ছোটোদের চাঁদের হাসি / গল্প শুধু গল্প নয় / এপ্রিল ২০২৬

নতুন ম্যাডাম

নরেন্দ্রনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ক্লাস-রুমটা ভীষণ চঞ্চল। কেউ গল্প বলে, কেউ হাসে, কেউ দুষ্টুমি করে, কেউ জানালার বাইরে আনমনে তাকিয়ে থাকে…!

‌‌   এই ক্লাসেই পড়ে কুশল। সে ক্লাসের অন্যান্যদের থেকে একটু আলাদা। ধীরে কথা বলে। পড়তে গেলে অক্ষর গুলিয়ে ফেলে। প্রশ্ন করলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারে না। গভীর দৃষ্টিতে ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকায়। অনেকেই তাকে নিয়ে ফিসফিস করে–’ক্যাবলা কুশল, কিছুই পারে না’!

   শুরুতে কুশল ভাবত–সে বোধহয় সত্যিই পারে না। শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ কুশলকে কিছুতেই পড়াশোনায় মনোযোগী করাতে পারেন না।

 

  নতুন বছর পড়ল। ২ জানুয়ারি ‘বুক-ডে’ পালনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হলো। নতুন বছরের প্রথম দিনে ক্লাসে এলেন ক্লাসের নতুন শিক্ষিকা শর্মিলা দে। তিনি অন্য বিদ্যালয় থেকে বদলি হয়ে নরেন্দ্রপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। প্রথম দিনেই তিনি সব ছাত্রছাত্রীকে ভালো করে দেখলেন। কুশলের দিকে তাকাতেই তাঁর চোখে বিরক্তি নয়, বরং মমতা ফুটে উঠল।

 

   একদিন বাংলা ক্লাসে সকলকে ‘সরব পাঠ’ দিলেন। একে একে সবাই জোরে জোরে পড়ল। কুশলের পালা এলে সে আটকে গেল। ক্লাসে হাসির প্রতিধ্বনি–’ক্যাবলা কুশল, ক্যাবলা কুশল…’!

শর্মিলা ম্যাম সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বললেন, 

“সব চুপ, একদম চুপ। ওকে কেউ ক্যাবলা বলবে না। নাম ধরে ডাকবে। কুশল, তুমি ধীরে ধীরে পড়ো…!”

কুশল কাঁপা গলায় পড়তে শুরু করল। ভুল হলো, তবু শিক্ষিকা থামালেন না। পড়া শেষ হতেই তিনি হাততালি দিতে দিতে বললেন–“খুব ভালো, খুব ভালো।”

  শর্মিলা ম্যামের দেখাদেখি ক্লাসের সকলে হাততালি দিল। সেই প্রথম, কুশলের মনে হলো, সেও কিছু করে দেখাতে পারে।

 

পরদিন শর্মিলা ম্যাম নতুনভাবে পড়ানো শুরু করলেন। ছবি এঁকে, গল্প বলে, রঙিন কার্ড ব্যবহার করে, এমনকী অভিনয় করে করে মজার ছলে তিনি সকলের সঙ্গে কুশলকেও শিক্ষাদান করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

 

দুই 

 

 একদিন তিনি ক্লাসে বললেন, “আজ আমরা গল্প বানাব।” ম্যামের কথা শুনে সকলেই অবাক–

গল্প বানানো ? কীভাবে?

  তিনি ক্লাসের শিক্ষার্থীদের একটা ছবি দেখালেন। একটা গাছ, একটা পাখি, একটা ছেলে–“এই তিনটা বিষয় নিয়ে যার যেমন মনে আসে বলবে।” 

  কুশল চুপ করে ছিল। শর্মিলা ম্যাম তার কাছে গিয়ে নিচু গলায় বললেন, “কুশল, ছবিটা ভালো করে দেখো। তুমি শুধু একটা বাক্য বললেই হবে।”

  কুশল সাহস করে বলল, “পাখিটা গাছে থাকে। ছেলেটা তার বন্ধু।”

  পুরো ক্লাস চুপ। শর্মিলা ম্যাম সকলের উদ্দেশে বললেন, “দেখলে? গল্প শুরু হয়ে গেল!”

 সেদিন কুশল বুঝতে পারল–সেও ভাবতে পারে, কল্পনা করতে পারে। চেষ্টা করলে বলতেও পারে…!

 

  আর একদিন শর্মিলা ম্যাম আরও একটা কাজ করলেন। তিনি ক্লাসে ‘বন্ধু জুটি’ বানালেন। প্রত্যেকটি বুদ্ধিমান শিশুর সঙ্গে একটি করে দুর্বল মেধার শিশুর জুটি। কুশলের বন্ধু হলো রাহুল। রাহুল আগে কুশলকে এড়িয়ে চলত। কিন্তু ম্যামের নির্দেশে সে কুশলের পাশে বসে পড়া বুঝিয়ে দিতে লাগল।

  একদিন রাহুল বলল, “ম্যাডাম, কুশল আজ পুরো লাইনটা নিজে পড়েছে!”

  ম্যাম বললেন, “কারণ, তুমি ওকে সুযোগ দিয়েছ।”

আস্তে আস্তে কুশল বইয়ের ছবি দেখতে, ভালোবাসতে শুরু করল। ছোট ছোট বাক্য পড়তে পারল। ভুল করলেও ভয় পেত না।

 একদিন লাইব্রেরি-ক্লাসে শর্মিলা ম্যাম বললেন, “যার যেমন ইচ্ছে, তেমন বই নিয়ে পড়ো।”

কুশল বেছে নিল বড় ছবি আর অল্প লেখার বই।       

ম্যাম বললেন, “এই বইটাও বই।”

 

তিন

 

দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে গেল। ফাইনাল পরীক্ষার ফল বেরোল। কুশল আগের চেয়ে অনেক ভালো ফল করল। তার চেয়েও বড় কথা, সে এখন ক্লাসে স্বাভাবিক কথা বলে, প্রশ্ন করে।

শর্মিলা ম্যাম জানতেন, সব শিশুর শেখার গতি এক নয়। কিন্তু স্নেহ-ভালোবাসা, যত্ন, ধৈর্য আর বিশ্বাস পেলে সবাই এগোতে পারে। 

ক্লাসরুমে তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমরা সবাই আলাদা। কিন্তু আলাদা মানেই অক্ষম নই।”

তাঁর স্নেহ-মমতা, আন্তরিকতায় কুশলের স্কুল-ভয়, বই-ভয় কেটে গেল। বইয়ের পাতায় সে নিজের জায়গা খুঁজে পেল।

একদিন কুশল মাকে বলল,

“মা, আমি পারব। নতুন ম্যাডাম বলেছে।”

ছেলের মুখে এমন অবাক করা কথা শুনে মায়ের দু’চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা খুশির বিন্দু ঝরে পড়ল।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up