রাজকন্যা ও সোনার পাখি
মূলরচনা : সার্গেই নিকোলভ (বুলগেরিয়া)
ভাষান্তর : সুব্রত চৌধুরী
এক রাজ্যে এক সুন্দরী রাজকন্যা বাস করতো। তার মাথার চুল ছিল লম্বা ও লাল। গোলাপ ফুল ভালোবাসতো বলে তাকে রাজ্যবাসী গোলাপকুমারী নামে ডাকতো।
প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর গোলাপকুমারী প্রাসাদের বারান্দায় এসে দাঁড়াতো এবং হাততালি দিতো। তার হাততালি শুনে একটা সোনালি পাখি উড়ে এসে তার কাঁধে বসতো। তখন গোলাপকুমারীর চুল থেকে লাল আভা বেরিয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়তো। পাখিটার সুরে গোলাপকুমারী সুর মেলাতো। সেই সুরের মূর্ছনায় রাজ্যবাসী সুখনিদ্রায় হারিয়ে গিয়ে সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখতো।
রাজ্যের এক জাদুকরের কানে গোলাপকুমারীর খবরটা পৌঁছলো। শুনে তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করলো। সে একদিন গোলাপকুমারীর সাথে দেখা করলো।
কথাচ্ছলে গোলাপকুমারী তাকে যাদু দেখাতে বললে, সে একটা মন্ত্র আওড়ালো–’আবরা-কাবরা, সিম-সালা-সিম’, সঙ্গে সঙ্গে গোলাপকুমারীর লাল চুল কালো হয়ে গেল।
ওইদিন সন্ধ্যা নামতেই অভ্যেসমতো গোলাপকুমারী বারান্দায় এসে দাঁড়ালো এবং হাততালি দিলো। তা শুনে সোনালি পাখি উড়ে এসে তার কাঁধে বসলো। সাথে সাথে গোলাপকুমারীর চুল থেকে লালের পরিবর্তে কালো আভা বের হলো। পাখিটার সুরে গলা মেলাতেই সুরটাও বেশ কর্কশ শোনালো। আর সেই কর্কশ সুরে রাজ্যবাসী ঘুমিয়ে পড়লেও সুন্দর স্বপ্নের পরিবর্তে দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকলো।
রাজ্যবাসীর দুঃস্বপ্নের কথা শুনে গোলাপকুমারীর মন দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লো। তাই ওইদিন সন্ধ্যায় পাখিটা তার কাঁধে এসে বসতেই গোলাপকুমারী তাকে জিজ্ঞেস করলো, আমি কীভাবে রাজ্যবাসীদের আবার সুন্দর স্বপ্ন দেখাতে পারি?
তোমার কালো চুল লাল গোলাপের পাপড়ি মিশ্রিত জল দিয়ে ধুয়ে ফেললে তা লাল হয়ে যাবে, আর রাজ্যবাসীও সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখতে পারবে। পাখির কথামতো গোলাপকুমারী তা করতেই তার কালো চুল লালরঙের হলো, রাজ্যবাসীও সুন্দর স্বপ্ন দেখতে লাগলো।
ইতিমধ্যে যাদুকরের যাদু যে আর কাজ করছে না, সে সংবাদটা তার কানে পৌঁছে গেলো। তাই সে তার যাদুমন্ত্র দিয়ে রাজ্যের সব গোলাপ গাছ মেরে ফেললো।
গোলাপ ফুলের অভাবে গোলাপকুমারী লাল গোলাপের পাপড়ি মিশ্রিত জল দিয়ে চুল ধুতে না পারায় তার চুল আবার কালো হয়ে গেলো। রাজ্যবাসীও আর সুন্দর স্বপ্ন দেখতে পারল না। মনের দুঃখে গোলাপকুমারী বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলো।
ওই সময় পাশের রাজ্যের রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। গোলাপকুমারীকে কাঁদতে দেখে সে ঘোড়া থেকে নেমে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কাঁদছো কেন?
গোলাপকুমারী তাকে সব খুলে বললো। গোলাপকুমারীর মুখে সব শুনে রাজপুত্র তার কোমরে গোঁজা বাক্স খুলে একটা লাল চুল নিয়ে গোলাপকুমারীর চোখের পাতায় রাখলো। তার চোখের জলে চুলটা ধুয়ে যেতেই তা লাল গোলাপে পরিণত হলো। রাজপুত্র গোলাপটা গোলাপকুমারীর হাতে তুলে দিল।
গোলাপকুমারী লাল গোলাপের পাপড়ি মিশ্রিত জল দিয়ে চুল ধুতেই তার চুল থেকে লাল আভা বের হলো। গোলাপকুমারীর কন্ঠে বাজলো পাখির শেখানো সুরেলা গান, আর রাজ্যবাসীও আবার সুন্দর স্বপ্ন দেখতে লাগলো।
এই ঘটনা রাজার কানে যেতেই রাজা রাজপুত্রকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, চুলটা সে কোথায় পেয়েছে?
রাজপুত্র বললো, খুব ছোটবেলায় আমরা দু’জন যখন ভালো বন্ধু ছিলাম, তখন বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ ওর মাথার এই চুলটা ছিঁড়ে আমার কাছে রেখেছিলাম।
তা শুনে গোলাপকুমারী বললো, হ্যাঁ বাবা, ও ঠিক কথা বলেছে। আমিও ওর মাথার একটা চুল ছিঁড়ে রেখেছিলাম–বলেই প্রাসাদের ভেতরে ছুটে গিয়ে একটা ছোট বাক্স নিয়ে এসে রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা বাক্সটা খুলে রাজপুত্রের চুল পেয়ে খুব খুশি হলেন।
তিনি বেশি দেরি না করে পাশের রাজ্যের রাজার সাথে কথা বলে দু’জনের বিয়ের আয়োজন করলেন। একদিন মহাধুমধামে তাদের বিয়েও সম্পন্ন হলো।
বিয়ের পর তাঁরা দু’জনে মহাসুখে দিনাতিপাত করতে লাগলো। গোলাপকুমারী সন্ধ্যার পর নিয়ম করে সুরেলা কন্ঠে গান গাইতে লাগলো। আর তা শুনে রাজ্যবাসী সুখনিদ্রা যেতে লাগলো ও সুন্দর স্বপ্ন দেখতে লাগলো।
আর ওদিকে যাদুকরের যাদুমন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় সে রাজ্য ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো।
পাঠকদের মন্তব্য
250