ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্প শুধু গল্প নয় / ফেব্রুয়ারি ২০২৬

লাট্টু

এই লাট্টু, শোন–

কী? লাট্টু হাঁটায় ব্রেক কষে দাঁড়াল কী বলবে, বলো? আমার তাড়া আছে

তাড়া! তোর! আমি অবাক হয়ে তাকাই তোর আবার কীসের তাড়া রে? , স্কুল যাবি বুঝি?

না, স্কুল ছেড়ে দিইচি

অ্যাঁ, বলিস কী! দ্বিগুণ অবাক হয়ে তাকাই আমি স্কুল ছেড়ে দিয়েছিস মানে?

ছেড়ে দিইচি মানে, ছেড়ে দিইচি এর আবার মানে কী! কী বলবে, তাই বলো?

কিন্তু এক্ষুনি পড়া ছাড়লি কেন রে? আর-একটু পড়তে পারতিস কোন্ক্লাস হলো যেন সবে?

ফাইব

ফাইভ? তবে ছাড়লি কেন? ফাইভ কোনও ক্লাস হলো নাকি? মাধ্যমিক পর্যন্ত না-পড়লে…!

দুর বাবা! আমার দেরি হয়ে যাচ্চে বললুম লাট্টুর গলায় বিরক্তির সুর কী বলবে বলো না?        

কী বলব বল তো? তোর কথা শুনে যে কথা হারিয়ে ফেললাম গুলিয়ে গেল যেন কেমন সব

কেনে?

এই যে, এইটুকুনি বয়স তোর পড়াশোনাটা ছেড়ে দিলি কেন রে? মা বলল?

হ্যাঁ লাট্টু মাথা দোলায় বলল, ঘরে অবাব পড়তে হবেনি আর

তারপর?

তাপ্পর আর কী! কাজে লাগি গেনু

কী কাজ! তুই! তুই যে এইটুকু এখনও?

তাতে কী! এইটুকু বলে কাজ পারিনে? সব পারি

কোথায়? কী কাজে ঢুকলি শুনি?

সবজি বেচি

সবজি! তুই! নিজে দোকান দিয়েছিস? কোথায়?

আরে না, তা কেনে বড় করে এদিক-ওদিক ঘাড় নাড়ে লাট্টু অন্যের দোকান কাজ করি সেথা

কী কাজ?

প্যাকেটে মাল ভরে দিই সবজি এগিয়ে দিই এত্ত বড় দোকান যে দোকানদারটা শুধু সবজি মাপে আর টাকা গোনে

টাকা দেয় তোকে? এত্ত কাজ করিস কত দেয়?

দিনে দশ টাকা

দশ টাকা! মাত্র! আমি অবাক হয়ে বলি

লাট্টু আমার অবাকভাব মোচনের উদ্দেশে বলে, আহা! অমন হাঁ-করি তাকাচ্চ কেনে? সারাদিন তো খাটিনে সকাল থিকে দুপুর অবদি শুদু তাপ্পর ছুটি তবে? বলে আর একমুহূর্ত দাঁড়ায় না লাট্টু একছুট দিল উত্তরের গলি বরাবর লাট্টুর হাতে একটি প্লাস্টিকের থলে ওটাতে বুঝি আনাজপাতি কারো বাড়ি দিয়ে আসতে যাচ্ছে হয়তো-বা

              

         চালদোকানে বসে আমি লাট্টুদের বাড়িটা দেখতে পাই সরকারি খাসজমিতে গড়া একটি ছোট্ট ডেরা ভাঙাচোরা ওইটি গড়েছিল গোবিন্দ লাট্টুর বাবা আমাদের চেয়ে অল্প বড় ছিল অতিরিক্ত নেশা করে অল্প বয়সে মারা গেল লাট্টুর মা লোকের বাড়ি-বাড়ি ছোটে রোজ ভোর হলে বাসনমাজা-ঘরমোছার কাজ করে বড় ছেলেটিও মানুষ না পড়াশোনা হয়নি ওটিরও উপরি কাজেকর্মে মন নেই আজ এর দোকানে কাজ করে, কাল ওর দোকানে মাঝখানে ভাসাপাড়ার ফ্যান-কারখানায় ঢুকেছিল মন বসল না সেখানেও

 

         লাট্টুর সাথে রোজদিন দেখা হয় বেশ ছেলে ওর মায়ের মতো হয়েছে সর্বদা ঠোঁটদুটিতে জুঁইফুল ফোটা শত অভাব-দারিদ্রও ওদের মুখের হাসি কাড়তে পারে না লাট্টুর মা যখন চাল কিনতে আসে আমার দোকানে, লাট্টুও চলে আসে লেজুড়টি হয়ে মায়ের পিছু-পিছু আমি ওর পেছনে লাগি লাট্টু হাসে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয় কখনও মুখ বাঁকিয়ে বলে ওঠে, চা এনে দেব না কিন্তু

       

         ওটা লাট্টুর নিত্যদিনকার কাজ সকালে চা খেয়েই ঘর থেকে বেরোই সন্ধ্যায় তা হয় না পাঁচটায় ঘর ছাড়ি এসে দোকান ঝাড়পোঁছ করে সেজেগুজে বসি খদ্দেরের অপেক্ষায় প্রহর গুনি দেখতে-দেখতে কখন সন্ধে ঘনায় অমনি একটু চা-চা করে ওঠে মনটা ততক্ষণে এসে সামনে দাঁড়ায় লাট্টু আমার দিকে হাত বাড়িয়ে একগাল হেসে বলে, পয়সা দাও -কাপ? আমি ওকে পয়সা দিই খদ্দের বা পরিচিত কেউ সামনে থাকলে গুনতি করে বলি, তিন কাপ-চার কাপ চা দোকানের দিকে উড়াল দেবে অমনি লাট্টু যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে আরও একবার হাসবে টেরিয়ে তাকাবে বলবে, দশ গোনো

          আমি একশো গুনে শেষ করলেও অবশ্য লাট্টুর টিকিটি চোখে পড়ে না

          পড়বে কেন? দোকানে গিয়ে দাঁড়ালেই কী আর ওর হাতে চা-টি তুলে দেবেন মদনদা আগের খদ্দের সামলে তবে না! উপরি দোকানটিও একেবারে ধারেকাছে না মিনিট তিন-চারের পথ বটে !

          চা-হাতে লাট্টু এসে সামনে দাঁড়াবে একগাল হাসবে বলবে, দশ গুনলে? দেখলে তো, তার মধ্যেই এসে গেলাম ঠিক !

 

এবার পুজোয় জামা হবে রে তোর লাট্টু?

জানি নে আনমনা হয়ে এদিক-ওদিক তাকায় লাট্টু

তার মানে হবে না, বল?

তাই মনে হচ্চে লাট্টু মিনমিন করে

কেন হবে না? মাকে বলিস একটা অন্তত কিনে দিতে

বললুমই বা

কেন? মা কী বলবে?

বলবে, অবাব হাতে পয়সা নেই লাট্টু মিনমিন করে

বড় হয়ে তুই কী হবি রে লাট্টু? কী হতে চাস?

কী হতি চাই? চাই! মাথা চুলকে ভাবার চেষ্টা করে লাট্টু শেষে ফিক করে হাসেআমি দানী হতি চাই

দানী! আমি অবাক হয়ে তাকাই সে কেমন?

যে কিনা দান করবে সবারে যারা খেতে পায়নে যাদের অবাব, তাদের তবে আর দুক্ক থাকবে নে কারো না-খেয়ে উপোস কত্তি হবে না কাউরে

আমি চুপ

লাট্টুও…!

       অমনি আচমকা কোথা থেকে হুড়মুড়িয়ে একটি-দুটি-তিনটি-চারটি কুকুর ছুটে এসে লাট্টুকে ঘিরে ধরল আমি আঁতকে উঠে ওদের তাড়াতে যাই হই-হই, যা-যা করে চেল্লাই বলি, এই লাট্টু, সরে আয়, সরে আয় এদিকে কামড়ে দেবে যে!

           লাট্টু হাসে কুকুরগুলির গায়ে হাত বুলিয়ে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, কামড়াবে কেনে? ওরা আমার বন্ধু যে সব এরাও খুব দুকি খেতে পায়নে কেউ ওদেরও খালি অবাব আর অবাব বলে কুকুরগুলির দিকে ঘুরে দাঁড়াল লাট্টু লাট্টুর গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কুঁইকুঁই শব্দ জোড়ে ওরা ওদের গায়ে হাত বুলিয়ে লাট্টু বলে, আয়, আমার সঙ্গে আয় খাবি আয়

          লাট্টু চার-পাঁচটা দোকান ছাড়িয়ে মুদি দোকানটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় পকেট থেকে পয়সা বার করে হরিমুদির হাতে দেয় বিনিময়ে হরিমুদি ওর হাতে এক প্যাকেট বিস্কুট ধরিয়ে দিল সেটি হাতে নিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের মতো হাসে লাট্টু তারপর একটি-একটি করে বিস্কুট পুরে দিতে থাকে কুকুরগুলির মুখে

               খদ্দেরের ডাকে সংবিৎ ফিরল আমার। সামনে তাকিয়ে দেখি দু-তিনজন খদ্দের দাঁড়িয়ে। আমি ওদের চাল মেপে দিতে-দিতে লাট্টুর দিকে তাকাই। মৃদু হেসে ওর কাণ্ডকারখানা দেখি। মনের অজান্তে চোখ ছলছল করে ওঠে আমার, কেন কে জানে!


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up