বুড়ো বটগাছ
ছন্দা চট্টোপাধ্যায়
বাবার হাত ধরে চলতে চলতে পিপি হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে বড়ো রাস্তার বাঁদিকে ছুট লাগাল। ‘কী হলো, কী হলো’ বলে প্রাণেশও মেয়ের পিছু পিছু দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখল, বুড়ো বটগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে আছে পিপি। আসা-যাওয়ার পথে রোজ পেরিয়ে গেলেও প্রাণেশ মনোযোগ দিয়ে কোনোদিন লক্ষ করেনি বটগাছটাকে। অজস্র ঝুরি নামিয়ে কত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে, কে জানে! পিপি বলল, বাবা তোমাকে বলেছিলাম না,
স্কুল থেকে ফেরার সময় আমি রোজ কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখতে পাই–বলে বাবার হাত ধরে টানতে টানতে আঙুল দিয়ে ইশারায় দেখিয়ে বললো–ওই দেখো !!
প্রাণেশ দেখল, বটের ঝুরির আড়ালে গাছের ছড়ানো শিকড়ের ওপরে বসে আছেন পিপির রবীন্দ্রনাথ। ভালো করে তাকিয়ে দেখল, মাথাভর্তি ঢেউ খেলানো লম্বা সাদা চুল, বুক পর্যন্ত লম্বা সাদা দাড়ি। পিপির কথাটা ভুল নয়। এমনকি চশমাটাও পুরনো দিনের মতো, সোনালি গোল ফ্রেমের। শুধু পরনে আলখাল্লা নেই, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। কাছাকাছি গিয়ে নজরে এল, পাজামা-পাঞ্জাবিটা বেশ ময়লা। রাস্তা দিয়ে অবিরাম যানবাহন চলছে। হাঁটাপথের স্কুল ফেরত বাচ্চারা ছাড়াও বহু মানুষের আনাগোনা। কোনো কিছুতেই তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই। উদাস দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন।
প্রাণেশ কৌতুহলী হয়ে আরো একটু কাছে এগোতেই চমকে উঠলো। আরে ইনি তো ভুবন স্যার ! আবার ভালো করে লক্ষ্য করে খুঁটিয়ে দেখে নিশ্চিত হয়ে গেল প্রাণেশ, সে ঠিকই দেখছে, কোনো ভুল নেই। একটু জোরেই ডাকল, স্যার, স্যার আপনি এখানে ?
কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন প্রাণেশের দিকে।
প্রাণেশ আবার বলল, স্যার, আমি আপনার ছাত্র প্রাণেশ। চিনতে পারছেন না আমাকে ?
উনি কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে হাঁটা শুরু করলেন। প্রাণেশ ভাবলো হয় স্যারের মেমোরি লস হয়েছে, তা নাহলে চিনতে চাইছেন না।
তার চেয়েও অবাক ব্যাপার সেই বীরভূম জেলার অখ্যাত গ্রাম থেকে এতদূরে এলেন কী ভাবে ! আছেন কোথায় ? গ্রামে তো মা-বাবা হারানো একমাত্র ভাইঝি ঝুমাকে নিয়ে থাকতেন l খবর পেয়েছিল, ঝুমার বিয়ে হয়ে গেছে কোনো এন আর আই ছেলের সঙ্গে। সে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। দু-তিনবছর অন্তর কাকাকে দেখতে আসে। কিন্তু এই শহরতলিতে স্যার কোথায় কার কাছে আছেন ? তার চেয়েও অবাক ব্যাপার, স্যারের তাকে চিনতে না পারা। যাই হোক না কেন স্যার ভালো নেই, সেটা পরিস্কার। পিপি সঙ্গে না থাকলে প্রাণেশ স্যারের পিছু নিয়ে দেখে আসতে পারতো, স্যার কোথায় আছেন।
পিপি জিজ্ঞেস করল, বাবা রবি ঠাকুর তোমার স্যার ?
প্রাণেশ হেসে বলল, না রে পাগলি ইনি রবি ঠাকুর নন, ইনি ভুবন স্যার। আমাদের স্কুলের টিচার ছিলেন। খুব ভালো পড়াতেন। ছাত্ররাই ছিল তাঁর সবকিছু।
উনি কিছু না বলে চলে গেলেন কেন ?
জানি না পিপি। আশা করি আবার দেখা হবে। তখন খোঁজ নেব l
আজ প্রাণেশের অফ ডে ছিল বলে পিপির বায়নায় পিপিকে স্কুল থেকে আনতে গেছিল। পিপির মা প্রিয়াই মেয়ের ডিউটি সামলায়। তাছাড়া কদিন ধরে মেয়েটা রবি ঠাকুরের গল্পও করছিল এবং মা পাত্তা দিচ্ছে না বলে বাবাকে দেখাতে চাইছিল বলে আজ আরও যাওয়া। ভুবন স্যারের কাছে তার ঋণের শেষ নেই। পাশের গ্রামের এক গরিব বিধবার ছেলে প্রাণেশ আজ যে ডাক্তার হতে পেরেছে, ভুবন স্যার পাশে না থাকলে অসম্ভব ছিল। ছোটদের সঙ্গে থাকা পছন্দ করতেন। শুধু তাই নয়, ছোটদের মন বোঝার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর l ক্লাসে পড়ানোর সময় মুখ দেখে বুঝতে পারতেন কে কে পড়া করে আসেনি, কার খিদেয় মুখ শুকিয়ে গেছে। গ্রামের স্কুলের স্টুডেন্টদের বেশিরভাগই তো গরিব ঘরের ছেলেমেয়ে। ভুবন স্যার মেধা পরখ করে ঠিক করে দিতেন, কার কোন বিষয় পড়া উচিত, যাতে জীবিকার সমস্যা না হয়। তাঁর কাছে জয়েন্ট পরীক্ষার কোচিং নিতে দূর দূর থেকে ছাত্ররা আসতো। কতজন যে তাঁর কোচিং থেকে জয়েন্ট পাস করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে তার হিসেব নেই।
একদিন প্রাণেশকে ডেকে বললেন, স্কুলছুটির পরে আমার সঙ্গে দেখা করিস।
দুরুদুরু বুকে ছুটির পরে স্টাফরুমে স্যারের সঙ্গে দেখা করল প্রাণেশ।
উনি বললেন, হ্যাঁরে তুই জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসবি না ?
প্রাণেশ মাথা নিচু করে আছে দেখে স্যার বললেন, আমি বলছি তুই জয়েন্টে বসবি। আমি তোকে পড়াব। সামনের রবিবারে সকল আটটায় বইখাতা নিয়ে আমার বাড়িতে চলে আসবি।
প্রাণেশ মিনমিন করে বলল, কিন্তু স্যার…!
কথা শেষ করার আগেই স্যার বললেন, সকালে আসবি, বিকেলের আগে ছাড়া পাবি না, মাকে বলে আসিস।
প্রথমদিনের অভিজ্ঞতায় এখনও মুগ্ধ প্রাণেশ। মাইনের প্রশ্ন তো দূরের কথা, পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে দুপুরের খাবার, বিকেলের জলখাবারের পরে ছুটি হতো। ওদের ব্যাচে চারজন ছিল। সে ছাড়া ঝুমা, সুমন আর জীবন পড়তো। ভাবতে ভাবতে বহুদূর চলে গেছিল প্রাণেশ। পিপির ডাকে বাস্তবে ফিরল। হাঁটতে হাঁটতে কখন বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে খেয়ালই নেই।
বাড়িতে ঢুকে জুতো-মোজা খুলতে খুলতেই মায়ের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল পিপি। অন্যদিন স্কুলে সারাদিন কী কী হলো গড়গড় করে সব বলে পিপি l আজ বলল, জানো মা রবিঠাকুর নয়, বাবার স্কুলের ভুবন স্যার উনি। প্রিয়া ভুবন স্যারের কথা বহুবার শুনেছে প্রাণেশের কাছে। অবাক হয়ে প্রাণেশের দিকে তাকাতেই প্রাণেশ বলল,
হ্যাঁ গো উনি সেই ভুবন স্যার। দুঃখের বিষয় হলো উনি আমাকে চিনতে পারলেন না বা চিনতে চাইলেন না বোঝা গেল না। আমি স্যার বলে ডাকতেই উনি কিছুক্ষণ আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। তারপরে কিছু না বলে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ভিড়ে হারিয়ে গেলেন। মনটা খুব খারাপ লাগছে। আরও অনেকগুলো প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে–উনি এখানে কোথায় আছেন? উনি সুস্থ না অসুস্থ ?
প্রিয়া বলল, ওর ভাইঝিকে ফোন করে দেখো। ঠিক খবর পেয়ে যাবে।
মা মারা যাবার পরে আর গ্রামে যাওয়া হয় না প্রাণেশের। সামান্য যেটুকু জমিজমা আর মাটির ঘরটা ছিল, ভাইপোকে উইল করে দান করে দিয়েছে। ঝুমার ফোন নম্বর একসময় মোবাইলে সেভ করা ছিল। আজ দেখল সেটার অস্তিত্ব নেই। রাতে বন্ধু সুমনকে ফোন করে স্যারের খবর নিল। সুমন বলল তারও ঝুমার সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই। তবে এটুকু শুনেছে, কয়েকমাস আগে ঝুমা এসে গ্রামের পাট তুলে দিয়ে অসুস্থ স্যারকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে গেছে।
প্রাণেশ বুঝতে পারল এত বড়ো শহরে স্যারকে খুঁজে বের করা সহজ হবে না। প্রিয়াকে বলে রাখলো খেয়াল রাখতে স্যার বুড়ো বটগাছের তলায় বসে আছেন কিনা। কিন্তু তাঁকে আর সেখানে দেখা গেল না। স্যারকে সেদিন ওই অবস্থায় দেখার পর থেকে মনের ভেতরটা সবসময় খুচ খুচ করে। তাই দুদিনের ছুটি নিয়ে স্যারের গ্রামে যাবে সিদ্ধান্ত নিল প্রাণেশ। সব গুছিয়ে রেখে হসপিটাল থেকে বেরনোর মুখে একটা ইমারজেন্সি কেসের খবর এলো। প্রাণেশ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে বেডে স্যারকে দেখে চমকে উঠল। রাস্তায় সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলেন। পথচলা কিছু মানুষ হসপিটালে নিয়ে এসেছে।
এরপর প্রাণেশের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন ভুবন স্যার। পঁচিশে বৈশাখ সকালে চারিদিকে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালিত হচ্ছে। মাইকে ভেসে আসছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর। বেলা দশটায় স্যারকে ডিসচার্জ করিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে এল প্রাণেশ। সে এখনো জানেনা, স্যার তাকে চিনতে পেরেছেন কিনা। কিন্তু তার সঙ্গে তাদের বাড়িতে আসতে কোনো আপত্তি করেন নি। এখন প্রাণেশের লক্ষ্য স্যারকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা।পিপি ছুটে এসে হাত ধরে বলল, বাবা তুমি খুব ভালো। আমার রবি ঠাকুরকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছ।
পাঠকদের মন্তব্য
250