ছোটোদের চাঁদের হাসি / দেশ-বিদেশের গপ্পো / নভেম্বর ২০২৫

জানলা

(মূল লেখা : রাস্কিন বন্ড)

 

সময়টা ছিল বসন্তকাল, আর আমার দিন গড়াচ্ছিল ডেহরায় আমার অভিভাবক আর তার স্ত্রীর সঙ্গেI প্রতিদিন দুপুরবেলায় স্কুলের ক্লাস শেষ করে মন যেমন চাইত, সেভাবেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারতাম আমি। কিন্তু এই ব্যস্ত রাখতে বাইরে কোথাও যেতে হতো না আমাকে। আমি শুধু সিঁড়ি ভেঙে ওপরে চলে যেতাম আমার ঘরে, যা ছিল ছাদের ওপরে–আর আমার অঢেল সময় সেখানেই কেটে যেত দিব্যি। সংক্ষেপে, আমার গোটা সময়টাই কাটত জানলায়। কারণ, ওই জানলা থেকেই আমার মনে হতো আমিই তামাম এই জগত-সংসারের মালিক। জানলা থেকেই শুধু কিন্তু।

 

    ওপাশের বটগাছটা আমার ছিল, আর তার সব বাসিন্দারা আমার প্রজা। দুটো কাঠবেড়ালি ছিল, কয়েকটা ময়না, একটা কাক, আর রাতের বেলা এক জোড়া উড়ুক্কু শেয়াল। কাঠবেড়ালি দুটো ব্যস্ত থাকতো বিকেলে, পাখিরা সকাল-সন্ধেয়,  শেয়ালগুলো রাতে। আমার অবশ্যি বাড়ির কাজ থাকতো ঢের, পাঠ্যবিষয়ও বিস্তর। কিন্তু বটগাছের বাসিন্দাদের মতন ব্যস্ততা ছিল না আমার।

     একটা আমগাছও ছিল, পরে হয়েছিল, গ্রীষ্মে কোকির সঙ্গে যখন আমার দেখা, তখন আমে পাক ধরেছিল।

     প্রথমে ঘরের ভেতরে নিঃসঙ্গ ছিলাম আমি। কিন্তু তারপরেই আমার জানলার ক্ষমতা আবিষ্কার করলাম। বটগাছ, বাগান, বাড়িগুলোর ধার-ঘেঁষে দৌড়োনো চওড়া  রাস্তার দিকে, আরও অনেক বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে, রাস্তা এবং জমি-জিরেত পেরিয়ে, দিগন্ত বরাবর। রাস্তাটা ব্যস্ত নয় তেমন কিন্তু বৈচিত্রে ভরা। একজন আয়া, প্র্যামে একটি শিশু। পোস্টম্যান, নিজেই যে একটা ঘটনা। ফল আর খেলনা ফিরিওলা পরিচিত চড়া গলায় হাঁক পাড়ছে।  তহসিলদার, একঝাঁক সাইকেলআরোহী, স্কুলের পথে মেয়েদের লম্বা সারি, একজন খঞ্জ ভিখিরি–সবাই চলমান, আমার জানলার সমুখ দিয়ে।

 

    একদিন খড়খড়িয়ে ঝমঝমিয়ে সেই পথ বেয়ে একটা টাঙ্গা এসে দাঁড়াল আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের বাড়িটার সামনে। একটি মেয়ে আর একজন বয়স্ক মহিলা নামলেন, আর একজন কাজের লোক তাদের বাক্স-প্যাঁটরা নামাল। তারা সেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল, ফিরে গেল টাঙ্গাটা, ঘোড়াটা ঘোঁৎ ঘোঁৎ করল সামান্য।

    পরের বিকেলে তাদের বাগান থেকে মুখ তুলে তাকালো মেয়েটি আর আমাকে দেখতে পেল জানলায়। লম্বা কালো চুল তার কোমর অবধি গড়িয়েছে, একটি লাল ফিতেয় বাঁধা সেই চুল। চুলের মতনই কালো তার চোখ আর সেইরকমই ঝিকমিকে। বয়স, নিশ্চয়ই দশ হবে, আমার থেকে এক-দু’বছরের ছোটো হয়তো।

“হ্যালো”, বন্ধুর মতন হেসে বললাম আমি।

আমার দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো সে। শুধোল, “কে তুমি?”

  “ভূত।“

আমার জবাবে হাসল সে–খুশি আর ব্যঙ্গের হাসি। “সেরকমই  দেখতে বটে!” তার কথা খুব যে ভালো লাগল, তা মনে হয়নি। কিন্তু এটাই যেন চেয়েছিলাম আমি। আমি আর হাসলাম না।

   “ওখানে  কী পেলে?” শুধোল সে।

   “ম্যাজিক”, বললাম আমি।

 আবার হাসল সে, কিন্তু এবারে ব্যঙ্গবর্জিত।”তোমাকে বিশ্বাস করি না”, বলল সে।

  “ওপরে চলে এসো না, আর নিজেই দেখো।”

 

আমার অভিভাবক মিঃ হ্যারিসন আর তাঁর স্ত্রী যথারীতি তখন ক্লাবে। মনে হয় ব্রিজ বা অন্য কিছু খেলেন তাঁরা। বেরুলে বেশ দেরি করেই ফেরেন। তাই কোনো ভয় ছিল না, তাঁদের না-পছন্দ এমন কিছু করে ধরা পড়ে যাব–এই দিশি মানুষগুলোর সঙ্গে আমার মেশামেশি আর কী।

মেয়েটি একটু দ্বিধায় জড়াল। কিন্তু আমাদের বাড়ির সিঁড়ির কাছে চলে এলো আর উঠতে লাগল ধীরে, সন্তর্পণে। আর যেই সে আমার ঘরে ঢুকল, নিজের ম্যাজিক নিয়েই ঢুকল যেন সে।

“কোথায় তোমার ম্যাজিক?” আমার চোখের দিকে তাকিয়ে শুধোল সে।

 “এদিকে এসো”, বলে জানলার ধারে নিয়ে এলাম তাকে আর আমার দুনিয়াটা দেখালাম।

 ও  কিছু বলল না। কিন্তু অবুঝের মতন জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল প্রথমে, তারপরে সোৎসাহে। একটু বাদে ঘুরে দাঁড়াল সে, হাসল আমার দিকে তাকিয়ে, আর আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম।

 

   আমি শুধু জানতাম তার নাম কোকি, আর সে এসেছে তার মাসির সঙ্গে গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে। আর কিছু শুধোইনি তাকে, সেও আমাকে কিছু।

 আমাকে যদি সে শুধোতও কিছু, নিজের সম্পর্কে চটকদার তেমন কিছু বলারও ছিল না আমার। আমার নাম রাস্টি, বাবা-মা ব্রিটিশ, আমার বয়েস বারো। জন্মেছি এখানেই–এই ডেহরাতেই–কিন্তু বলার মতন কোনো পরিবারই নয়। আমার বয়স যখন মাত্র চার, আমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে, আবার বিয়ে করেন আমার মা। ছেলেবেলার বেশিটাই কেটেছে বাবার সঙ্গে। আর যখন কাজের জন্য বাইরে যেতে হত তাঁকে–বর্মার এক রাবার কোম্পানিতে কাজ ছিল তাঁর, দাদু-দিদার সঙ্গে ডেহরাতেই তাদের বাড়িতে থাকতাম আমি। কিন্তু আমার বাবা হঠাৎই ম্যালেরিয়ায় মারা যান। আর আমার মা যদিও নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নেবার চেষ্টা করেন আমাকে, আমার প্রতি নজর দেবার বড়ো একটা সময় ছিল না তাঁর, কেননা নিজেরও বাচ্চা ছিল তাঁর। তাদের দেখ-ভাল করতে হতো।

 

   এরপর আমার ঠাকুমার সঙ্গেই থাকি আমি, কিন্তু হঠাৎই মারা যান তিনিও। কোনো একজন, মনে হয় আমার কোনো এক পিসি, আমার বাবার খুড়তুতো ভাই জন হ্যারিসন আর তার স্ত্রীর হেফাজতে আমাকে রাখেন। তাঁরাই আমার অভিভাবক এখন। কিন্তু তাঁরা আশ-পাশে থাকলেও পারিবারিক উষ্ণতা কদাচিৎ পেয়েছি আমি। তখন পর্যন্ত এটুকুই বলবার ছিল আমার। বলবার মতন নয় যদিও তা।

 

     কোকি প্রতিদিন আমাদের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে আসত, জানলায় আমার কাছে। আমাদের জগতে তখন বিস্তর উত্তেজনা, বিশেষ করে যখন বৃষ্টি নামত। প্রথম গুরু-গর্জনেই মহিলারা ছুটে যেতেন কাচা জামা-কাপড় উদ্ধারে, আর যদি খর বাতাস থাকত, তাহলে উঠোন জুড়ে উড়ন্ত জামা-কাপড়ের পেছনে। বর্ষা যখন আসত, আসত ঝমঝমিয়ে, বাগানকে জলা আর রাস্তাকে নদী করে। ভয়ংকরভাবে রাস্তা চলতে হত সাইকেচালককে। বয়স্ক মানুষ ব্যতিব্যস্ত হতেন ছাতা হাতে। নগ্ন শিশুরা হুটোপুটি করত বৃষ্টির জলে। কোকি কখনো কখনো ছুটে চলে যেত ছাদে, চিৎকার করত আর নাচত। আর বর্ষার জল খোলা দরজা আর জানলা দিয়ে ঘরের ভেতরে চলে আসত–মেঝে ভাসিয়ে আর আমার বিছানাকে দ্বীপে রূপান্তরিত করে। কিন্তু অন্য সবকিছুর থেকে জানলাতেই ছিল বেশি মজা। এটা আমাদের তফাতে যাবার ক্ষমতা দিত। চারপাশের জীবনে গভীর আকর্ষণ আমাদের, কিন্তু আমরা এর ভেতরে নেই।

“এটা একটা সিনেমার মতন”, বলত কোকি–“জানলা হলো পর্দা, জগৎ হল ছবি।”

 

   এরপরই আমগুলো পাকল, আর আমার ঘরে যেমন তার থাকা, তেমনই আমগাছের ডালে। জানলা দিয়েই গাছটাকে ভালোভাবে দেখতে পেতাম আমি, আর একই উচ্চতা থেকে কথা বলতাম আমরা। অনেক আম খেয়েছিলাম, দিনে অন্তত পাঁচটা।

“ছাদের ওপরে একটা বাগান করি আমরা”, কোকি বলল। এরকম মতলবে মগজ তার পূর্ণ ছিল।

“কিন্তু কেমন ভাবে করবে সেটা?” আমি শুধোই।

“খুবই সহজ। মাটি আর ইট এনে ঘের বানাব। তারপর বীজ বুনব। সব রকম ফুল ফোটাব আমরা।” “ছাদ ভেঙে পড়বে যে”, আগাম ঘোষণা আমার।

আসলে তা হয়নি। দু’দিন ধরে সিঁড়ি ভেঙে বালতি করে ছাদের ওপরে মাটি তুললাম আমরা, বীজতলা বানালাম। খুব গোপনেই করা হল এসব–যখন আমার অভিভাবক আর তাঁর স্ত্রী বাড়ির বাইরে থাকতেন। খুব শক্ত কাজ, কিন্তু কোকিই প্রায় সবটা করল। বীজতলা যখন তৈরি, আমাদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হলো। নিচের বাগান থেকে জোগাড় করা কিছু চারা ছাড়া এক কিসিমের বীজই আমাদের কাছে ছিল শুধু–লাউ-বীজ…!

    যাই হোক, কাদা-মাটির নিচে সেই বীজ পুঁতে খুব গর্ব হলো আমাদের। কিন্তু সেই রাতে প্রবল বর্ষণ হলো, আর সকালে উঠে দেখলাম ইট ছাড়া আর সবকিছুই ধুয়ে মুছে সাফ।

 আমরা তাই ফিরে এলাম জানলাতেই। একটা ময়না উড়ছিল, একটা কাকের সঙ্গে হয়তো–মাথা থেকে পালক তার হাওয়া। দেয়াল বেয়ে ওঠা একটা বোগেনভেলিয়া লম্বা সবুজ একটা ডাল গলিয়ে দিয়েছিল জানলার ভেতর দিয়ে। কোকি বলল, “লতাটাকে নষ্ট না করে আমরা এখন জানলাটা বন্ধ করতে পারব না।”

“জানলাটা তাহলে কখনো বন্ধ করব না আমরা”, আমি বললাম।

 লতাটাকে ঘরের ভেতরে আসতে দিলাম আমরা।

 

    বর্ষা ফুরোল, আর বট গাছের ডালপালার ভেতর দিয়ে শরতের হাওয়া ফিসফিসিয়ে ঢুকে পড়ল। মাটিতে লালপাতার দঙ্গল, হাওয়া তাদের তুলে নিয়ে উড়িয়ে দিল দিগবিদিকে, প্রজাপতির মতন লাগল তাদের। সকালে ততক্ষণ সূর্যোদয় দেখি, লালে লাল আকাশ–যতক্ষণ না তার প্রথম রশ্মি জানলার গায়ে আছড়ে পড়ে, আর দেয়ালের গা বেয়ে উঠে পড়ে ওপরে। আর সন্ধেবেলা কোকি আর আমি দেখতাম সূর্য ডুবে যাচ্ছে পেঁজা-তুলোর এক সমুদ্দুরের গভীরে। মেঘগুলো কখনো গোলাপি, কখনো কমলা। জানলার ফ্রেমের ভেতরে সব সময়েই রঙিন তারা।

“কাল চলে যাচ্ছি”, এক সন্ধেয় কোকি বলল।

 আমি হতবাক, কিছু বলব কী।

  “তুমি তো এখানেই থাকো, সব সময়ে, তাই না?”  বলল সে।

  আমি চুপ।

“পরের বছর যখন আবার আসব, তুমি তো এখানেই থাকবে, তাই না?”

  “জানি না”, বললাম আমি। যে কোনো জায়গা থেকে যেভাবে ঠাঁই-নাড়া হই আমি, কোথায় কদ্দিন থাকব! কোনো একটা জায়গাকে যে বাড়ি বলব, এমন সাহস কদাচিৎ হয় আমার। “কিন্তু জানলাটা ঠিক এখানেই থাকবে” বললাম আমি।

“পরের বছর এখানেই থেকো তুমি”, বলল সে, “নইলে কেউ এসে জানলাটা বন্ধ করে দেবে।”

     

  সকালবেলা দরজায় টাঙ্গা এলো, আর সেই কাজের লোক, টাঙ্গার ভেতরে মাসি আর কোকি। জানলার দিকে তাকিয়ে আমাকে হাত নাড়াল কোকি। গাড়োয়ান বলগায় হেঁচকা টান লাগাল, গাড়ির চাকায় ঘর-ঘর, ঘন্টার ঝুমঝুম। রাস্তা ধরে গড়াল টাঙ্গা, রাস্তা ধরে প্রবেশপথের ভেতর দিয়ে, আর কোকি সর্বক্ষণ হাত নেড়েই চলল। আর সেই প্রবেশপথ থেকে নিশ্চয়ই একটা ভূতের মতন দেখাচ্ছিল আমাকে, উচু সেই জানলায় দাঁড়িয়ে একাকী, বোগেনভেলিয়ার ভিড়ে।

    টাঙ্গাটা চোখের আড়ালে যেতেই বোগেনভেলিয়ার শিশু-শাখাটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘরের বাইরে ঠেলে সরিয়ে দিলাম। তারপর বন্ধ করে দিলাম জানলাটা। কোকি আর বসন্ত ফিরলে তখনই শুধু খোলা হবে এটা।

 

◾লেখক পরিচিতি

রাস্কিন বন্ড (১৯৩৪)

জন্মেছেন তৎকালীন পাঞ্জাবের কশৌলিতে। তাঁর বাবা-মা ইংরেজ হলেও রাস্কিন আদ্যন্ত ভারতীয়। ইংরেজি ভাষায় তাঁর সাহিত্যচর্চার শুরু সতেরো বছর বয়সে উপন্যাস ‘দ্য রুম অন দ্য রুফ’ দিয়ে। তিনি ছোটদের প্রিয় লেখক। তাদের জন্য তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা ৪০-এর বেশি।  তিনি পেয়েছেন সাহিত্য আকাডেমী পুরস্কার। এছাড়াও পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত।


পাঠকদের মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি

আপনি কি এই লেখায় আপনার মন্তব্য দিতে চান? তাহলে নিচে প্রদেয় ফর্মটিতে আপনার নাম, ই-মেইল ও আপনার মন্তব্য লিখে আমাদের পাঠিয়ে দিন।
নাম
ই-মেইল
মন্তব্য

250

    keyboard_arrow_up