ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্প শুধু গল্প নয় / জুন ২০২৬

নিমু ও কাচের বল

এক ছিল ছোট্ট পাখি, নাম তার নিমু। পাখিটা ভীষণ কৌতূহলী ও বুদ্ধিমানI সেবার আমফান ঝড়ে বাসাসুদ্ধ নিচে পড়ে গিয়ে ওর দুই ভাই-বোন মারা গেছে। ঝড়ের একটু আগে ও মোটা বটগাছের কোটরে ঢুকেছিল খাবার সংগ্রহ করতে। সেই মুহূর্তে ঝড়টা ওঠে। তাই কপাল জোরে বেঁচে গিয়েছিল। ঝড়ের পরে ওর মাকেও খুঁজে পায়নি। সেই থেকে বড্ড একা হয়ে পড়েছে বেচারা। একা একা কিছুই ভাল্লাগে না। দিনটা যেন কিছুতেই কাটতে চায় না! মনমরা হয়ে বসে থাকে।

 

    নিরুপায় হয়ে সে গাছের ডালে বসে সারাদিন তার চারপাশে কী হচ্ছে, কী ঘটছে, তা দেখে দেখে সময় কাটায়। দেখে আর ভাবে–কী অদ্ভুত এই জগৎ! কত অদ্ভুত তার কান্ড-কারখানা !

     একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিমুর মনমেজাজ ভীষণ খারাপ। সে তার মনে পরিবর্তন আনতে উড়তে উড়তে পাশের গাঁয়ে গেল। সেখানে গিয়ে সে ছোট্ট একটি মাঠে একদল শিশুকে দেখতে পেল। সব শিশু কাচের ছোট ছোট বল নিয়ে খেলছে, যেগুলো রঙিন আর চকচকে। নিমু খুব খুশি হলো। মনটাও ভালো হয়ে গেল। সে ভাবলো, ইস! আমারও যদি এমন একটা বল থাকতো, কী মজাই না হতো! বলের সঙ্গে খেলে খেলে সময় কাটিয়ে দিতাম…!

     বেশ কিছুক্ষণ একটা গাছের ডালে বসে শিশুদের খেলা দেখে মনটা খুশিতে ভরে উঠলো নিমুর। ইচ্ছে করছিল শিশুদের সঙ্গে সেও খেলায় ভিড়ে যায়। সাহস হলো না। আজকালকার বাচ্চারা খুব দুষ্টু। লাঠিসোটা দিয়ে যদি মারে!

 

     কিছুক্ষণ খেলা দেখে সে ফিরে এলো। বিকেলের দিকে উড়তে উড়তে আবার মাঠের দিকে গেল। গিয়ে সেই গাছটার ডালেই বসলো। হঠাৎ দেখলো, মাঠের এক কোনায় একটা ছোট্ট সবুজ কাচের বল পড়ে রয়েছে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে ঝকঝক করছিল। সে বলটা ঠোঁটে করে নিয়ে এসে নিজের বাসায় রেখে দিল।

     পরের দিন তার কাছের বন্ধু খরগুকে (শিশু খরগোশ) বলটা দেখাল। খরগু বলটা দেখে অবাক হয়ে গেল।

 “ওরে বন্ধু! এটা কোথা থেকে পেলি?” খরগু জিজ্ঞেস করল।

 “মাঠের পাশে পড়ে ছিল। আমি ভাবলাম, এটা আমার খেলা করার জন্য! এটা নিয়ে খেলে খেলে সময় কাটাব।”

    খরগু একটু  চিন্তিত মুখে বলল, “এটা হয়তো কারোর বল হারিয়ে গেছে। আমাদের খোঁজ করে দেখা উচিত। খুঁজে পেলে, যার বল তাকে দিয়ে দেওয়াই ভালো।”

      কিন্তু নিমু ভীষণ জেদি ছিল। সে বলল, “না! এটা আমি পেয়েছি, এটা আমার। আমি কাউকে দেব না!”

খরগু আর কথা না বাড়িয়ে তার বাসার দিকে ফিরে গেল।

 

    নিমু প্রতিদিন সেই কাচের বল নিয়ে খেলতে লাগলো। কিন্তু একদিন হঠাৎ চারিদিক অন্ধকার করে একটা ঝড় উঠল। ঝড়ে বড়ো বড়ো গাছগুলো দুলে উঠল। কড়াৎ কড়াৎ করে কয়েকটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। সেই ঝড়ে নিমু উড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল, কিন্তু কাচের বলটা নিচে পড়ে ভেঙে গেল!

      নিমু খুব কাঁদতে লাগলো। বলটা নিয়ে খেলতে খেলতে সেটা ওর খুব প্রিয় হয়ে গিয়েছিল।

বেশ কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করার পর সে চোখ মুছতে মুছতে দেখতে পেল, একটা ছোট্ট ছেলে মাঠে বসে কাঁদছে। তার হাতে অনেকগুলো কাচের বল। নিমু সাহস  করে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কাঁদছো কেন ভাই ?”

     ছোট্ট ছেলেটি চোখ মুছে বলল, “আমার একটা বল হারিয়ে গেছে, সেটা খুঁজে পাচ্ছি না।”

     সে কথা শুনে নিমু কিছু সময় একটু চিন্তা করে বুঝতে পারল, আসলে মাঠে কুড়িয়ে পাওয়া বলটা ছেলেটারই ছিল। সে নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হলো। বাচ্চাটাকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না! সে বলটা যে ঝড়ের  সময় হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে। এদিকে ছেলেটি বলের শোকে কাঁদছে। এবার যদি শোনে  বলটা সে-ই ভেঙেছে, তো হয়তো আরো কাঁদবে! তবুও ভাবলো, ওকে সত্যি কথাটাই বলবে।

 

   নিমু কাচুমাচু করে নত হয়ে মৃদু কন্ঠে বলল, “তোমার কাচের বলটা আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি ফেরত দিইনি। সেটা আমার হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে। আমি এখন কী করি বন্ধু?”

  নিমুর কথা শুনে ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুমি দুঃখ পেয়েছো, আমিও পেয়েছি। তবে তুমি সত্যি কথা বলেছো, এটা খুব ভালো কাজ। আমার কাছে এখনো অনেক বল রয়েছে, ওর থেকে একটা আমি তোমাকে উপহার দিচ্ছি!”        

     “সেকি! এমনিতেই তোমার একটা বল আমি ভেঙে ফেলেছি। তারপরও তুমি আমাকে আবার একটা বল দিতে চাইছো কেন?” নিমু কাতর কণ্ঠে বললো।

  “প্রথম কারণ, তুমি তোমার ভুল স্বীকার করে আমাকে সত্যিটা বলেছো। দ্বিতীয় কারণ, তুমি আমাকে বন্ধু বলেছো। তাই বন্ধুর খুশিতে আমি বন্ধু হিসেবে তোমাকে আর একটা বল দিলাম।”           

     নিমুর চোখ আনন্দে চকচক করতে লাগলো। এবার সে ঠিক করল, কারো জিনিস আর নিজের বলে নিজের কাছে রাখবে না। যদি কিছু পায়, আগে খোঁজ করে দেখবে, আসলে সেটা কার।

     সেই সততার পুরস্কার হিসেবে নতুন বলটা পেয়েও খুব খুশি হলো সে। কারণ এবার সেটা বন্ধুত্ব ও সততার বিনিময়ে পেয়েছে।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up