়। সে নতুন। ছোটো বলে চাপ কম। ক্লাস এইট থেকে ওদের বেশি কাজ করতে হয়।
কাল রাতের নতুন অতিথি ম্যাডাম এগিয়ে এলেন–ওর থুতনি ধরে আদর করতে করতে বললেন, কোন ক্লাস? বাড়ি কোথায়? আকাশের খুব ভালো লাগছিল এই নতুন ম্যাডামের স্পর্শ। গায়ের গন্ধটাও যেন ওর মায়ের মতো। এই বেলডিহা গ্রামের পাশেই ফুলুইয়ে ওর বাড়ি। মায়ের কথা মনে পড়ে নাকি…জিজ্ঞেস করতেই চোখ ছলছল করে উঠলো তার।
–তাহলে এখানে এলি কেন ?
সে কি উত্তর দেবে ? সে চেয়েছিল নাকি আসতে ! মা তো জোর করে এখানে রেখে গেল । বলল, আর চালাতে পারছি না। এখানে তো সকলেই তার মতো। কারোর বাবা আছে তো মা নেই, কারোর মা আছে তো বাবা নেই কেউ বা পুরোপুরি অনাথ। কারোর পরিবার দারিদ্রসীমার নিচে। সবাই সবার দুঃখ বোঝে, ভালোবাসে। আদর করে। জ্বর-জ্বালা হলে জলপট্টি দেয়। কেটে-ছড়ে গেলে ওষুধ লাগায়। এখানেই ওদের সংসার ।
কিন্তু আজ কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ওই কচ্ছপগুলোও তো ওদের মাকে পায়। মাছেরা ওদের মা-বাবা-ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলা করে। ইস ও যদি মাছ হতো, তাহলে ওর খাবার অভাব হতো না। জলে জলে ভেসে বেড়াতো। কচ্ছপদের পিঠে চড়ে চড়ে ঘুরতো । এই ম্যাড্যাম বার বার জিজ্ঞাসা করছে ওর বাড়ির কথা, মায়ের কথা। আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বলেই দিল–আজ আমার জন্মদিন। প্রতি বছর মা পায়েস করে।
নতুন ম্যাডাম আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে চলে গেল। আকাশ তখনও জলের দিকে তাকিয়ে একমনে ভাবতে লাগলো মায়ের কথা। কিছুক্ষণ পর ফিরে গেলো স্টাডি হলে। উপায় নেই। কাল স্কুলে বাড়ির কাজ জমা দিতে হবে। অংকগুলোও বাকি। এবেলাই শেষ করে ফেলতে হবে। বিকেলে গানের ক্লাস আছে।
সবাই মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছে। ম্যাডাম হঠাৎ ওদের ঘরে ঢুকল। সবাই হতচকিত। এ ঘরে আশ্রমের লোক ছাড়া অন্যরা ঢোকার অনুমতি পায় না। মহারাজও এসেছেন সঙ্গে। মহারাজ বললেন, এখন আর পড়তে হবে না। ব্ল্যাকবোর্ডটা কোথায় !
কেউ বুঝতে পারছে না যে ঠিক কী হতে চলেছে! রমেশ টানাটানি করে ব্ল্যাকবোর্ডটা বার করে একটা টুলের ওপর রাখল।
ম্যাডাম বলল, আজ একজনের জন্মদিন। তোমরা কি জানো ?
না কেউ জানে না । কাউকে বলেনি সে। বলে কী করবে ! আশ্রমে আবার জন্মদিন কিসের! মহারাজই বলল- বোর্ডের ওপর লিখে ফেল–হ্যাপি বার্থডে আকাশ !!
সবাই মিলে সে কী উত্তেজনা! কেউ বেলুন ফোলাচ্ছে, কেউ তাতে সুতো বাঁধছে, কেউ বা বেলুন ঝোলাচ্ছে। কোনোটা ধরাম ধরাম ফেটে যাচ্ছে। কোনোটা অনেক চেষ্টা করেও বেশি ফোলানো গেলো না। এলাহি কাণ্ড। ম্যাডামই সব আয়োজন করেছেন। এরপর ইয়া বড় একটা কেক কাটা হল। মহারাজ নিজে আকাশকে খাইয়ে দিলেন। তারপর লজেন্স বিতরণ। ইতিমধ্যে আকাশের দিদি ছোট্ট একটা টিফিন বক্সে পায়েস নিয়ে এনেছে। মা পাঠিয়েছে। আকাশ আনন্দে আপ্লুত হয়ে গেছে। কাল রাতে এমনই তো স্বপ্ন দেখেছে। আজ যেন শুধু মা নয়, গোটা আশ্রম, মহারাজ, আগত অতিথি, সকলেই কেমন আপনজন হয়ে উঠলো আকাশের কাছে।
পাঠকদের মন্তব্য
250