ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্প শুধু গল্প নয় / জানুয়ারি ২০২৬

বন্ধু ফিরেছে

ঋতম ভীষণ দুষ্টু ছেলে। সে সবে ক্লাস ফাইভ। খুব দুষ্টু হলেও পড়াশোনায় ভীষণ ভালো। সে মিষ্টিমনের ছেলে। প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে সে বাড়ির পাশের পার্কে খেলতে যেত। সেদিনও সে গিয়েছিল, তবে, সেদিনের বিকেলটা ছিল একটু অন্যরকম।

ঋতম হঠাৎ শুনতে পেল, খুব ক্ষীণ‌ একটা শব্দ–

"চিরিপ! চিরিপ…”

আরেকটু কাছাকাছি যেতেই সে পরিষ্কার শুনতে পেল– “কেউ এসেছে? কেউ শুনছে?"

সে চারপাশে তাকিয়ে দেখল, একটা ছোট্ট পাখি গাছের নিচে বসে রয়েছে। ডানাটা কেমন যেন নুয়ে পড়েছে। বেশ দুর্বল মনে হচ্ছে তাকে।

ঋতম অবাক হয়ে বলল–”হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। তুমি তো পুরো মানুষের মতো কথা বলতে পারো দেখছি!”

পাখিটা বলল, “হ্যাঁ পারি‌ তো। আসলে সব মানুষ কেবল নিজেদের কথা ভাবে। পাখিদের কথা কেউ ভাবছে না। তাই বাধ্য হয়ে মানুষের ভাষা শিখে ফেললাম, যাতে করে আমাদের মনের কষ্টের কথাটা বলতে পারি।"

 

ঋতম খুব অবাক হলো। সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলও বেড়ে গেল। সে জিজ্ঞেস করল, "তোমার কী হয়েছে? তোমার কিসের কষ্ট?"

পাখিছানাটা‌ তার ডানায় চোখ মুছে বলল, "আমার নাম টিনি। আমি আর আমার বাবা টোনা, মা টুনির সঙ্গে একটা পুরনো বটগাছে থাকতাম। কিন্তু ক'দিন আগে সেই গাছটা কেটে ফেলা হল। এখন আমরা কোত্থাও বাসা বানাতে পারছি না।"

  “তোমার বাবা-মা কোথায়?” ঋতম জিজ্ঞেস করল।

 ‌ “আমার জন্য খাবার খুঁজতে গেছে।”

  "তাহলে তো তোমরা বাড়িছাড়া হয়ে গেলে!"

   "হ্যাঁ," টিনি বলল, "শুধু আমি না, অনেক পাখি, কাঠবিড়ালি, বানর, হরিণরাও বাসা হারিয়েছে। প্রতিদিন কোনও না কোনও বাহানায় গাছ কাটা হচ্ছে। বনভূমি ছোট হয়ে আসছে। আমরা কোথায় যাব? আমি ছোট্ট ছানা, রাতে কোথায় থাকব বলো তো!"

ঋতমের চোখে জল। সে ভীষণ দুঃখ পেল। 

বলল, "আমি তো জানতামই না, তোমরা এত কষ্টে আছো! কিন্তু মানুষ তো গাছ কাটে বাড়ি বানানোর জন্য। তাতে দোষ কোথায়?"

টিনি শান্ত গলায় বলল, "আমরা বুঝি। তাই শুধু মানুষকে একটু ভাবতে বলছি? বলতে চাইছি, ওরা আমাদের কথা একটু ভাবুক। যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে গাছ কাটা বন্ধ রাখুক। একটু জায়গা আমাদের জন্য রাখুক। বন থাকলে মানুষও ভালো থাকবে। গাছ থেকে তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য শুদ্ধ আলো,বাতাস পায়, ছায়া পায়, ফল পায়। তাছাড়া, পশুপাখিরা সুস্থ-সুন্দর থাকলে পৃথিবীটা সুন্দর হয়। তাদের দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলে মানুষরাও আনন্দ পায়। প্রয়োজনে তাদের কাজেও লাগাতে পারে। তোমরা তো পায়রাদের শান্তির প্রতীক বলো। তার জন্যই মাঝে মাঝে দেখি, শান্তির বার্তায় কেউ কেউ আকাশে পায়রা উড়িয়ে দিচ্ছে…!"

ঋতম মাথা চুলকে বলল, "হুম...একদম সত্যি কথা। তুমি অনেক কিছুই জানো দেখছি। আমাদের স্কুলেও তো স্যার বলেছিলেন, 'সবুজ বাঁচাও, পৃথিবী বাঁচাও, বনের পশুপাখিদের বাঁচিয়ে রাখা আমাদের কর্তব্য’।"

টিনি খুশি হয়ে বলল, "তুমি খুব বুদ্ধিমান, বন্ধু। তোমার মতো বাচ্চারা যদি গাছ ভালোবাসে, তাহলে একদিন আবার আমাদের জন্য সবুজ বন ফিরে আসবে।"

ঋতম বলল, “তোমারও ভীষণ বুদ্ধি। আজ থেকে তুমি আমার ভালো বন্ধু। তবে আমি ছোট মানুষ, একা তো কিছু করতে পারব না। স্কুলের সুবীর স্যারকে বলবো। উনি গাছপালা-পশুপাখিদের খুব ভালোবাসেন। তুমি একদম চিন্তা করো না, আমি দেখছি…।”

 

ঋতম পরের দিন স্কুলে গিয়ে তার প্রিয় সুবীর স্যারকে গাছ লাগানোর প্রজেক্টের কথা বলল। কিছুদিনের মধ্যে সুবীর স্যারের নেতৃত্বে ছাত্ররা মিলে স্কুলের জমিতে ছোট একটা বাগান তৈরি করে, সেখানে ফুল, ফল আর ছায়া দেওয়া গাছ লাগালো। 

ঋতম স্কুলে থাকতে-থাকতেই কয়েক বছরের মধ্যে বাগান গাছপালায় ভরে উঠল। টিফিনের সময় সবাই যখন এদিক-ওদিকে ছোটাছুটি, গল্পগুজব করে সময় কাটায়, সে বাগানে ঢুকে তার পছন্দের গাছের গোড়ায় বসে থাকে। কখনো দুষ্টুমিষ্টি, ছেঁড়াখোঁড়া ব্রাশের মতো লেজ উঁচিয়ে কাঠবিড়ালি এ গাছ থেকে সে গাছ তিরিং বিরিং করে নেচে বেড়ায়। টিয়া, ময়না, ঘুঘু, চড়াই গাছের ডালে চরে বেড়ায়। ঋতম ‌অপেক্ষায় থাকে, টিনির মতো কাউকে দেখা যায় কিনা…।

 

অনেকদিন হয়ে গেল টিনির দেখা নেই। সে হয়তো অনেক বড় হয়ে গেছে। তারও ছোট ছোট ছানাপোনা হয়েছে। তাদের দেখাশোনা করার জন্য হয়তো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সময় হয় না। কিম্বা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কোনও জঙ্গলে গিয়ে বাসা বেঁধেছে…! তবু অপেক্ষায় থাকে, আবার টিনির মতো যদি কোনও বন্ধু জুটে যায়…।

টিনির কথা ভেবে ভেবে ঋতমের মন খারাপ হয়ে গেল। সে বাড়ির পাশের সেই পার্কের একটা গাছের ডালে ছোট্ট পাখিদের জন্য একটা ঘরও বানিয়ে রাখল। কিছুদিন পর পার্কে গিয়ে হঠাৎ চমকে গেল, ওই তো তার হাতে বানানো বাসার ভেতরে টিনিকে দেখা যাচ্ছে। ওকে দেখেই টিনি, অস্পষ্ট শব্দে ‘এসেছ বন্ধু?’–বলে বাসা থেকে লাফিয়ে নিচে নামল। তার সঙ্গে ছোট ছোট দুটো ছানা। সে আবার বলল, "তুমি আমাদের জন্য সুন্দর বাসা বানালে, সেইজন্যই এলাম। ধন্যবাদ!"

ঋতমও হেসে বলল, "আমি সবসময় তোমার বন্ধু হয়ে থাকব!"


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up