ছোট্ট মেয়েরা বয়স্ক পুরুষদের চাইতে বুদ্ধিমান
মূল গল্প : লিও তলস্তয় (রাশিয়া )
ভাষান্তর : বিপ্লব বিশ্বাস
সবেমাত্র প্রাক-ইস্টার পর্ব শেষ হয়েছে। বরফের চাঁই ভাঙার কাজও সবে শেষ হয়েছে। উঠোনে তখনও কিছু তুষার ছড়িয়ে আছে। গ্রামের পথে জল গড়িয়ে চলেছে। দুই বাড়ির দুটি ছোট্ট মেয়ের হঠাৎ দেখা হলো দুই ভিটের মাঝের সরু গলিপথে, যেখানে খামার থেকে বয়ে আসা জলে এক কাদা-ভরা গর্ত সৃষ্টি করেছে। মেয়ে দুটির মধ্যে একটি অপরটির চাইতে খানিক ছোটো। দুজনকেই তাদের মায়েরা নতুন ফ্রক পরিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে। ছোট্টটি পড়েছে নীলরঙের ফ্রক আর অন্যটির পরনে হলদে রঙের। উভয়ের মাথাতেই লাল রুমাল বাঁধা।
তাদের মধ্যে যখন দেখা হলো, তখন তারা সবে গির্জা থেকে ফিরেছে। প্রথমে তারা একে অপরকে তাদের নতুন পোশাক-আশাক দেখাল, তারপর খেলতে লাগল। খুব তাড়াতাড়ি মাতোয়ারা হয়ে তারা জল ছিটোনোর খেলা শুরু করল। ছোটোটি জলভরা গর্তে জুতো-জামা সমেত পা ডোবাতে যাচ্ছিল, তখন বড়োটি তাকে থামিয়ে বলল, “নোংরা জলে পা ডোবায় না মালাসা, তোর মা তাহলে খুব বকবে। আমি জুতো মোজা খুলছি, তুইও তোরটা খোল!” তারা তাই করল আর পরনের ঘাগরা খানিকটা ওপরে তুলে নোংরা জমা জলের মাঝ দিয়ে একে অপরের দিকে এগোতে লাগল। সেই জল মালাসার গোড়ালিতে উঠে এলো। সে বলল, “বেশ গভীর গর্ত, আকোউল্যা, আমার ভয় করছে!” ‘চলে আয়, ভয় পাস না। এখানে জল খুব গভীর নয়”, বড়োটা আশ্বাস দিয়ে বলল।
তারা যখন একে অপরের কাছাকাছি এলো, তখন আকোউল্যা বলল, “মনে রাখিস, জল ছিটোবি না কিন্তু। সাবধানে হাঁটবি।” এই কথা বলা শেষ না হতেই মালাসা ধপ করে সেই জলে এমনভাবে পা ফেলল যে সেই নোংরা জল ছিটকে গিয়ে আকোউল্যার ফ্রক ভিজিয়ে দিলো। ফ্রকের সঙ্গে তার নাক ও চোখেও সেই জল ছিটকে পড়ল। ফ্রকে কাদা-জলের দাগ দেখে সে খুব রেগে গিয়ে মালাসাকে মারতে গেল। মালাসা ভয় পেল–একটা ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছে দেখে তাড়াহুড়ো করে সে গর্ত থেকে উঠে পালাতে চাইল।
ঠিক তখনই আকোউল্যার মা সেই পথ ধরে যাচ্ছিল এবং সে যখন দেখল মেয়ের নতুন ফ্রকটি কাদা-জলে নোংরা হয়ে গেছে, তখন বলল, “দুষ্টু মেয়ে, এসব কী করছিলি?” “মালাসা ইচ্ছে করে এ সব করেছে”, আকোউল্যা বলল। এতে তার মা মালাসাকে পাকড়ে দম করে পিঠে একখান ঘা কষিয়ে দিল। মালাসা এমন চিৎকার জুড়ল যাতে গোটা রাস্তায় তা শোনা যায়। তা শুনে তার মা বেরিয়ে এসে বলল, “আমার মেয়েকে মারলে কেন?” এই বলে পড়শি মহিলাকে ভর্তসনা করতে লাগল।
কথার পিঠে কথা হতে হতে জোর ঝগড়া বেঁধে গেল। এই শুনে পুরুষেরা রাস্তায় বেরিয়ে এলো আর রাস্তা জুড়ে জটলা পেকে উঠল। সকলেই সমস্বরে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু কেউ কারও কথা শোনে না। ঝগড়া পাকতে পাকতে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলো। ঘটনা যখন ঘুষোঘুষির পর্যায়ে গেল, তখন আকোউল্যার দিদিমা বেরিয়ে এসে তাদের শান্ত করতে চেষ্টা করল এই বলে, “তোমরা সব করছটা কী? এটা কি ঠিক হচ্ছে? এমন এক বিশেষ পুণ্য দিনে যখন সকলে মিলে আনন্দে মাতার সময়, তখন এমন বোকামির মানে কী?” কিন্তু কেউই বুড়ির কথায় কান দিলো না, উলটে তাকে পা দিয়ে মেরে ফেলে দিলো।
বুড়ি তাদের শান্ত করতে পারল না। ভাবল, দুটি ছোট্ট মেয়ের ভুলের জন্য এত! ওদিকে যখন মহিলারাও একে অপরকে গালাগাল দিতে শুরু করেছে, আকোউল্যা ফ্রকের কাদা মুছে নিয়ে সেই গর্তের কাছে ফিরে গেল। সে একটা পাথরের টুকরো হাতে করে ওই গর্ত থেকে একটা খাত কাটতে লাগল, যাতে সেই নোংরা জল রাস্তা অবধি যায়। এরপর মালাসাও এসে তার সঙ্গে যোগ দিল, হাতে একটা কাঠের টুকরো নিয়ে আকোউল্যাকে খাত খুঁড়তে সাহায্য করল।
ঠিক যখন পাড়ার পুরুষেরা ঝগড়া-মারামারিতে মেতে, তখনই এই দুই ছোট্ট মেয়ের চেষ্টায় গর্তের নোংরা জল রাস্তা অবধি বয়ে সেই জায়গায় চলে এসেছে, যেখানে সেই বুড়ি পুরুষদের থামাতে চেষ্টা করেছিল। মেয়ে দুটিও ওই জলাধারার সঙ্গে সঙ্গে চলল, দুজনে জলধারার দুপাশ জুড়ে দৌড়ে দৌড়ে এলো।
“ধর, মালাসা ধর”, আকোউল্যা চেঁচিয়ে বলল। হাসির তোড়ে কথা বলতে পারলো না মালাসা। তৈরি খাতের জলধারার কাঠের টুকরোটা ভাসতে দেখে উল্লসিত ছোট্ট মেয়ে দুটি দৌড়াতে দৌড়াতে সোজা পুরুষদের জটলার মাঝে ঢুকে পড়ল। বুড়ি দিদিমা তাদের দেখে লোকগুলোকে বলল, “তোমাদের নিজেদের জন্য লজ্জা লাগছে না? এই দুটি ছোট্ট মেয়ের ভুলের জন্য এভাবে ঝগড়াঝাটি, হাতাহাতি করছো যখন, ওরা নিজেদের দোষ ভুলে গিয়ে আনন্দে এক সঙ্গে খেলছে। ওই খুদে প্রাণ সব! ওরা তো তোমাদের চাইতে বেশি বুদ্ধি ধরে।” একথা শুনে সবাই মেয়েদুটির দিকে চোখ ফেরাল, লজ্জা পেল খুব আর ওদের কীর্তি দেখে হাসাহাসি করতে করতে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেল।
এই ঘটনার মর্মার্থ হল–তোমরা যদি নিজেদের পালটে ছোট্ট শিশুদের মতো না হও, তাহলে কোনও বুদ্ধিতেই তোমরা স্বর্গরাজ্যে প্রবেশের অধিকার পাবে না।
পাঠকদের মন্তব্য
250