দুই বন্ধু
(চীনদেশের রূপকথা)
ভাষান্তর : খগেন্দ্রনাথ মিত্র
প্রায় দু’হাজার বছর আগে—
চীনদেশের চু-রাজ্যে একজন রাজা রাজত্ব করতেন। তিনি ছিলেন বড় ধার্মিক ও বিদ্যোৎসাহী। পন্ডিতদের তিনি অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং নানাভাবে চেষ্টা করতেন, যাতে পন্ডিত ও ধার্মিক ব্যক্তিরা তাঁর সভায় থাকেন এবং তাঁর রাজ্যে বাস করেন। পন্ডিতগণও তাঁর গুণ ও গুণগ্রাহিতার কথা শুনে, নানা দেশ থেকে বাড়িঘর ছেড়ে, দলে দলে গিয়ে তাঁর রাজ্যে বাস করতেন।
সেই সময় সুদূর উত্তর-পশ্চিমে, পার্বত্য প্রদেশে
সো-পো-তাও নামে একজন গুণী ছিলেন। তিনি যখন শিশু, তখন তাঁর পিতামাতা মারা যান। কিন্তু অসাধারণ অধ্যবসায়ের সঙ্গে লেখাপড়ায় আত্মনিয়োগ করে তিনি এত পান্ডিত্য অর্জন করেন যে, সকলের পরম সহায় ও সান্ত্বনার স্থল হয়ে ওঠেন। তাঁর বয়স যখন চল্লিশ বছর হয়, তখন তিনি লক্ষ্য করেন–সর্বত্র ছোটো ছোটো রাজারা নিজেদের মধ্যে সর্বদাই কলহ ও যুদ্ধে মত্ত। এও দেখেন, দেশের সহৃদয় লোকের সংখ্যা কত কম এবং যারা অসৎ পথে চলে তাদের সংখ্যা কত বেশি! সেইজন্য তিনি কোনো রাজসরকারেই চাকরি গ্রহণ করলেন না। এরপর যখন শুনলেন চু-রাজ লোকটি সত্যনিষ্ঠ ও ধার্মিক, তিনি পণ্ডিতদের তাঁর রাজ্যে নিমন্ত্রণ করেন–তখন তাঁর গ্রন্থগুলি একটি থলিতে পুরে, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, চু-রাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। চলতে চলতে অবশেষে ইয়ুং প্রদেশে উপস্থিত হলেন। সময়টা তখন শীতের মধ্যভাগ। সেজন্য পথে তাঁকে ভয়ঙ্কর শিলাবৃষ্টি ও তুষার-ঝড়ে পড়তে হলো।
তা সত্ত্বেও সেই ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে তিনি সারাদিন চললেন। তাঁর পোশাক এত ভিজে গেল যে, তাঁর শরীরও জলে ভিজে গেল এবং সন্ধ্যা নামবার সঙ্গে সঙ্গেই একখানি গ্রামে পৌঁছে আশা করতে লাগলেন, সেখানে কোথায়ও রাতের মতো আশ্রয় পাবেন। বাঁশবনের মধ্য দিয়ে একটি বাড়ির জানালায় আলো জ্বলতে দেখে, তিনি সেই দিকে তাড়াতাড়ি অগ্রসর হলেন এবং সেখানে পৌছে দেখেন, একখানি খড়ের চালা তার চারধারে বাঁশের নিচু বেড়া। তিনি বেড়ার দরজাটা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে ঘরখানির দরজায় ঘা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে দরজাটি খুলে বেরিয়ে এলেন একটি লোক।
সো পো ঘরের ছেঁচতলায় দাঁড়িয়ে লোকটিকে নমস্কার করে বললেন,”আমি সুদূর উত্তর-পশ্চিমবাসী। আমার নাম সো-পো-তাও। আমি চু-রাজ্যে যাচ্ছি এবং পথে ঝড়-বৃষ্টিতে পড়েছি! জানি না কোথায় একটু আশ্রয় পাব। আমি প্রার্থনা করি, আপনি রাতের মতো আমাকে এখানে একটু আশ্রয় দেবেন। তারপর ভোর হলেই আমি আমার পথে চলব। আমাকে এটুকু দয়া করবেন কি?”
এই কথা শুনে লোকটি সো-কে প্রতি-নমস্কার করে, ঘরে ঢুকতে বললেন। সো ঘরের ভেতর ঢুকে দেখেন, একটি বড়ো বিছানা ছাড়া ঘরে আর কোনো আসবাবপত্র নেই। বিছানাটির ওপরেও রয়েছে গ্রন্থের স্তুপ।
সো বুঝলেন, গৃহস্বামী পন্ডিত লোক! সেইজন্য তিনি ভূমিষ্ঠ হয়ে তাঁকে প্রণামের উপক্রম করতেই লোকটি সো-কে মিনতির সঙ্গে নিরস্ত করে বললেন,”যতক্ষণ না আগুন জ্বালি, আপনি বিশ্রাম করুন। তারপর আগুনে পোশাকগুলো শুকিয়ে নিয়ে দু’জনে কথাবার্তা বলব।”
এই বলে তিনি কতকগুলো শুকনো কঞ্চি জড়ো করে আগুন জ্বালালেন এবং সেই আগুনে পোশাক শুকিয়ে নিলেন। তারপর গৃহস্বামী খাদ্য প্রস্তুত করে সেগুলো সো-র সম্মুখে রাখলেন এবং তাঁর সঙ্গে বড়ো সদয় ব্যবহার করতে লাগলেন। সো গৃহস্বামীর নাম জিজ্ঞাসা করলেন।
উত্তরে তিনি বললেন,”আপনার দাসের নাম, ইয়াং চিয়াও-আই। আমার শৈশবস্থায় আমার পিতামাতার মৃত্যু হয়। আমি এখানে একা বাস করি। আমি বরাবর লেখাপড়া নিয়েই আছি, চাষ-বাস কিছু করি না। আজ ভাগ্যের কৃপায় যদিও আপনি বহু দূরদেশ থেকে আমার এখানে এলেন, আমার বড়ো লজ্জা যে, আপনাকে এই সামান্য সামগ্রী দিয়ে অভ্যর্থনা করতে হলো! প্রার্থনা করি, আপনি আমার এই দীনতা মার্জনা করবেন।”
পো-তাও উত্তর দিলেন,”এই ঝড়ে আমি আশ্রয় পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করছি। তার সঙ্গে আমি পাচ্ছি আহার্য ও পানীয়। আমি আপনার কাছে এত ঋণী হয়ে রইলাম যে, সারা জীবনেও ভুলতে পারবো না।”
সে রাতে দুজনে একই বিছানায় একজনের পায়ের কাছে আরেকজন মাথা রেখে শুলেন এবং তাদের প্রত্যেকের জ্ঞানভাণ্ডার পরস্পরের কাছে উজাড় করে দিতে লাগলেন। কারো চোখেই সারা রাতের মধ্যে একবারও ঘুম এলো না।
পরদিন সকালেও তেমনি ভাবে ঝড় বইতে লাগল। ইয়াং সেইজন্যে পো-তাওকে তাঁর কুটিরে রেখে, তাঁর সমস্ত আহার্য অতিথির সম্মুখে রাখলেন। অবিলম্বে দু’জনে পরস্পরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ হলেন, এবং ইয়াং প্রথমে পো-তাওকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। কেননা পো-তাও ছিলেন তাঁর চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো। এই ভাবে তাঁরা দু’জনে একসঙ্গে তিন দিন বাস করলেন।
অবশেষে ঝড় শান্ত হলো।
পো-তাও বললেন,”ভাই, তোমার এমন প্রতিভা আছে যে, তুমি রাজার প্রধান সচিব হবার উপযুক্ত। যদি এই বনে বাস করতে করতে তুমি বৃদ্ধ হয়ে পড়ো, তাহলে বড়ই দুঃখের কথা হবে।”
ইয়াং বললেন,”রাজকার্যের ভার নিতে যে আমার ইচ্ছা নেই তা নয়, কিন্তু আমি এ পর্যন্ত উন্নতির কোনো সুযোগ পাইনি।”
পো-তাও উত্তরে বললেন,”চু-রাজ লোকটি বড়ো ধার্মিক। আর তিনি সকলদেশের পন্ডিতদের তাঁর সরকারে পদ গ্রহণ করবার জন্যে নিমন্ত্রণ করেছেন। তোমার যদি সে রকম অভিপ্রায় থাকে, তাহলে আমার সঙ্গে তাঁর রাজ্যে চলো না কেন?”
“তোমার কথাই শিরোধার্য।”–বলে ইয়াং কিছু টাকাকড়ি নিয়ে তাঁর কুটির থেকে পো-তাওয়ের সঙ্গে দক্ষিণ অভিমুখে যাত্রা করলেন।
কিন্তু দু’দিন চলার পর আবার ঝড়-বৃষ্টি তাঁদের কাতর করে ফেলল এবং দু’জনে একটি সরাইয়ে আশ্রয় নিয়ে, যে পর্যন্ত না কপর্দকশূন্য হলেন, সে পর্যন্ত সেখানেই থাকলেন। তারপর তাঁদের পোঁটলাটি পালা করে কাঁধে নিয়ে, দু’জনেই সেই ঝড়েই আবার বেরিয়ে পড়লেন।
ঝড় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। অবশেষে বৃষ্টিধারা ও শিলারাশি তুষারে পরিণত হয়ে সারাদিন ধরে পড়তে থাকল।
এই কষ্টের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে দু’জনে লিয়াং পর্বতের মুখে একটি পথে এসে পৌঁছোলেন। এইখানে একজন কাঠকয়লা প্রস্তুতকারীর সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হলো। সে বলল,”এই পথের শত ক্রোশের মধ্যে কোন বসতি নেই। এই পথ পার্বত্য ও নির্জন, বহু জায়গা গভীর বনের মধ্য দিয়ে গেছে। সেখানে বাঘ ও নেকড়ের দল ঘুরে বেড়ায়। আপনাদের আর অগ্রসর না হওয়াই উচিত।”
দুই বন্ধুতে তখন পরামর্শ করতে লাগলেন। ইয়াং বললেন,”প্রবাদ আছে, জীবনে ও মরণে জগদীশ্বরের ইচ্ছাতেই সকল কাজ নিয়ন্ত্রিত হয়। আমরা যখন এতদূর এসেছি, তখন নিঃসংকোচে সম্মুখে অগ্রসর হই।”
এই সংকল্প করে দু’জনে আরও একটি দিন পথ চললেন এবং রাত্রে একটি পুরাতন সমাধি-মধ্যে আশ্রয় নিলেন। কিন্তু তাঁদের গায়ের পোশাকগুলো ছিল পাতলা। শীতের প্রচন্ড শীতল বাতাস দেহ ভেদ করে হাড়ে বিঁধতে লাগল। পরদিন তুষার আরও ঘন হয়ে পড়তে লাগল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সমস্ত পার্বত্য-প্রদেশকে এক ফুট গভীর তুষারে ঢেকে ফেলল। পো-তাওয়ের পক্ষে সেই প্রচন্ড ঠান্ডা হয়ে উঠল অসহ্য।
তিনি বললেন,”বহু ক্রোশের মধ্যে কোনো মানুষের বসতি নেই। আমাদের খাদ্যও শীঘ্রই ফুরিয়ে যাবে। আর এই প্রচন্ড ঠান্ডা দূর করবার উপযুক্ত পোশাকও আমাদের নেই। যদি আমাদের মধ্যে কেউ একা চলতে থাকে, তাহলে সে চু-রাজ্যে পৌঁছতে পারবে। কিন্তু দু’জনে একসঙ্গে চলতে থাকলে দু’জনেই হয় অনাহারে, না হয় শীতে মারা পড়ব। পর্বতের গায়ে ঘাসের মতো আমরা বিনষ্ট হব। আমাদের দেখবার কেউ থাকবে না। তাতে আমাদের কী লাভ হবে? সেইজন্যে আমার সমস্ত পোশাক খুলে আমি তোমাকে দিই। তুমি সেগুলো পরো এবং সমস্ত খাদ্য নিয়ে একাই অগ্রসর হও। আমার আর চলবার শক্তি নেই। আমার এখানেই মৃত্যু শ্রেয়। তুমি চু-রাজ্যে গিয়ে রাজার সঙ্গে দেখা করো। তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে তাঁর সরকারে কোনো কর্ম দেবেন। তুমি তখন এখানে এসে আমার দেহটা খুঁজে বার করে সমাহিত করো। দেরি হলে কোনোই ক্ষতি হবে না।”
চিয়াও বললেন,”এই যুক্তির কী কারণ হতে পারে? আমরা একই পিতামাতার সন্তান না হলেও পরস্পরের প্রতি আমাদের স্নেহ-ভালোবাসা এত গভীর যে, সহোদর ভাইদের মধ্যেও এমন দেখা যায় না। উন্নতি লাভ করবার জন্যে আমি কী করে একা যেতে পারি?”–এই বলে তিনি পো-তাওকে ধরে সেই ঘন তুষারের মধ্য দিয়ে বহু কষ্টে অগ্রসর হতে লাগলেন।
তারপর আরও ক্রোশ কয়েক গিয়ে পো-তাও বললেন,”তুষার ঝড়টা আরও প্রচন্ড হয়ে উঠেছে, আমি আর অগ্রসর হতে পারছি না। পথের ধারে কোনো আশ্রয়-সন্ধান করা যাক।”
তাঁরা কাছেই একটা অনেককালের পুরনো কুলগাছ দেখতে পেলেন। গাছটার গুঁড়ি ফাঁপা। তার মধ্যে আশ্রয়ের একটু জায়গাও ছিল। কিন্তু স্থানটুকু ছিল মাত্র একটি লোকের উপযুক্ত। চিয়াও-আই, পো-তাওকে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে। পো-তাও, চিয়াও-আইকে শুকনো ডালপালা কুড়িয়ে চকমকি জ্বেলে একটু আগুন করবার জন্য অনুরোধ করলেন। তাতে দু’জনে হাত-পা সেঁকে একটু গরম হতে পারবেন।
চিয়াও-আই তাঁর অনুরোধ মতো শুকনো ডালপালা সংগ্রহ করে ফিরে এসে দেখেন, পো-তাও নগ্ন দেহে রয়েছেন এবং তাঁর সমস্ত পোশাক রয়েছে তুষারের ওপর জড়ো করা।
চিয়াও ভয়ে বলে উঠলেন–”ভাই! এ কী?”
পো-তাও উত্তরে বললেন,”এ ছাড়া আর উপায় নেই। তোমার নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করো না। আমার পোশাকগুলো পরে সমস্ত খাদ্য নিয়ে তুমি চলে যাও। আর আমি, এখানে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করব।”
“না। বরং আমরা দু’জনে এক সঙ্গে মরব। কী করে আমরা বিচ্ছিন্ন হতে পারি?” বলে চিয়াও-আই, পো-তাওকে জড়িয়ে ধরে গভীর দুঃখে কাঁদতে লাগলেন।
পো-তাও বললেন,”ভাই! আমরা দু’জনে যদি মরি, কে আমাদের সমাহিত করবে? যদি একজনকেই যেতে হয়, তবে আমিই এখানে থাকি। তুমি আমার পোশাকগুলো পরো! খাদ্যটা সঙ্গে নিয়ে যাও। আমিই মৃত্যুকে বরণ করে নেব। আমি নানা রোগে ভুগেছি। কিন্তু তুমি আমার চেয়ে বয়সে ছোটো, আমার চেয়ে শক্তিমান। উপরন্ত আমার শিক্ষাদীক্ষা তোমার তুল্য নয়। সেইজন্যে আমি তোমার চেয়ে বাঁচতে অনুপযুক্ত। চু-রাজের সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হলে তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে একটি উঁচুপদ দেবেন। আমার মৃত্যুতে কিছুই হবে না। কাজেই আর বিলম্ব করো না।”
চিয়াও কাঁদতে কাঁদতে বললেন,”এই কুলগাছের কোটরে তুমি ক্ষুধায় মারা যাচ্ছ, আর, আমার হচ্ছে উপকার…! এতে যে আমার সারা জীবন কলঙ্কিত হয়ে উঠছে। আমি যাব না।”
পো তাও বললেন,”স্বদেশের পার্বত্যভূমি ছেড়ে প্রথম আমি তোমার কুঁড়েঘরে আশ্রয়ের জন্যে গিয়েছিলাম, সেই রাতেই আমি তোমাকে প্রিয় বন্ধু বলে গ্রহণ করেছি। উপরন্তু আমি জানি, তোমার পান্ডিত্য অসাধারণ। সেইজন্যে আমি মিনতি করি, তুমি যাও। জগদীশ্বরের ইচ্ছাই এই যে, আমার এখানে মৃত্যু হবে।”–এই বলে তিনি তুষার-রাশির মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বার চেষ্টা করতেই চিয়াও-আই তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁর গায়ে পোশাকগুলি জড়িয়ে দিয়ে তাঁকে গাছের কোটরে ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন। পো-তাও তাঁকে সরিয়ে দিলেন। আবার, চিয়াও-আই তাঁকে রক্ষার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এই সময় তিনি পো-তাওয়ের দেহে এক পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন। তিনি দেখলেন, পো-তাওয়ের হাত-পা সাদা এবং অসাড় হয়ে গেছে, তিনি আর কথা বলতে পারছেন না। পো-তাও হাত নেড়ে তাঁকে শেষবারের মতো চলে যেতে ইঙ্গিত করলেন এবং চিয়াও-আই শেষবারের মতো বন্ধুকে পোশাকে জড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তখন আর উপায় নেই। শীতে পো-তাওয়ের হাত-পা জমে গেছে, শরীরের মেদ-মজ্জা পর্যন্ত বিদ্ধ হয়েছে, শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় রুদ্ধ হয়ে এসেছে।
চিয়াও-আই ভাবলেন, আমিও যদি এখানে থাকি, তাহলে আমিও মারা যাব। তাহলে আমার প্রিয় বন্ধুকে কে সমাহিত করবে?
তিনি তাই জানু পেতে বসে পো-তাওকে ভুমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে সজল চোখে বললেন,”তোমার অধার্মিক ছোটো ভাই তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আমি প্রার্থনা করি, তোমার আত্মা যেন তাকে রক্ষা করে। আমি যদি একটি সামান্য কর্মও পাই, তাহলেও ফিরে এসে তোমাকে মহা আড়ম্বরে সমাহিত করব।”
পো-তাও যেন সম্মতি জানাবার জন্যে মাথাটি ঈষৎ নত করলেন। তারপরই তাঁর জীবনের অবসান হলো।
তখন চিয়াও-আই তাঁর বন্ধুর পোশাকগুলি পরে, খাদ্যগুলি হাতে তুলে নিলেন।
তারপর বন্ধুর প্রাণহীন দেহটির দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন।
অবশেষে চিয়াও-আই অসাড় দেহে, অনশনে মৃতপ্রায় হয়ে চু-রাজ্যে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি একটি সরাইয়ে সেদিন বিশ্রাম করে পরদিন নগরে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে শুনলেন, চু-রাজ সত্যই পন্ডিতদের আমন্ত্রণ করেছেন। রাজা রাজপ্রাসাদের তোরণের একধারে নিমন্ত্রিত পন্ডিতগণের জন্য একটি অতিথিশালা নির্মাণ করেছেন। পন্ডিতরা প্রথমে সেইখানে গিয়েই ওঠেন এবং তাঁদের সুখসুবিধার ব্যবস্থার ভার আছে, পি-চাঙ নামে একজন উচ্চপদস্থ অমাত্যের ওপর। চিয়াও-আই যদি সেখানে যান, তাহলে রাজার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হবে।
চিয়াও-আই সেই কথা শুনে অতিথিশালায় চলে গেলেন এবং যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন, তখন দেখলেন, মন্ত্রী পি-চাঙ, তাঁর গাড়ি থেকে নামছেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে মন্ত্রীকে অভিবাদন করলেন।
মন্ত্রী দেখলেন, লোকটির পোশাক-পরিচ্ছদ ছিন্ন মলিন হলেও মুখে প্রতিভার ছাপ সুস্পষ্ট। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রত্যাভিবাদন করে, চিয়াওকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার কোথা থেকে আসা হচ্ছে?”
চিয়াও-আই উত্তর করলেন,”আপনার অনুগত ভৃত্যের নাম, ইয়াং চিয়াও-আই, নিবাস ইয়ুং চৌ। আপনাদের এই সম্মানিত দেশের জন্য পন্ডিত আবশ্যক শুনে আমি এসেছি।”
পি-চাঙ তৎক্ষণাৎ চিয়াও-আইয়ের বিশ্রাম ও আহারের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং পরদিন এসে তাঁর সঙ্গে পুস্তকাদির বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। চিয়াও-আই অবিলম্বে সেগুলির এমন চমৎকার উত্তর দিলেন যে, মন্ত্রী খুব খুশি হয়ে উঠলেন। তারপর তিনি রাজার কাছে গিয়ে চিয়াও-আইয়ের আগমন বার্তা নিবেদন করতেই রাজা তৎক্ষণাৎ তাঁকে দর্শন দিলেন।
রাজা তাঁকে প্রশ্ন করলেন,”আমার দেশ কী করে ধনশালী হয়ে উঠতে পারে এবং সেই সঙ্গে সুদক্ষ সেনাবাহিনী রাখাও দেশের পক্ষে সম্ভব?”
চিয়াও-আই তার যে দশটি উত্তর দিলেন, তাতে রাজা এমন খুশি হয়ে উঠলেন যে, অবিলম্বে চিয়াও-আইয়ের সম্মানের জন্য এক বিরাট ভোজের আয়োজন করতে আদেশ দিলেন। তারপর তিনি তাঁকে রাজ্যের সহকারী-সচিবের পোশাক, পদ ও একশত স্বর্ণমুদ্রা ও জরির কাজ করা কয়েকটা থান মখমল দান করলেন। এতে চিয়াও-আই ভুমিষ্ঠ হয়ে রাজাকে প্রণাম করবার সময়, তাঁর় চোখ ফেটে জল এল। তিনি কাঁদতে লাগলেন।
রাজা জিজ্ঞাসা করলেন,”আপনি কাঁদছেন কেন?”
চিয়াও-আই রাজার কাছে তাঁদের দুই বন্ধুর বিষয়ে সমস্ত বর্ণনা করে বললেন,”আমারই সুখের জন্য সে তার পোশাক, খাদ্য ও প্রাণ দিয়েছে!”
এই কথা রাজার অন্তর স্পর্শ করল। সভাসদ সকলেই অভিভূত হয়ে পড়লেন।
রাজা তখন পো-তাওকে তাঁর সহকারী সচিবের পদে নিযুক্ত করে তাঁর দেহ সমাহিত করার জন্যে কয়েক সহস্র মুদ্রা মঞ্জুর করলেন।
তারপর চিয়াও-আই লোকজন নিয়ে সেই পার্বত্য প্রদেশের সেই জায়গাটিতে এসে দেখলেন, তাঁর প্রিয় বন্ধুর দেহটি কুলগাছের কোটরে তেমনই অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে।
তিনি দেহটিকে সেখান থেকে পর্বত-পরিবৃষ্টিত একটি সুন্দর ঝর্নার সম্মুখে নিয়ে গিয়ে মহা আড়ম্বরে সমাহিত করে সেখানে একটি দেউল নির্মাণ করে দিলেন।
তবুও তিনি মনে শান্তি পেলেন না…! বন্ধুর সঙ্গে মিলিত হবার জন্য একদিন তিনি আত্মহত্যা করে পরলোকে চলে গেলেন।
এই সংবাদ রাজার কাছে পৌঁছোল। তিনি চিয়াও-আইয়ের বন্ধু বাৎসল্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আরও উচ্চপদে উন্নীত করে একজন উচ্চপদস্থ অমাত্যকে তাঁর অন্ত্যেষ্টির জন্য সেখানে পাঠিয়ে দিলেন।
অমাত্য গিয়ে চিয়াও-আইকে বন্ধুর পাশে সমাহিত করলেন এবং রাজার আদেশে সেই সমাধির ওপর একটি মন্দির নির্মাণ করে তার গায়ে একখানি কাষ্ঠ ফলকে খোদাই করে দেওয়া হলো–আত্মত্যাগ ও প্রেমের উদ্দেশ্য।
পাঠকদের মন্তব্য
250